বন্ধ কারখানা চালুতে নতুন অর্থায়ন পরিকল্পনা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৪ মে, ২০২৬
  • ৫৬ বার
বাংলাদেশ ব্যাংক

প্রকাশ: ০৪ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ হয়ে থাকা শিল্পকারখানা পুনরায় সচল করে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং অর্থনীতিকে গতিশীল করার লক্ষ্যে স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই উদ্যোগকে দেশের শিল্প খাতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিকল্পনা অনুযায়ী, বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানাগুলোকে তাদের অবস্থার ওপর ভিত্তি করে তিনটি আলাদা ক্যাটাগরিতে বিভক্ত করে অর্থায়ন করা হবে। তবে এই বিশাল অর্থায়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নে সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় ব্যাংকগুলো সরকারের কাছ থেকে ক্রেডিট গ্যারান্টি সুবিধা চেয়েছে, যাতে ঋণ ঝুঁকি কমে এবং ব্যাংকিং খাত স্থিতিশীল থাকে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, এই উদ্যোগটি রাজনৈতিকভাবে ঘোষিত কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যকে সামনে রেখে নেওয়া হয়েছে। আগামী ১৮ মাসে ব্যাপক কর্মসংস্থান তৈরির পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বন্ধ শিল্পগুলো পুনরায় চালু করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি বাস্তবায়িত হলে দেশের বেকারত্ব পরিস্থিতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসতে পারে।

গত রোববার বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগে ২০টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের বিজনেস ও ক্রেডিট রিস্ক ম্যানেজমেন্ট বিভাগের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি গভর্নর কবির আহমেদ। এতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন এবং বন্ধ শিল্প পুনরায় চালুর বাস্তবায়ন কৌশল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, যেসব কারখানার গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ সচল আছে কিন্তু শুধুমাত্র কার্যকর মূলধনের অভাবে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে, তাদের জন্য স্বল্পমেয়াদি ঋণ সুবিধা দেওয়া হবে। অন্যদিকে যেসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বিদ্যুৎ-গ্যাস বিল বকেয়া থাকায় সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে, যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়েছে কিংবা বাজার হারিয়েছে, তাদের জন্য মধ্যমেয়াদি অর্থায়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে।

এছাড়া দীর্ঘদিন ধরে সম্পূর্ণভাবে বন্ধ থাকা এবং নতুন করে উৎপাদনে ফিরতে যাদের বড় ধরনের পুনর্বাসন, যন্ত্রপাতি স্থাপন এবং অবকাঠামো উন্নয়ন প্রয়োজন, তাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন সুবিধা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

তবে ব্যাংকগুলো এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে বেশ কিছু শর্ত ও নিরাপত্তা নিশ্চয়তার দাবি তুলেছে। তাদের প্রধান দাবি হলো, যদি এসব ঋণ ভবিষ্যতে খেলাপি বা ‘খারাপ ঋণ’-এ পরিণত হয়, তাহলে সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংক যেন এর দায়ভার গ্রহণ করে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত জামানত নিশ্চিত করা এবং কারখানার কার্যক্রম পর্যবেক্ষণে ব্যাংক কর্তৃক পরামর্শক নিয়োগের সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।

ব্যাংকিং খাতের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, অতীত অভিজ্ঞতা থেকে তারা এখন নতুন ঝুঁকি নিতে সতর্ক। তাদের মতে, পূর্ববর্তী সময়ে কিছু ব্যাংকিং খাতে অনিয়ম ও অর্থ পাচারের কারণে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে, যার প্রভাব এখনো রয়ে গেছে। বিশেষ করে করোনাকালে দেওয়া প্রণোদনা প্যাকেজের অর্থ পুরোপুরি আদায় না হওয়ায় ব্যাংকগুলোর আর্থিক সক্ষমতা কিছুটা দুর্বল হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা জানান, পুনঃঅর্থায়ন তহবিল ব্যবস্থার বিষয়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) কিছুটা নিরুৎসাহিত করছে। সংস্থাটির মতে, নতুন করে পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন না করে বরং বিদ্যমান ব্যবস্থাগুলো ধীরে ধীরে পুনর্গঠন ও সীমিত করা উচিত। এই কারণে বাংলাদেশ ব্যাংককে নীতিগতভাবে কিছু সীমাবদ্ধতার মধ্যেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে বন্ধ কারখানা পুনরায় চালুর সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য ১৯ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করেছে। কমিটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে, যেখানে অর্থায়নের কাঠামো, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং বাস্তবায়ন কৌশল অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

নতুন গভর্নর দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই শিল্প খাত পুনরুজ্জীবনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন বলে জানা গেছে। তিনি সম্প্রতি একাধিক বৈঠকে জানিয়েছেন, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হলে বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্পগুলো পুনরায় চালু করা অত্যন্ত জরুরি।

অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, এই উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের উৎপাদন খাতে নতুন গতি আসবে এবং হাজার হাজার মানুষের জন্য নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। বিশেষ করে যেসব শিল্প রাজনৈতিক অস্থিরতা বা আর্থিক সংকটে বন্ধ হয়ে গেছে, সেগুলো পুনরায় চালু হলে অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

তবে তারা সতর্ক করে বলেছেন, শুধু অর্থায়নই যথেষ্ট নয়, বরং স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং সঠিক তদারকি নিশ্চিত না হলে এই উদ্যোগও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। তাই ব্যাংক, সরকার এবং উদ্যোক্তাদের মধ্যে সমন্বিত সহযোগিতা অত্যন্ত জরুরি।

সব মিলিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের এই নতুন অর্থায়ন পরিকল্পনা দেশের শিল্প পুনরুদ্ধার ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির ক্ষেত্রে একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এখন এর বাস্তবায়ন কতটা সফল হয়, সেটিই দেখার বিষয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত