প্রকাশ: ৫ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির প্রেক্ষাপটে উত্তর কোরিয়া ও চীনের সম্পর্ক এক নতুন মোড় নিতে যাচ্ছে। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং আগামী ৮ ও ৯ জুন উত্তর কোরিয়া রাষ্ট্রীয় সফরে যাচ্ছেন। কিম জং উনের আমন্ত্রণে এই সফরটি এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে যখন কোরীয় উপদ্বীপ এবং বৈশ্বিক রাজনীতিতে এক অস্থির পরিস্থিতি বিরাজ করছে। চীনের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন সিসিটিভির মাধ্যমে এই সফরের ঘোষণা আসার পর থেকেই বিশ্বজুড়ে কূটনৈতিক মহলে জল্পনা-কল্পনার নতুন ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। বেইজিং ও পিয়ংইয়ংয়ের এই গভীর ও ঐতিহাসিক সম্পর্ক কেবল ভৌগোলিক নৈকট্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত।
কিম জং উনের আমন্ত্রণে চীনা প্রেসিডেন্টের এই সফর অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। পশ্চিমা বিশ্বের চাপ, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে চলমান উত্তেজনার মাঝে উত্তর কোরিয়া কার্যত বহির্বিশ্বের থেকে বিচ্ছিন্ন একটি রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। এমতাবস্থায়, চীনের মতো একটি বিশ্বশক্তির প্রধানের এই সফর পিয়ংইয়ংয়ের জন্য অত্যন্ত সম্মানজনক এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই সফরে দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, নিরাপত্তা ইস্যু এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী কোনো আলোচনার ভিত্তি তৈরি হতে পারে। বেইজিং দীর্ঘদিন ধরেই পিয়ংইয়ংয়ের কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক সুরক্ষার প্রধান উৎস হিসেবে কাজ করে আসছে।
উত্তর কোরিয়ায় চীনা প্রেসিডেন্টের সফর ইতিহাসবিচারে বেশ বিরল। সর্বশেষ ২০১৯ সালে শি জিনপিং পিয়ংইয়ং সফর করেছিলেন, যা ছিল ২০০৫ সালের পর কোনো চীনা নেতার প্রথম সফর। এর আগে দীর্ঘ ১৪ বছর বিরতি ছিল এই ধরনের উচ্চপর্যায়ের সফরের। বিপরীতক্রমে, কিম জং উন চীনের সঙ্গে সম্পর্ক সুদৃঢ় করতে বেশ কয়েকবার বেইজিং ভ্রমণ করেছেন। গত বছরের সেপ্টেম্বরে তার সর্বশেষ চীন সফর ছিল অত্যন্ত আলোচিত, যেখানে শি জিনপিং তাকে লাল গালিচা সংবর্ধনা দিয়ে তাদের ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্কের গভীরতা প্রদর্শন করেছিলেন। মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের বিরুদ্ধে বিজয়ের ৮০তম বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত সামরিক কুচকাওয়াজে কিমের অংশ নেওয়া এবং সেখানে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে তার উপস্থিতি দুই দেশের মধ্যকার সামরিক ও রাজনৈতিক বন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করার ইঙ্গিত দেয়।
এই সফরের মানবিক এবং মনস্তাত্ত্বিক দিকটি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। উত্তর কোরিয়ার সাধারণ মানুষ, যারা চরম অর্থনৈতিক কষ্ট এবং আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতার মধ্য দিয়ে দিনাতিপাত করছে, তাদের জন্য এই সফর এক ধরনের আশার বার্তা বয়ে আনতে পারে। যদিও কোনো সরাসরি সাহায্য বা অর্থনৈতিক প্যাকেজের ঘোষণা এখনই আসবে কি না তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে, তবুও বিশ্বশক্তির মিত্রতা তাদের বর্তমান সংকটে কিছুটা হলেও সুরক্ষা কবজ হিসেবে কাজ করবে। কিম জং উনের জন্য এই সফর তার রাজনৈতিক ক্ষমতাকে অভ্যন্তরীণভাবে যেমন শক্তিশালী করবে, তেমনি বিশ্বমঞ্চে উত্তর কোরিয়ার বিচ্ছিন্নতার অভিযোগকে কিছুটা হলেও নমনীয় করার সুযোগ তৈরি করবে।
অন্যদিকে, বৈশ্বিক রাজনীতিতে চীনের এই অবস্থান পশ্চিমা বিশ্বের জন্য নতুন বার্তা। তাইওয়ান ইস্যু এবং চীন-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য আলোচনার জটিলতার মাঝে উত্তর কোরিয়া সফরে গিয়ে শি জিনপিং হয়তো এটিই বোঝাতে চাইছেন যে, এশীয় অঞ্চলে চীনের প্রভাব অপ্রতিদ্বন্দ্বী। রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে চীনের ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা একটি নতুন শক্তির অক্ষ তৈরির ইঙ্গিত দেয়, যা বিশ্ব রাজনীতিতে মেরুকরণের নতুন ধারা সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে পুতিন ও কিম জং উনের সাম্প্রতিক মেলবন্ধন এবং তাতে শি জিনপিংয়ের সরাসরি অংশগ্রহণ এই অঞ্চলের নিরাপত্তার সমীকরণ বদলে দিচ্ছে।
এই সফরে কী ধরনের গোপনীয় এজেন্ডা থাকতে পারে তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ থেকে শুরু করে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা পর্যন্ত অনেক কিছুই আলোচনার টেবিলে থাকতে পারে। তবে বাস্তবধর্মী কূটনৈতিক আলোচনায় সবসময়ই ভূ-রাজনৈতিক কৌশল প্রাধান্য পায়। শি জিনপিংয়ের এই সফর কি কোরীয় উপদ্বীপে শান্তি ফিরিয়ে আনবে, নাকি উত্তেজনার পারদ আরও বাড়াবে—সেই প্রশ্নের উত্তর কেবল সময়ের হাতেই। দুই নেতা যখন পিয়ংইয়ংয়ের মাটিতে মুখোমুখি হবেন, তখন সারা বিশ্বের নজর থাকবে তাদের সিদ্ধান্তের দিকে। এটি কেবল দুই দেশের সম্পর্কের উন্নয়ন নয়, বরং এটি উত্তর কোরিয়ার ভবিষ্যৎ গন্তব্য নির্ধারণে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন হিসেবেও দেখা হচ্ছে। এই সফরটি প্রমাণিত করবে যে, বিশ্ব রাজনীতির জটিল সমীকরণে উত্তর কোরিয়া একা নয়, বরং তাদের পাশে চীনের মতো এক শক্তিশালী বন্ধু সর্বদা অবিচল।