সরকার সম্পদ ও কর চালুর পথে বড় পরিবর্তন আনছে

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৪ বার
কর কাঠামোয় বড় পরিবর্তন আনছে সরকার

প্রকাশ: ১৬ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের কর ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের দিকে এগোচ্ছে সরকার। ধনীদের ওপর কর আরোপের বিদ্যমান কাঠামো বদলে ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটে নতুনভাবে “সম্পদ কর” চালুর পরিকল্পনা করছে সরকার। এতে প্রচলিত সারচার্জ ব্যবস্থার অবসান ঘটতে পারে এবং সম্পদের প্রকৃত বাজারমূল্যের ভিত্তিতে কর নির্ধারণের নতুন যুগে প্রবেশ করতে পারে দেশ।

এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে রাজধানীর গুলশান, বনানী, ধানমন্ডি, বারিধারা এবং চট্টগ্রামের খুলশী ও আগ্রাবাদের মতো অভিজাত এলাকার উচ্চসম্পদশালী নাগরিকদের কাছ থেকে রাজস্ব আদায় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে বলে আশা করছে সরকার।

এ বিষয়ে কাজ করছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। সংস্থাটি মনে করছে, নতুন এই ব্যবস্থা চালু হলে কর ব্যবস্থায় ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা পাবে এবং কর বৈষম্য কমবে। ইতোমধ্যে “সম্পদ কর আইন” ও সংশ্লিষ্ট বিধিমালার একটি খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছে।

বর্তমানে প্রচলিত আয়কর আইনে একজন করদাতার মোট স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ চার কোটি টাকার বেশি হলে সারচার্জ দিতে হয়। এর মধ্যে বাড়ি, গাড়ি, ফ্ল্যাট, প্লট, কৃষি ও অকৃষি জমি অন্তর্ভুক্ত। সম্পদের পরিমাণ অনুযায়ী সারচার্জের হারও বাড়ে। চার কোটি টাকার বেশি সম্পদের ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ, দশ কোটি টাকার বেশি হলে ২০ শতাংশ, বিশ কোটি টাকার বেশি হলে ৩০ শতাংশ এবং পঞ্চাশ কোটি টাকার বেশি হলে ৩৫ শতাংশ হারে সারচার্জ ধার্য করা হয়।

তবে এই সারচার্জ আয়করের ওপর নির্ভর করে গণনা করা হয়, ফলে অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত সম্পদের তুলনায় করের পরিমাণ কম পড়ে। এই সীমাবদ্ধতা দূর করতেই সম্পদ কর চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, সম্পদের ওপর সরাসরি কর আরোপ করা হবে। চার কোটি থেকে দশ কোটি টাকার সম্পদের ক্ষেত্রে শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ হারে কর দিতে হবে। দশ থেকে বিশ কোটি টাকার মধ্যে এক শতাংশ, বিশ থেকে পঞ্চাশ কোটি টাকার মধ্যে এক দশমিক ৫০ শতাংশ এবং পঞ্চাশ কোটি টাকার বেশি সম্পদের ক্ষেত্রে দুই শতাংশ হারে কর নির্ধারণ করা হবে।

এক্ষেত্রে সম্পদের মূল্য নির্ধারণ করা হবে বাজারমূল্য বা মৌজা মূল্যের ভিত্তিতে। এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে কম দলিলমূল্য দেখিয়ে কর এড়ানোর প্রবণতা কমবে বলে মনে করছে কর প্রশাসন।

বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, নতুন ব্যবস্থায় একজন করদাতার মোট প্রদেয় করের চেয়ে সম্পদ কর বেশি হলে অতিরিক্ত পরিশোধ করতে হবে না। ফলে এটি সরাসরি বোঝা হিসেবে বিবেচিত হবে না, বরং একটি ভারসাম্যপূর্ণ কর কাঠামো হিসেবে কাজ করবে।

কর কর্মকর্তাদের মতে, এই পরিবর্তন কার্যকর হলে করদাতাদের ন্যূনতম কর প্রদানের নিশ্চয়তা তৈরি হবে এবং করভিত্তি আরও বিস্তৃত হবে। একই সঙ্গে দলিলমূল্যের পরিবর্তে মৌজা মূল্য ব্যবহারের ফলে অনেক অপ্রদর্শিত সম্পদ করের আওতায় আসবে।

সরকারের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে সারচার্জ থেকে কয়েকশ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হলেও নতুন ব্যবস্থায় তা কয়েকগুণ বাড়তে পারে। কর কর্মকর্তাদের ধারণা, সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে সম্পদ কর থেকে ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আদায় সম্ভব।

অর্থনীতিবিদদের মতে, উন্নত বিশ্বে সম্পদ কর একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজস্ব উৎস হিসেবে ব্যবহৃত হয়। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জাপান ও কানাডাসহ অনেক দেশেই জিডিপির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ সম্পদ কর থেকে আসে।

বাংলাদেশে এই সংস্কার বাস্তবায়িত হলে কর ব্যবস্থায় একটি বড় কাঠামোগত পরিবর্তন আসবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে তারা সতর্ক করে বলছেন, সম্পদের মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য না হলে কর ফাঁকি ও সম্পদ গোপনের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

অর্থনীতিবিদ ড. মাশরুর রিয়াজ মনে করেন, আয় ও সম্পদের ভিত্তিতে কর ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। তবে সম্পদের মূল্যায়ন পদ্ধতি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন না হলে নতুন সমস্যাও তৈরি হতে পারে।

সরকারি সূত্র বলছে, উচ্চপর্যায়ের অনুমোদন পেলে আসন্ন বাজেটেই এই নতুন সম্পদ কর কাঠামো অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এটি বাস্তবায়িত হলে দেশের কর ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বিবেচিত হবে।

সব মিলিয়ে, সম্পদ কর চালুর এই উদ্যোগকে অর্থনৈতিক ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা এবং রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর একটি বড় কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে এর সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়ন পদ্ধতি, প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং করদাতাদের আস্থা অর্জনের ওপর।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত