প্রকাশ: ১১ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি, সামাজিক পরিবর্তন এবং উন্নয়নের প্রতিটি অধ্যায়ে আজ নারীর অবদান অনস্বীকার্য। একসময় যে নারীরা ঘরের চার দেয়ালের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলেন, আজ তারাই দেশের শিল্প, শিক্ষা, আইনশৃঙ্খলা, ব্যাংকিং, প্রযুক্তি এবং সেবাখাতের চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছেন। তৈরি পোশাক শিল্প থেকে শুরু করে পুলিশ প্রশাসন, শ্রেণিকক্ষ, ব্যাংকের করপোরেট অফিস কিংবা ডিজিটাল অর্থনীতির বিস্তৃত অঙ্গন—সবখানেই নারীরা নিজেদের দক্ষতা, শ্রম ও মেধার স্বাক্ষর রেখে চলেছেন।
তবে এই সাফল্যের পথ মোটেও সহজ ছিল না। প্রতিটি অর্জনের পেছনে রয়েছে অসংখ্য প্রতিবন্ধকতা, সামাজিক বাধা, বৈষম্য, নিরাপত্তাহীনতা এবং ব্যক্তিগত ত্যাগের গল্প। কর্মক্ষেত্রে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করতে গিয়ে নারীদের প্রতিনিয়ত লড়াই করতে হয়েছে নানা চ্যালেঞ্জের সঙ্গে। সেই সংগ্রামের মধ্য দিয়েই তারা গড়ে তুলেছেন আত্মবিশ্বাস, প্রতিষ্ঠা করেছেন নিজেদের সক্ষমতা এবং হয়ে উঠেছেন নতুন প্রজন্মের অনুপ্রেরণা।
ঢাকার একটি পোশাক কারখানায় সুইং অপারেটর হিসেবে কর্মরত রাবেয়া খাতুন গত ১৫ বছর ধরে শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন দেশের অন্যতম বৃহৎ রপ্তানি খাতে। তার জীবন যেন বাংলাদেশের লাখো নারী শ্রমিকের প্রতিচ্ছবি। প্রতিদিন মেশিনের শব্দের মধ্যেই কেটে যায় তার কর্মঘণ্টা। তিনি মনে করেন, পোশাক শিল্পে কর্মপরিবেশ আগের তুলনায় উন্নত হলেও এখনো নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং শ্রমের ন্যায্য মূল্য নিয়ে অনেক চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।
রাবেয়ার মতে, কর্মক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের একটি হলো মাতৃত্বকালীন সময়ের অনিশ্চয়তা। আইনগত সুযোগ-সুবিধা থাকলেও বাস্তবে অনেক নারী শ্রমিক গর্ভাবস্থায় চাকরি হারানোর শঙ্কায় ভোগেন। এছাড়া কর্মঘণ্টা শেষে বাড়ি ফেরার পথে নিরাপত্তার বিষয়টিও তাদের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ। তবুও জীবনযুদ্ধ থেমে থাকে না। পরিবারের দায়িত্ব এবং সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভেবেই তারা প্রতিদিন নতুন করে সংগ্রামে নামেন।
অন্যদিকে বাংলাদেশ পুলিশের কনস্টেবল সুমাইয়া ইসলাম শিমলার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে নারীর সাহসী অগ্রযাত্রার আরেকটি দিক। নবাবগঞ্জ থানায় দায়িত্ব পালনরত এই নারী পুলিশ সদস্য মনে করেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অনেক সময় সামাজিক কটূক্তি ও নেতিবাচক মনোভাবের মুখোমুখি হতে হয়। কিন্তু সহকর্মীদের সহযোগিতা এবং নিজের পেশাগত দায়বদ্ধতা তাকে সামনে এগিয়ে যেতে শক্তি জুগিয়েছে।
তার মতে, নারী পুলিশের উপস্থিতি এখন সাধারণ নারীদের জন্য আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক নির্যাতিত নারী বা ভুক্তভোগী পুরুষ কর্মকর্তাদের কাছে নিজের সমস্যার কথা বলতে সংকোচ বোধ করলেও নারী পুলিশ সদস্যদের কাছে সহজে মনের কথা বলতে পারেন। ফলে বিচারপ্রাপ্তির পথ আরও সহজ হয়েছে। তবে নারী সদস্যদের আবাসন ও কর্মপরিবেশ উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেছেন তিনি।
শিক্ষা খাতেও নারীরা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন। নারায়ণগঞ্জ আইডিয়াল স্কুলের সিনিয়র শিক্ষক সোনিয়া সাহানীর মতে, শিক্ষকতা কেবল চাকরি নয়; এটি মানুষ গড়ার এক মহৎ দায়িত্ব। দুই দশকের অভিজ্ঞতায় তিনি দেখেছেন সমাজ, প্রযুক্তি এবং শিক্ষার্থীদের মানসিকতায় ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে।
তিনি বলেন, বর্তমানে শিক্ষকদের দায়িত্ব শুধু পাঠদানেই সীমাবদ্ধ নয়। তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থাপনা, প্রশাসনিক কাজ এবং শিক্ষার্থীদের নৈতিক বিকাশের দায়িত্বও তাদের কাঁধে এসে পড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে অভিভাবকেরা শিক্ষকের ভূমিকা সম্পর্কে ভুল ধারণা পোষণ করেন, যা শিক্ষার পরিবেশকে প্রভাবিত করে। তবুও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে গড়ে তোলার লক্ষ্যেই শিক্ষকরা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।
করপোরেট জগতেও নারীরা নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছেন। সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট হাসিনা মমতাজের কর্মজীবন সেই বাস্তবতারই উদাহরণ। দীর্ঘ ১৭ বছরের ব্যাংকিং অভিজ্ঞতায় তিনি দেখেছেন, পেশাগত সাফল্য এবং পারিবারিক দায়িত্বের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা নারী কর্মীদের জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
তিনি মনে করেন, মাতৃত্বকালীন দায়িত্ব কিংবা পরিবারকে সময় দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনেক সময় কর্মক্ষেত্রে ভুলভাবে মূল্যায়িত হয়। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, বদলির চাপ এবং ডে-কেয়ার সুবিধার অভাব নারীদের ক্যারিয়ার উন্নয়নে বাধা সৃষ্টি করে। তারপরও সময় ব্যবস্থাপনা এবং পরিবারের সমর্থনকে পুঁজি করে নারীরা আজ ব্যাংকিং খাতের নেতৃত্বস্থানীয় অবস্থানে পৌঁছাচ্ছেন।
বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতির বিকাশে নারীদের অংশগ্রহণও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ডিজিটাল মার্কেটিং বিশেষজ্ঞ শ্যামলী আক্তারের জীবনগল্প সেই পরিবর্তনের এক উজ্জ্বল উদাহরণ। পোশাক কারখানার কর্মী থেকে শুরু করে ডিজিটাল দক্ষতায় প্রশিক্ষিত পেশাজীবী হয়ে ওঠার যাত্রা তার জন্য সহজ ছিল না। কিন্তু অবিরাম শেখার আগ্রহ এবং প্রযুক্তিকে কাজে লাগানোর সক্ষমতা তাকে নতুন পরিচয় এনে দিয়েছে।
তিনি বলেন, ফ্রিল্যান্সিং এবং ডিজিটাল কাজের সুযোগ নারীদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের নতুন দুয়ার খুলে দিয়েছে। ঘরে বসেই বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে এ খাতে সামাজিক স্বীকৃতি, স্বাস্থ্যসুরক্ষা এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সহায়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
নারীদের কর্মজীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেছেন মনোবিজ্ঞানী সামছুন নাহার। দীর্ঘ ১৭ বছরের পেশাগত অভিজ্ঞতায় তিনি অসংখ্য কর্মজীবী নারীর সঙ্গে কাজ করেছেন। তার পর্যবেক্ষণে, নারীরা এখন প্রায় সব ক্ষেত্রেই সফলতার স্বাক্ষর রাখছেন, কিন্তু এর পেছনে রয়েছে প্রচণ্ড মানসিক চাপ, সামাজিক প্রত্যাশা এবং বহুমুখী দায়িত্বের বোঝা।
তিনি বলেন, কর্মক্ষেত্রে সম্মান, ন্যায্য মূল্যায়ন এবং নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা না গেলে নারীদের সক্ষমতার পূর্ণ বিকাশ সম্ভব নয়। একই সঙ্গে কর্মক্ষেত্রের চাপ ও ব্যক্তিগত জীবনকে আলাদা রাখতে পারা, পর্যাপ্ত বিশ্রাম, শরীরচর্চা এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবার গুরুত্বও তিনি তুলে ধরেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সমাজে নারীর অংশগ্রহণ আজ আর কোনো আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যানের বিষয় নয়; এটি একটি বাস্তব সামাজিক বিপ্লব। তৈরি পোশাক শিল্পের শ্রমিক, পুলিশ সদস্য, শিক্ষক, ব্যাংকার, প্রযুক্তি পেশাজীবী কিংবা মনোবিজ্ঞানী—প্রতিটি ক্ষেত্রেই নারীরা প্রমাণ করেছেন যে সুযোগ পেলে তারা শুধু নিজেদের নয়, পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের উন্নয়নেও অসামান্য ভূমিকা রাখতে পারেন।
তবে এই অগ্রযাত্রাকে আরও শক্তিশালী করতে প্রয়োজন নিরাপদ কর্মপরিবেশ, সমান সুযোগ, বৈষম্যহীন কর্মসংস্কৃতি, মাতৃত্ববান্ধব নীতি এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি। কারণ নারীর ক্ষমতায়ন কেবল একজন ব্যক্তির সাফল্য নয়; এটি একটি জাতির অগ্রগতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি।
বাংলাদেশের কর্মজীবী নারীদের এই সংগ্রাম, সাহস ও সাফল্যের গল্প তাই শুধু অনুপ্রেরণার নয়, বরং একটি পরিবর্তিত বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি—যেখানে নারীরা আর পিছিয়ে নেই, বরং উন্নয়নের অগ্রভাগে দাঁড়িয়ে ভবিষ্যতের পথ দেখাচ্ছেন।