জেলেনস্কির ঘনিষ্ঠ সহযোগীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১২ মে, ২০২৬
  • ১৩ বার
জেলেনস্কির ঘনিষ্ঠ সহযোগীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ

প্রকাশ: ১২ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাশিয়ার সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের মধ্যেই নতুন এক রাজনৈতিক অস্থিরতার মুখে পড়েছে Ukraine। যুদ্ধ, অর্থনৈতিক চাপ এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সংকট সামাল দিতে ব্যস্ত কিয়েভ প্রশাসনের জন্য এবার বড় ধরনের বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে দুর্নীতির অভিযোগ ঘিরে। দেশটির প্রেসিডেন্ট Volodymyr Zelenskyy-এর ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং সাবেক চিফ অব স্টাফ Andriy Yermak-এর বিরুদ্ধে অর্থপাচার ও দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ইউক্রেনের দুর্নীতি দমন সংস্থাগুলো তাকে একটি বড় অপরাধী চক্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে সন্দেহ করছে। অভিযোগের পর দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোড়ন তৈরি হয়েছে।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, প্রায় ১০.৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার পাচারের সঙ্গে জড়িত ছিলেন ইয়েরমাক। কিয়েভের উপকণ্ঠে একটি বিলাসবহুল আবাসন প্রকল্পকে কেন্দ্র করে এই অর্থ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। তদন্তকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই প্রকল্পের আড়ালে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিভিন্ন অফশোর নেটওয়ার্কের মাধ্যমে স্থানান্তর করা হয়েছে। যদিও ইয়েরমাক এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন, তবে স্থানীয় গণমাধ্যম ও তদন্ত সংস্থাগুলোর অনেকেই মনে করছেন, তিনি এই চক্রের মূল পরিকল্পনাকারীদের একজন।

ইয়েরমাক দীর্ঘদিন ধরেই ইউক্রেনের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির পর রাষ্ট্র পরিচালনায় সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে তাকে বিবেচনা করা হতো। আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচিত কোনো রাজনৈতিক পদে না থাকলেও যুদ্ধকালীন সিদ্ধান্ত, আন্তর্জাতিক কূটনীতি এবং রাশিয়ার সঙ্গে শান্তি আলোচনার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তার ভূমিকা ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী। এমনকি অনেকেই তাকে ‘কিয়েভের ছায়া ক্ষমতাকেন্দ্র’ বলেও উল্লেখ করতেন।

সাবেক চলচ্চিত্র প্রযোজক হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করা ইয়েরমাক পরে জেলেনস্কির ঘনিষ্ঠ মহলে প্রবেশ করেন। জেলেনস্কি নিজেও রাজনীতিতে আসার আগে বিনোদন জগতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সেই সূত্রেই দুজনের ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। পরে জেলেনস্কি ক্ষমতায় এলে দ্রুতই রাষ্ট্রীয় কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠেন ইয়েরমাক। যুদ্ধ শুরুর পর আন্তর্জাতিক নেতাদের সঙ্গে আলোচনায়, অস্ত্র সহায়তা নিশ্চিত করতে এবং পশ্চিমা বিশ্বকে ইউক্রেনের পক্ষে রাখার কূটনৈতিক প্রচেষ্টায়ও তাকে গুরুত্বপূর্ণ মুখ হিসেবে দেখা গেছে।

তবে গত কয়েক বছরে ইউক্রেনের রাজনীতিতে দুর্নীতির অভিযোগ নতুন করে বড় ইস্যু হয়ে ওঠে। যুদ্ধকালীন বিপুল আন্তর্জাতিক সহায়তা, পুনর্গঠন তহবিল এবং সামরিক ব্যয়ের মধ্যে স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করে বিরোধীরা। সাধারণ জনগণের মধ্যেও ক্ষোভ বাড়তে থাকে। সেই চাপের মুখেই গত বছর পদত্যাগ করেন ইয়েরমাক। যদিও তখন আনুষ্ঠানিকভাবে তার বিরুদ্ধে কোনো অপরাধ প্রমাণিত হয়নি, তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেছিলেন, জনরোষ কমাতেই তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়।

এবার নতুন তদন্ত তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে। ইউক্রেনের দুর্নীতি দমন সংস্থাগুলো বলছে, তারা উচ্চ পর্যায়ের দুর্নীতির বিরুদ্ধে বড় ধরনের অভিযান চালাচ্ছে। এই তদন্ত সেই বৃহত্তর অভিযানেরই অংশ। এর আগে রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থাকে ঘিরেও প্রায় ১০০ মিলিয়ন ডলারের ঘুষ কেলেঙ্কারির অভিযোগ সামনে আসে। সেই মামলায়ও জেলেনস্কি প্রশাসনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তার নাম উঠে আসে। ফলে একের পর এক অভিযোগে সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হচ্ছে।

যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ইউক্রেনের জন্য বিষয়টি বিশেষভাবে স্পর্শকাতর। কারণ পশ্চিমা বিশ্ব থেকে সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা পেতে হলে আন্তর্জাতিক আস্থা ধরে রাখা অত্যন্ত জরুরি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরেই ইউক্রেনকে দুর্নীতিবিরোধী সংস্কার জোরদারের আহ্বান জানিয়ে আসছে। বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগদানের প্রক্রিয়ায় দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণকে অন্যতম বড় শর্ত হিসেবে দেখা হয়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের মধ্যেও ইউক্রেনের জনগণ দুর্নীতির বিরুদ্ধে আগের চেয়ে বেশি সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে। কারণ সাধারণ মানুষ যখন যুদ্ধের ভয়াবহতা, অর্থনৈতিক সংকট এবং নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে জীবন কাটাচ্ছেন, তখন ক্ষমতার শীর্ষ পর্যায়ে দুর্নীতির অভিযোগ জনমনে হতাশা বাড়াচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, আন্তর্জাতিক সহায়তার অর্থ সঠিকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে কি না।

এদিকে প্রেসিডেন্টের কার্যালয় এখনও সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। তারা জানিয়েছে, আইনি প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করা হবে না। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সরকার এখন অত্যন্ত জটিল পরিস্থিতির মুখে রয়েছে। একদিকে যুদ্ধ পরিচালনা, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ধরে রাখা এবং একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ দুর্নীতির অভিযোগ মোকাবিলা— সব মিলিয়ে কিয়েভ প্রশাসনের ওপর চাপ বাড়ছে।

রাশিয়াও এই পরিস্থিতিকে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগানোর চেষ্টা করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মস্কো দীর্ঘদিন ধরেই দাবি করে আসছে যে, ইউক্রেনের রাষ্ট্রীয় কাঠামো দুর্নীতিগ্রস্ত। পশ্চিমা সহায়তার অর্থ অপব্যবহার হচ্ছে বলেও রুশ প্রচারণায় বারবার বলা হয়েছে। ফলে নতুন এই অভিযোগ আন্তর্জাতিক প্রচারযুদ্ধে রাশিয়ার হাত শক্ত করতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

তবে ইউক্রেনের একটি অংশ মনে করছে, এই তদন্তই প্রমাণ করে দেশটি দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আগ্রহী। কারণ যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতেও উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে তদন্ত চালানো সহজ সিদ্ধান্ত নয়। অনেকের মতে, এর মাধ্যমে কিয়েভ প্রশাসন পশ্চিমা মিত্রদের কাছে একটি বার্তা দিতে চাইছে যে, তারা জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

সব মিলিয়ে আন্দ্রি ইয়েরমাককে ঘিরে নতুন এই অর্থপাচার ও দুর্নীতির অভিযোগ শুধু একজন সাবেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্ত নয়, বরং এটি এখন ইউক্রেনের রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা, আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি এবং যুদ্ধকালীন নেতৃত্বের ওপরও বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তদন্তের চূড়ান্ত ফল কী হবে, সেটি সময়ই বলে দেবে। তবে এই মুহূর্তে কিয়েভের রাজনৈতিক অঙ্গনে যে তীব্র চাপ ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তা স্পষ্টভাবেই অনুভূত হচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত