প্রকাশ: ১১ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
উজানের ভারী বৃষ্টিপাত এবং পাহাড়ি ঢলের প্রভাবে লালমনিরহাটে তিস্তা নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। নদীর পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি পৌঁছায়ায় জেলার নদী তীরবর্তী এলাকাগুলোতে বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতির ওপর নজরদারি বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে নদী তীরবর্তী নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত কয়েকদিন ধরে উজান এলাকায় টানা বৃষ্টি এবং ভারতের বিভিন্ন অংশে ভারী বর্ষণের কারণে তিস্তা নদীতে পানির প্রবাহ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর প্রভাব ইতোমধ্যে লালমনিরহাট জেলার বিভিন্ন এলাকায় পড়তে শুরু করেছে। নদীর পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চরাঞ্চল ও নিম্নভূমিতে জলাবদ্ধতার আশঙ্কাও বৃদ্ধি পেয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তিস্তা ব্যারাজ পয়েন্টসহ নদীর বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের তথ্য নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। পানি বৃদ্ধির বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে কিছু এলাকায় নদীর তীর উপচে পানি প্রবেশ করতে পারে। যদিও এখনো বড় ধরনের বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি, তবে পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তন হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
তিস্তা নদী অববাহিকার বাসিন্দারা বলছেন, বর্ষা মৌসুম শুরু হলেই নদীর পানি বৃদ্ধি নিয়ে তাদের উদ্বেগ বাড়ে। কারণ অতীতের বিভিন্ন সময়ে হঠাৎ পানি বৃদ্ধি পেয়ে চরাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে এবং হাজারো পরিবার ক্ষতির মুখে পড়েছে। ফলে এবারও নদীর পানি বাড়ার খবর তাদের মধ্যে নতুন করে উৎকণ্ঠা তৈরি করেছে।
নদী তীরবর্তী এলাকার কৃষকরাও পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন। অনেক স্থানে আউশ ধান, সবজি এবং অন্যান্য মৌসুমি ফসলের আবাদ রয়েছে। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে এসব ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কৃষকরা বলছেন, মৌসুমের শুরুতেই বন্যা দেখা দিলে তাদের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হতে পারে।
স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সম্ভাব্য বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। আশ্রয়কেন্দ্রগুলো প্রস্তুত রাখা হয়েছে এবং ইউনিয়ন পর্যায়ের জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে জনগণকে সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী মানুষদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার বিষয়ে সচেতন করা হচ্ছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমানে নদীর পানি বৃদ্ধির হারই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যদি উজানে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকে এবং পাহাড়ি ঢলের চাপ আরও বাড়ে, তাহলে স্বল্প সময়ের মধ্যে পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করতে পারে। সে কারণে আগাম প্রস্তুতি এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তিস্তা অববাহিকায় বন্যা নতুন কোনো ঘটনা নয়। প্রায় প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে উজানের পানি এবং ভারী বৃষ্টির কারণে নদীর পানি বৃদ্ধি পায়। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আবহাওয়ার ধরনে পরিবর্তন এসেছে, যার ফলে অল্প সময়ের মধ্যে অতিবৃষ্টি এবং আকস্মিক বন্যার ঘটনা বাড়ছে।
পরিবেশবিদরা বলছেন, নদী ব্যবস্থাপনা, তীর সংরক্ষণ এবং দীর্ঘমেয়াদি বন্যা নিয়ন্ত্রণ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ছাড়া এ ধরনের ঝুঁকি পুরোপুরি কমানো সম্ভব নয়। বিশেষ করে তিস্তা নদীর ভাঙনপ্রবণ এলাকাগুলোতে স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি দীর্ঘদিনের।
এদিকে নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জেলেদের মধ্যেও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। নদীর স্রোত বেড়ে যাওয়ায় নৌযান চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। স্থানীয় প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রয়োজন হলে নদীপথে বিশেষ সতর্কতা জারি করতে পারে বলে জানা গেছে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, চরাঞ্চলের অনেক পরিবার এখনও নদীর ওপর নির্ভরশীল জীবনযাপন করে। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে এসব পরিবার সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। তাই সম্ভাব্য বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারি সহায়তা এবং জরুরি ত্রাণ প্রস্তুত রাখার দাবি জানিয়েছেন তারা।
আবহাওয়া ও পানি বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী কয়েকদিনের আবহাওয়ার পরিস্থিতি এবং উজানের পানির প্রবাহ বন্যার সম্ভাবনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। যদি বৃষ্টিপাতের মাত্রা কমে আসে, তাহলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে পারে। তবে বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে নদীর পানি আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সব মিলিয়ে, লালমনিরহাটে তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধির ফলে বন্যার আশঙ্কা ক্রমেই বাড়ছে। যদিও এখনো বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি, তবুও নদী তীরবর্তী এলাকার মানুষ সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। প্রশাসনও পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। আগামী কয়েকদিনের পরিস্থিতিই নির্ধারণ করবে তিস্তা অববাহিকায় বন্যার ঝুঁকি কতটা বাড়বে এবং তার প্রভাব কতদূর বিস্তৃত হবে।