প্রকাশ: ৬ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
নাটোরের Naldanga Upazila জুড়ে দ্রুত বিস্তার লাভ করছে এক নীরব কিন্তু মারাত্মক হুমকি—বিষাক্ত পার্থেনিয়াম গাছ। দেখতে সাধারণ আগাছার মতো হলেও এই উদ্ভিদ এখন স্থানীয় কৃষি, জনস্বাস্থ্য এবং গবাদিপশুর জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে। বিশেষ করে উপজেলার সড়কের পাশে, খোলা জমিতে এবং Halti Beel-এর তীরবর্তী এলাকায় এর ব্যাপক বিস্তার লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা স্থানীয়দের মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, সাদা ফুলে ভরা এই গাছগুলো প্রথম দেখায় নিরীহ মনে হলেও বাস্তবে এগুলো অত্যন্ত ক্ষতিকর। ক্ষেত-খামার, রাস্তার ধারে কিংবা বিলের পাড়ে যত্রতত্র গজিয়ে ওঠা এই আগাছা কৃষকদের দৈনন্দিন জীবনে নতুন এক ভোগান্তির নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে। জমিতে কাজ করতে গিয়ে কিংবা গবাদিপশু চরাতে গিয়ে অনেকেই এর সংস্পর্শে এসে শারীরিক সমস্যায় পড়ছেন।
স্থানীয় কৃষক আব্দুর রহিম জানান, এই গাছের সংস্পর্শে এলেই তীব্র চুলকানি শুরু হয়, যা পরবর্তীতে ফোসকা পড়ে ঘায়ে পরিণত হয়। তার ভাষায়, “দেখতে সুন্দর হলেও এই গাছ আসলে বিষের মতো কাজ করে। জমিতে নামলেই ভয় লাগে এখন।” একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান আরেক কৃষক আব্দুল করিম। তিনি বলেন, কয়েক মাস আগেও এই গাছ এতটা ছড়ায়নি, কিন্তু এখন এটি দ্রুত এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ছড়িয়ে পড়ছে এবং কৃষিকাজকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পার্থেনিয়াম শুধু একটি আগাছা নয়, এটি একটি আক্রমণাত্মক প্রজাতি, যা খুব দ্রুত বিস্তার লাভ করে এবং স্থানীয় পরিবেশের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। পরিবেশবাদী সংগঠন Sobuj Bangla-এর সাধারণ সম্পাদক ফজলে রাব্বী জানান, এই গাছের বীজ মূলত বিদেশ থেকে আমদানি করা গমের সঙ্গে দেশে প্রবেশ করেছে। একবার কোনো এলাকায় এটি জন্মালে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং অন্যান্য উদ্ভিদের বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত করে।
তার মতে, এই গাছ সময়মতো নিয়ন্ত্রণ না করা গেলে স্থানীয় প্রাণবৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারণ, পার্থেনিয়াম মাটির পুষ্টি শোষণ করে এবং আশপাশের উদ্ভিদের বৃদ্ধি রোধ করে। ফলে ধীরে ধীরে ফসলি জমির উৎপাদনশীলতা কমে যেতে পারে।
গবাদিপশুর জন্যও এই গাছ সমানভাবে বিপজ্জনক। Naldanga Upazila-এর প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) ডা. পারভেজ হোসেন বলেন, গরু বা ছাগল যদি ভুলবশত এই গাছ খেয়ে ফেলে, তাহলে তাদের শরীরে নানা জটিলতা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে ত্বকের সমস্যা, হজমজনিত জটিলতা এবং পেট ফেঁপে ওঠার মতো লক্ষণ দেখা যায়, যা সময়মতো চিকিৎসা না পেলে মৃত্যুর কারণও হতে পারে। তিনি দ্রুত চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দিয়ে বলেন, এ ধরনের ঘটনা ঘটলে দেরি না করে প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ে যোগাযোগ করা জরুরি।
অন্যদিকে কৃষি বিভাগও এই আগাছার ভয়াবহতা নিয়ে উদ্বিগ্ন। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সবুজ আলী জানান, পার্থেনিয়াম গাছের কারণে কৃষকদের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের চর্মরোগ দেখা দিচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে এর সংস্পর্শে থাকলে শ্বাসকষ্ট, অ্যালার্জি এবং অন্যান্য জটিল রোগের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। তিনি আরও জানান, একটি পার্থেনিয়াম গাছ থেকে প্রায় পাঁচ হাজার নতুন গাছ জন্মাতে পারে, যা এর বিস্তারকে অত্যন্ত দ্রুত ও নিয়ন্ত্রণহীন করে তোলে।
বর্তমানে এই গাছ মূলত রাস্তার ধারে এবং পরিত্যক্ত জমিতে বেশি দেখা গেলেও যদি এটি ফসলি জমিতে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠবে। কারণ, এটি মাটির উর্বরতা নষ্ট করে এবং অন্যান্য ফসলের উৎপাদন কমিয়ে দেয়। ফলে কৃষকদের অর্থনৈতিক ক্ষতির পাশাপাশি খাদ্য নিরাপত্তাও হুমকির মুখে পড়তে পারে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় কৃষি বিভাগ বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছে বলে জানা গেছে। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, শুধুমাত্র সরকারি উদ্যোগে এই আগাছা পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব নয়। এজন্য প্রয়োজন স্থানীয় জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ। কৃষকদের নিজ নিজ জমি ও আশপাশের এলাকা থেকে এই গাছ উপড়ে ফেলার জন্য আহ্বান জানানো হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পার্থেনিয়াম নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি। একদিকে যেমন সচেতনতা বাড়াতে হবে, অন্যদিকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। এই গাছ উপড়ে ফেলার সময় হাত ও শরীর ঢেকে রাখা, সরাসরি স্পর্শ এড়িয়ে চলা এবং নিরাপদ উপায়ে ধ্বংস করা—এসব বিষয়েও সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন।
স্থানীয়দের মধ্যে ইতোমধ্যে এ নিয়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, সময়মতো ব্যবস্থা না নিলে এটি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধদের জন্য এটি বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
সব মিলিয়ে, Naldanga Upazila-এ পার্থেনিয়াম গাছের বিস্তার একটি নীরব সংকটের রূপ নিচ্ছে। এটি শুধু একটি পরিবেশগত সমস্যা নয়, বরং জনস্বাস্থ্য, কৃষি ও অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি বড় চ্যালেঞ্জ। দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ না নিলে এই সমস্যা ভবিষ্যতে আরও বড় বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।