আবহাওয়ার বিরূপ প্রভাবে বাড়ছে হামের সংক্রমণ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৪ মে, ২০২৬
  • ১৪ বার
আবহাওয়ায় বাড়ছে হাম সংক্রমণ

প্রকাশ: ০৪ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশজুড়ে আবারও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে হাম রোগের সংক্রমণ। কখনো তীব্র গরম, কখনো টানা বৃষ্টি— আবহাওয়ার এমন অস্বাভাবিক ওঠানামার মধ্যেই শিশুদের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে সংক্রামক এই রোগ। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে প্রতিদিনই বাড়ছে হামে আক্রান্ত শিশুদের সংখ্যা। চিকিৎসকরা বলছেন, শুধু হাম নয়, সামনের কয়েক বছরে ডায়রিয়া ও নিউমোনিয়ার প্রকোপও বাড়তে পারে। ফলে এখনই জনসচেতনতা ও স্বাস্থ্যসুরক্ষায় জোর না দিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।

রাজধানীর ডিএনসিসি ডেডিকেটেড হাসপাতালসহ দেশের কয়েকটি সরকারি হাসপাতালে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে শিশু রোগীর চাপ বেড়েছে। চিকিৎসকদের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিনই নতুন নতুন শিশু ভর্তি হচ্ছে জ্বর, ঠান্ডা, কাশি ও শরীরে লালচে ফুসকুড়ির উপসর্গ নিয়ে। অনেক ক্ষেত্রে প্রাথমিকভাবে সাধারণ ভাইরাল জ্বর মনে হলেও পরে সেটি হাম হিসেবে শনাক্ত হচ্ছে। এতে অভিভাবকদের মধ্যেও তৈরি হয়েছে আতঙ্ক।

সোমবার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, রাজধানীর ডিএনসিসি ডেডিকেটেড হাসপাতালে একদিনেই নতুন করে ১২৮ জন শিশু ভর্তি হয়েছে। একই সময়ে চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরেছে প্রায় ১০০ জন। যদিও চিকিৎসকরা বলছেন, অধিকাংশ শিশু সময়মতো চিকিৎসা পেলে সুস্থ হয়ে উঠছে, তবে যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম কিংবা যারা টিকার বাইরে রয়েছে, তাদের ঝুঁকি অনেক বেশি।

চিকিৎসকদের মতে, বর্তমান আবহাওয়ার অস্বাভাবিক পরিবর্তন শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিচ্ছে। দিনের বেলায় তীব্র গরম এবং সন্ধ্যার পর বৃষ্টি বা ঠান্ডা পরিবেশের কারণে ভাইরাসজনিত সংক্রমণ দ্রুত ছড়াচ্ছে। বিশেষ করে জনবহুল এলাকায় বসবাসকারী শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ বেশি দেখা যাচ্ছে। স্কুল, খেলার মাঠ, গণপরিবহন কিংবা পরিবারের অন্য সদস্যদের মাধ্যমেও ভাইরাস সহজে ছড়িয়ে পড়ছে।

ডিএনসিসি ডেডিকেটেড হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা ডা. আসিফ হায়দার বলেন, চলমান আবহাওয়ার প্রভাব শিশুদের ওপর ব্যাপকভাবে পড়ছে। কয়েকদিনের টানা গরমের পর হঠাৎ বৃষ্টি হওয়ার কারণে ভাইরাসের বিস্তার বাড়ছে। তবে চলমান টিকাদান কর্মসূচির চার সপ্তাহ পার হলে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসবে বলে আশা করছেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, সামনের দুই থেকে তিন বছর শিশুদের জন্য বাড়তি সতর্কতার সময় হতে পারে। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া ও অন্যান্য সংক্রামক রোগের প্রকোপ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই এখন থেকেই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা, নিরাপদ খাবার নিশ্চিত করা এবং শিশুদের সময়মতো টিকা দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি ভাইরাসজনিত রোগ। আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশির মাধ্যমে ভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণত প্রথমে জ্বর, সর্দি, কাশি, চোখ লাল হওয়া এবং পরে শরীরে লাল ফুসকুড়ি দেখা দেয়। অনেক সময় নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া বা মস্তিষ্কে সংক্রমণের মতো জটিলতাও তৈরি হতে পারে। অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি।

রাজধানীর শিশু হাসপাতালগুলোতেও রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় চিকিৎসক ও নার্সদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। হাসপাতালের বেড সংকটের পাশাপাশি অনেক জায়গায় আইসোলেশন ইউনিটেও চাপ বাড়ছে। স্বাস্থ্যকর্মীরা বলছেন, সংক্রমণ ঠেকাতে হাসপাতালগুলোতে বিশেষ সতর্কতা নেওয়া হচ্ছে। আক্রান্ত শিশুদের আলাদা ওয়ার্ডে রাখা হচ্ছে এবং অভিভাবকদেরও মাস্ক ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

অভিভাবকদের অনেকে বলছেন, কয়েকদিন আগেও তারা বিষয়টিকে সাধারণ মৌসুমি জ্বর ভেবেছিলেন। কিন্তু পরে শিশুদের শরীরে ফুসকুড়ি দেখা দিলে হাসপাতালে নিয়ে আসেন। রাজধানীর মিরপুরের বাসিন্দা এক অভিভাবক জানান, তার ছেলের কয়েকদিন ধরে জ্বর ও কাশি ছিল। পরে শরীরে লালচে দাগ দেখা দিলে চিকিৎসক হাম শনাক্ত করেন। তিনি বলেন, “এত দ্রুত অবস্থা খারাপ হবে ভাবিনি। এখন বুঝতে পারছি টিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।”

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, চলমান টিকাদান কর্মসূচিকে আরও জোরদার করা হয়েছে। যেসব এলাকায় টিকার আওতার বাইরে শিশু রয়েছে, সেখানে বিশেষ ক্যাম্পেইন পরিচালনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কমিউনিটিতে সচেতনতামূলক প্রচার চালানো হচ্ছে। তবে শুধু সরকারি উদ্যোগ নয়, পরিবারকেও সচেতন হতে হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

চিকিৎসকরা পরামর্শ দিচ্ছেন, শিশুদের বাইরে নিয়ে গেলে পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে হবে। জ্বর বা কাশিতে আক্রান্ত শিশুকে ভিড় এড়িয়ে চলতে হবে। শিশুকে পর্যাপ্ত পানি, পুষ্টিকর খাবার ও বিশ্রাম দিতে হবে। একই সঙ্গে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ ব্যবহার না করারও আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশে সংক্রামক রোগের ধরন ও বিস্তার বদলে যাচ্ছে। আগে নির্দিষ্ট মৌসুমে যেসব রোগ দেখা যেত, এখন সেগুলো প্রায় সারা বছরই ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে স্বাস্থ্যখাতকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে। শুধু হাসপাতাল বাড়ালেই হবে না, প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালী করাও জরুরি।

এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও হাম নিয়ে নানা গুজব ও ভুল তথ্য ছড়াতে দেখা যাচ্ছে। চিকিৎসকরা বলছেন, এসব বিভ্রান্তিকর তথ্যের কারণে অনেকে টিকা নিতে অনীহা দেখান, যা পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে। তারা সবাইকে সরকারি স্বাস্থ্য নির্দেশনা অনুসরণ এবং গুজবে কান না দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

বর্তমান পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যসচেতনতা, সময়মতো টিকাদান এবং পরিচ্ছন্ন জীবনযাপনই হতে পারে হাম প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়। শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র— সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত