নানক-তাপসসহ ২৮ জনের বিরুদ্ধে বিচারিক সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৮ জুন, ২০২৬
  • ৩৪ বার
নানক-তাপসসহ ২৮ জনের বিরুদ্ধে বিচারিক সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু

প্রকাশ:  ০৮ জুন  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

জুলাই মাসের সেই উত্তাল দিনগুলো এখনো বাঙালির স্মৃতিতে দগদগে ক্ষতের মতো জেগে আছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় রাজধানী ঢাকার মোহাম্মদপুর এলাকায় যে ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছিল, তার বিচার প্রক্রিয়া আজ এক নতুন ও চূড়ান্ত পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আজ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হলো বহুল আলোচিত সেই মামলার সূচনা বক্তব্য ও সাক্ষ্যগ্রহণ পর্ব। সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসসহ মোট ২৮ জন প্রভাবশালী আসামির বিরুদ্ধে এই বিচারিক কার্যক্রম এখন পুরো দেশের নজর কেড়েছে। ন্যায়বিচারের প্রতীক্ষায় থাকা স্বজনদের কাছে আজকের এই দিনটি এক বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে এই মামলার কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। ট্রাইব্যুনালের এজলাসে আজ প্রসিকিউশন পক্ষের আইনজীবীরা প্রথমে তাদের সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন করেন। মামলার প্রেক্ষাপট, ঘটনার ভয়াবহতা এবং আসামিদের ভূমিকা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে তাদের বক্তব্যে। সূচনা বক্তব্য শেষে শুরু হয়েছে মামলার মূল সাক্ষ্যগ্রহণ পর্ব। প্রসিকিউশন পর্যায়ক্রমে সাক্ষীদের ট্রাইব্যুনালে হাজির করবেন, যারা জুলাই মাসের সেই অগ্নিঝরা দিনে মোহাম্মদপুরে কী ঘটেছিল, তা আদালতের সামনে সবিস্তারে বর্ণনা করবেন। এই সাক্ষ্যগ্রহণের মাধ্যমেই মামলার প্রকৃত সত্য উন্মোচিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

এই মামলায় অভিযুক্ত ২৮ জনের মধ্যে মাত্র চারজন বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। তারা হলেন নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের মোহাম্মদপুর থানা শাখার সভাপতি নাঈমুল হাসান রাসেল, সহসভাপতি সাজ্জাদ হোসেন, ওমর ফারুক এবং ফজলে রাব্বি। গত ১০ মে যখন ট্রাইব্যুনাল এই ২৮ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের আদেশ দিয়েছিলেন, তখন কারাগারে থাকা এই চার আসামি নিজেদের নির্দোষ দাবি করে ন্যায়বিচার প্রার্থনা করেছিলেন। এরপরই আদালত মামলার পরবর্তী কার্যক্রমের জন্য ৮ জুন তারিখটি ধার্য করেছিলেন। আজ তারা ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত রয়েছেন এবং তাদের আইনজীবীরা সাক্ষ্যগ্রহণের প্রতিটি পর্যায়ে কঠোর নজর রাখছেন। তবে বাকি আসামিরা এখনো পলাতক থাকায় তাদের অনুপস্থিতিতেই বিচার প্রক্রিয়া এগিয়ে চলেছে।

পলাতক আসামিদের তালিকায় রয়েছেন তৎকালীন ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান, সাবেক অ্যাডিশনাল ডিআইজি প্রলয় কুমার জোয়ারদার, ডিএমপির সাবেক যুগ্ম কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকারসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। এছাড়া তালিকায় রয়েছেন এডিসি রওশুনুল হক, এমএ সাত্তার, তোফায়েল, তারেকুজ্জামান, আরিফুর রহমান তুহিন, আহাদ হোসাইন, মো. ইউনূস, মোল্লা রুবেল, আজিজুল হক, রিয়াজ মাহমুদ, হৃদয়, মাইনুল ইসলাম, শেখ বজলুর রহমান, জহির উদ্দিন, আয়মান, সেন্টু মিয়া এবং ডিএনসিসির ৩২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর সৈয়দ হাসান নূর ইসলাম। তাদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের গুরুত্ব এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় এই বিচার প্রক্রিয়াকে অত্যন্ত সংবেদনশীল হিসেবে দেখছেন আইনি বিশেষজ্ঞরা।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সেই দিনগুলোতে মোহাম্মদপুরের রাজপথ যেভাবে লাশের মিছিলে ভারী হয়ে উঠেছিল, সেই নৃশংসতা আজও শিহরণ জাগায়। যারা রাজপথে নেমেছিল নিজেদের অধিকারের কথা বলতে, তাদের ওপর নির্বিচারে যে পৈশাচিক হামলা চালানো হয়েছিল, তার বিচার পাওয়া এখন কেবল আইনি বিষয় নয়, বরং এটি একটি জাতির নৈতিক দায়বদ্ধতা। নিহত ব্যক্তিদের স্বজনরা মাসের পর মাস ধরে অপেক্ষায় আছেন এই বিচারের। আজকের সাক্ষ্যগ্রহণ তাদের জন্য একটি বড় মাইলফলক। ট্রাইব্যুনালের আঙিনায় আজ যখন সাক্ষীরা ঘটনার বর্ণনা দেবেন, তখন হয়তো সেই ভয়াল দিনের অনেক অজানা কাহিনী বেরিয়ে আসবে, যা ভবিষ্যতে নজির হয়ে থাকবে।

এই বিচারের দিকে নজর রয়েছে দেশি ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল যেভাবে স্বচ্ছতার সঙ্গে পুরো বিষয়টি পরিচালনা করছেন, তা সাধারণ মানুষের মনে বিচার বিভাগ নিয়ে আস্থার জায়গাটিকে আরও দৃঢ় করবে বলে আশা করা হচ্ছে। প্রসিকিউশন পক্ষ তাদের অভিযোগের সপক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণাদি পেশ করার প্রস্তুতি নিয়েছেন। অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবীরাও তাদের মক্কেলদের সুরক্ষার জন্য আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। সত্য ও ন্যায়বিচারের এই যুদ্ধে শেষ পর্যন্ত কাদের জয় হবে, তা এখন সময়ের অপেক্ষা। বিচারের প্রতিটি ধাপ অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

মোহাম্মদপুরে ৯ জনকে হত্যার এই মামলা কেবল একটি ঘটনার বিচার নয়, বরং এটি জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে শহীদ হওয়া কয়েক হাজার মানুষের আত্মত্যাগের প্রতি সম্মান জানানোর একটি প্রক্রিয়া। বিচারক প্যানেলের সদস্যরা সব পক্ষের বক্তব্য শুনে এবং সাক্ষীদের জেরা করার সুযোগ দিয়ে একটি স্বচ্ছ ও পক্ষপাতহীন রায় প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। পলাতক আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে বিচারের মুখোমুখি করার ব্যাপারেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর চাপ বাড়ছে। আজ থেকে শুরু হওয়া এই সাক্ষ্যগ্রহণ পর্ব আগামী কয়েক দিন ধরে চলমান থাকবে, যেখানে প্রতিটি সাক্ষীর জবানবন্দি মামলার মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

সব মিলিয়ে, বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার ইতিহাসে আজকের এই দিনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি স্বাধীন বিচারিক প্যানেলের সামনে যখন ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়, তখন তা আইনের শাসনের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। মোহাম্মদপুরের সেই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়া প্রতিটি পরিবারের কাছে এই বিচার আজকের দিনটি নতুন আশার আলো হয়ে ধরা দিয়েছে। দেশের মানুষ এখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে সেই চূড়ান্ত রায়ের জন্য, যা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের রক্তঋণ কিছুটা হলেও লাঘব করবে এবং অপরাধীদের শাস্তির মাধ্যমে সমাজে দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত