রেমিট্যান্সে বড় উল্লম্ফন, রিজার্ভে ফিরছে স্বস্তি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১২ মে, ২০২৬
  • ৯ বার
রেমিট্যান্সে বড় উল্লম্ফন, রিজার্ভে ফিরছে স্বস্তি

প্রকাশ: ১২ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের অর্থনীতিতে আবারও ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, আমদানি ব্যয়ের চাপ এবং ডলার সংকটের মধ্যেও চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে রেমিট্যান্স প্রবাহে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে বেড়েছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, প্রবাসী আয়ের এই ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

Bangladesh Bank-এর হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, ১১ মে পর্যন্ত দেশের বৈদেশিক মুদ্রার গ্রস রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৪ দশমিক ২২৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ কয়েক লাখ কোটি টাকার সমান। যদিও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসারে হিসাব করা রিজার্ভ কিছুটা কম। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা International Monetary Fund-এর বিপিএম৬ পদ্ধতি অনুযায়ী বর্তমানে দেশের ব্যবহারযোগ্য বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ রয়েছে ২৯ দশমিক ৫৬৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

বিশ্লেষকদের মতে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের এই অবস্থান বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আমদানি ব্যয় মেটানো, আন্তর্জাতিক লেনদেন, ঋণ পরিশোধ এবং ডলারের বাজার স্থিতিশীল রাখতে রিজার্ভ বড় ভূমিকা পালন করে। গত কয়েক বছরে বৈশ্বিক জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কারণে বাংলাদেশের রিজার্ভে চাপ তৈরি হয়েছিল। সেই প্রেক্ষাপটে সাম্প্রতিক প্রবৃদ্ধি অর্থনীতির জন্য আশাব্যঞ্জক বলে মনে করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ৯ মে পর্যন্ত দেশে মোট ৩০ দশমিক ৩৬২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের রেমিট্যান্স এসেছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে যার পরিমাণ ছিল ২৫ দশমিক ৪০১ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ১৯ দশমিক ৫ শতাংশ। অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে অন্যতম শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি।

শুধু মে মাসের শুরুতেই রেমিট্যান্স প্রবাহে ইতিবাচক ধারা দেখা গেছে। চলতি বছরের ১ থেকে ৯ মে পর্যন্ত দেশে এসেছে ১ দশমিক ০২৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। গত বছরের একই সময়ে যা ছিল ৮৬৪ মিলিয়ন ডলার। সে হিসাবে মাসভিত্তিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ১৯ দশমিক ১ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, শুধু ৭ থেকে ৯ মে এই তিন দিনেই দেশে এসেছে প্রায় ২৭৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের রেমিট্যান্স।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৈধ চ্যানেলে টাকা পাঠাতে সরকারের বিভিন্ন প্রণোদনা এই প্রবৃদ্ধির অন্যতম কারণ। বর্তমানে বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠালে প্রবাসীরা নগদ প্রণোদনা পাচ্ছেন, যা অনেককেই ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠাতে উৎসাহিত করছে। একই সঙ্গে ব্যাংকিং সেবার সহজীকরণ, ডিজিটাল লেনদেন বৃদ্ধি এবং মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের সম্প্রসারণও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী আয়ের অবদান দীর্ঘদিন ধরেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে কর্মরত কোটি প্রবাসী বাংলাদেশি তাদের উপার্জনের একটি বড় অংশ দেশে পাঠান। এই অর্থ দেশের লাখো পরিবারের জীবনযাত্রা সচল রাখার পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতিতেও বড় অবদান রাখে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, রেমিট্যান্স শুধু বৈদেশিক মুদ্রার উৎস নয়, এটি দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও সচল রাখে। গ্রামীণ অর্থনীতি, আবাসন খাত, ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং ভোগব্যয়ের বড় অংশই প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরশীল। ফলে রেমিট্যান্স বাড়লে বাজারে অর্থের প্রবাহ বাড়ে এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রমও গতিশীল হয়।

তবে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়লেও এখনও কিছু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। অনেকে এখনও হুন্ডি বা অবৈধ চ্যানেলে অর্থ পাঠান। বৈধ পথে অর্থ পাঠানোর প্রক্রিয়া আরও সহজ ও দ্রুত করা গেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ আরও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে বিদেশে কর্মসংস্থানের নতুন বাজার তৈরি এবং দক্ষ জনশক্তি পাঠানোর ওপরও জোর দিচ্ছেন তারা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তারা বলছেন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ার পাশাপাশি রেমিট্যান্সের ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি ডলারের বাজারে স্থিতিশীলতা আনতে সহায়ক হবে। এতে আমদানিকারক, ব্যবসায়ী এবং ব্যাংকিং খাত কিছুটা স্বস্তি পেতে পারে। কারণ সাম্প্রতিক সময়ে ডলারের সংকট দেশের বিভিন্ন খাতে চাপ সৃষ্টি করেছিল।

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সামষ্টিক অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতায় রেমিট্যান্স বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বৈদেশিক মুদ্রার উৎসগুলোর একটি হয়ে উঠেছে। রপ্তানি আয়ের পাশাপাশি প্রবাসী আয়ের প্রবৃদ্ধি অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করছে। বিশেষ করে বৈশ্বিক মন্দার আশঙ্কা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতার মধ্যে এটি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এদিকে সরকারও প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানের ওপর গুরুত্ব বাড়িয়েছে। নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধান, দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ এবং ডিজিটাল রেমিট্যান্স ব্যবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে আরও বেশি বৈধ আয় দেশে আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী কয়েক বছরে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার অবস্থান আরও শক্তিশালী হতে পারে।

সব মিলিয়ে চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে প্রায় ২০ শতাংশ রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে উন্নতি দেশের অর্থনীতির জন্য বড় ইতিবাচক বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো এই অর্থ শুধু পরিবার নয়, পুরো জাতীয় অর্থনীতিকেই নতুন করে শক্তি জোগাচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত