সীমান্তের ৭ সংকটে সমাধানের আভাস নেই, হতাশ ঢাকা

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১১ জুন, ২০২৬
  • ৬ বার
সীমান্তের ৭ সংকট

সীমান্তের ৭ সংকটে সমাধানের আভাস নেই, হতাশ ঢাকা

প্রকাশ: ১১ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নিয়ে বহুল প্রত্যাশিত বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের ৫৭তম সীমান্ত সম্মেলন শেষ হলেও সীমান্তে চলমান প্রধান সংকটগুলোর কোনো বাস্তবসম্মত সমাধানের ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। চার দিনব্যাপী এই বৈঠককে ঘিরে ঢাকা যে প্রত্যাশা তৈরি করেছিল, সম্মেলন শেষে তার বড় অংশই অপূর্ণ থেকে গেছে বলে মনে করছেন কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলন ছিল বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের অধীনে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে প্রথম মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠক। ফলে সীমান্ত হত্যা, পুশইন, মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান, সীমান্ত অবকাঠামো নির্মাণ এবং সীমান্তবর্তী এলাকায় নিরাপত্তা সহযোগিতার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে ইতিবাচক অগ্রগতির প্রত্যাশা ছিল বাংলাদেশের।

বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী। তার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, ভূমি জরিপ অধিদপ্তর এবং যৌথ নদী কমিশনের কর্মকর্তারাও অংশ নেন। অপরদিকে বিএসএফ মহাপরিচালক প্রবীণ কুমারের নেতৃত্বে ভারতীয় প্রতিনিধিদলে দেশটির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

তবে বৈঠক শেষে পাওয়া প্রাথমিক মূল্যায়নে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের উত্থাপিত অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে ভারতীয় পক্ষ নির্দিষ্ট কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়নি। বরং পারস্পরিক সহযোগিতা, বিদ্যমান যোগাযোগব্যবস্থা এবং ভবিষ্যতে আলোচনা অব্যাহত রাখার মতো কূটনৈতিক বক্তব্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছে।

সীমান্ত হত্যা ইস্যু বরাবরের মতোই এবারের আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে সীমান্তে নিরস্ত্র নাগরিকদের প্রাণহানির বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়ে আসছে। সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনার উল্লেখ করে বিজিবি সীমান্তে প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগ বন্ধের দাবি জানায়। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সীমান্তে ‘জিরো কিলিং’ নীতি বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করা হলেও এ বিষয়ে সুস্পষ্ট কোনো অগ্রগতি হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

আরেকটি আলোচিত বিষয় ছিল পুশইন বা সীমান্ত দিয়ে জোরপূর্বক মানুষ ঠেলে পাঠানোর অভিযোগ। বাংলাদেশ দাবি করেছে, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় এমন একাধিক ঘটনা ঘটেছে, যা দুই দেশের মধ্যে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বৈঠকে বিষয়টি জোরালোভাবে উত্থাপন করা হলেও ভারতীয় পক্ষ অভিযোগের সঙ্গে একমত হয়নি। ফলে এ ইস্যুতেও কার্যকর সমাধানের পথ স্পষ্ট হয়নি।

মাদক চোরাচালান নিয়েও বাংলাদেশ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী এলাকা দিয়ে ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন মাদক দেশে প্রবেশের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা মাদকের উৎসস্থল বন্ধ এবং সমন্বিত অভিযান পরিচালনার ওপর জোর দেন। তবে সম্মেলন শেষে এ বিষয়ে কোনো দৃশ্যমান যৌথ উদ্যোগের ঘোষণা পাওয়া যায়নি।

একইভাবে অস্ত্র ও বিস্ফোরক চোরাচালান প্রতিরোধের বিষয়টিও আলোচনায় স্থান পায়। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অস্ত্র প্রবেশ দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি। তাই এ বিষয়ে আরও কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন হলেও বৈঠক থেকে তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির খবর আসেনি।

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সীমান্তবর্তী অঞ্চলে সক্রিয় সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং তাদের সম্ভাব্য আশ্রয়-প্রশ্রয়ের বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এ বিষয়ে বাংলাদেশ কিছু নির্দিষ্ট তথ্য ও অভিযোগ উপস্থাপন করেছে। তবে ভারতীয় পক্ষ বিষয়টি নিয়ে সরাসরি কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়নি এবং ভবিষ্যৎ সহযোগিতার আশ্বাসেই সীমাবদ্ধ থেকেছে।

সীমান্ত এলাকায় আন্তর্জাতিক বিধিমালা অনুসরণ করে অবকাঠামো নির্মাণের বিষয়টিও আলোচনায় আসে। বাংলাদেশ নোম্যানস ল্যান্ড ও সীমান্তবর্তী এলাকায় বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে। তবে এ ক্ষেত্রেও তাৎক্ষণিক কোনো সমাধান বা সমঝোতার খবর পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে ভারতীয় প্রতিনিধিদলও কিছু পাল্টা অভিযোগ উত্থাপন করেছে। সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া ক্ষতিগ্রস্ত করা, সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্যদের নিরাপত্তা এবং কথিত বিদ্রোহী গোষ্ঠীর বিষয়ে উদ্বেগের কথা জানানো হয়। ফলে আলোচনায় উভয় পক্ষের অবস্থান স্পষ্ট হলেও মতপার্থক্য দূর করার মতো কোনো যুগান্তকারী অগ্রগতি দেখা যায়নি।

বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রায় ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ বাংলাদেশ-ভারত স্থলসীমান্ত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সীমান্ত। এই সীমান্ত ঘিরে দুই দেশের লাখো মানুষের জীবন ও জীবিকা নির্ভরশীল। ফলে সীমান্ত ব্যবস্থাপনার যেকোনো সমস্যা শুধু নিরাপত্তা নয়, মানবিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপরও প্রভাব ফেলে।

কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এ ধরনের বৈঠকের গুরুত্ব রয়েছে কারণ এতে দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ ও আলোচনা অব্যাহত থাকে। তবে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত সমস্যাগুলোর ক্ষেত্রে দৃশ্যমান ফলাফল না এলে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা পূরণ হয় না। বিশেষ করে সীমান্ত হত্যা ও পুশইনের মতো সংবেদনশীল ইস্যুতে বাস্তব অগ্রগতি না হওয়ায় উদ্বেগ থেকেই যাচ্ছে।

নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ৫৭তম সীমান্ত সম্মেলন শেষ করে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল দেশে ফিরছে। তবে সীমান্তের সাতটি গুরুত্বপূর্ণ সংকটের অধিকাংশই আগের অবস্থায় রয়ে গেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে সীমান্ত নিরাপত্তা, মানবাধিকার এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের নানা প্রশ্ন আগামী দিনগুলোতেও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে।

বিস্তারিত জানতে ক্লিক করুন>> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত