তাজিয়া মিছিলে শোকের আবহ, নিরাপত্তায় কঠোর নজরদারি

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২৬ জুন, ২০২৬
  • ৭ বার

প্রকাশ: ২৬ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

পবিত্র আশুরা উপলক্ষে শোক, ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য এবং ঐতিহ্যের আবহে রাজধানীর পুরান ঢাকার ঐতিহাসিক হোসেনি দালান ইমামবাড়া থেকে শিয়া সম্প্রদায়ের তাজিয়া মিছিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। শুক্রবার (২৬ জুন) সকাল ১০টার পর আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হওয়া এই মিছিলে ঢাকাসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে শত শত ধর্মপ্রাণ মুসল্লি অংশ নেন। মিছিলকে কেন্দ্র করে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে ছিল কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং যান চলাচল নিয়ন্ত্রণে ছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যাপক উপস্থিতি।

চার শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে পুরান ঢাকার হোসেনি দালান ইমামবাড়া আশুরা পালনের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। প্রতি বছর মহররম মাসের ১০ তারিখে কারবালার শোকাবহ ঘটনার স্মরণে এখানে বিভিন্ন ধর্মীয় আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে তাজিয়া মিছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং ঐতিহ্যবাহী আয়োজন হিসেবে বিবেচিত। এ বছরও ভোর থেকেই হোসেনি দালান প্রাঙ্গণে ভিড় করতে থাকেন শিয়া সম্প্রদায়ের সদস্যরা। কালো পোশাকে শোক প্রকাশের পাশাপাশি অনেকের হাতে ছিল আলাম, নিশান, প্রতীকী ছুরি ও অন্যান্য ধর্মীয় প্রতীক।

মিছিলটি হোসেনি দালান থেকে শুরু হয়ে রাজধানীর আজিমপুর, নীলক্ষেত, নিউ মার্কেট ও সায়েন্সল্যাব এলাকা অতিক্রম করে ধানমন্ডিতে গিয়ে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। পুরো পথজুড়ে অংশগ্রহণকারীরা কারবালার শহীদদের স্মরণে শোক প্রকাশ করেন এবং ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা পালন করেন। শোকমিছিল চলাকালে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ছিল গভীর আবেগ, সংযম ও ধর্মীয় অনুশাসনের প্রতিফলন।

তাজিয়া মিছিলকে ঘিরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ছিল সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে। বাংলাদেশ পুলিশ, র‌্যাব, সেনাবাহিনী, সোয়াত, ফায়ার সার্ভিস এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা দায়িত্ব পালন করেন। মিছিলের নির্ধারিত রুটজুড়ে নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয় এবং গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে মোড়ে অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়। পাশাপাশি সাদা পোশাকে গোয়েন্দা সদস্যদেরও দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়। ট্রাফিক পুলিশ যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে যাতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কম হয় এবং মিছিল নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করা যায়।

প্রশাসনের পক্ষ থেকে আগেই জানানো হয়েছিল, আশুরা উপলক্ষে রাজধানীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। মিছিল চলাকালে যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে সংশ্লিষ্ট বাহিনীগুলো সমন্বিতভাবে দায়িত্ব পালন করছে। নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় নজরদারি বৃদ্ধি, সিসিটিভি পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় তল্লাশি কার্যক্রমও পরিচালিত হয়।

ইসলামের ইতিহাসে আশুরা একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ দিন। আরবি “আশারা” শব্দের অর্থ দশ, আর আশুরা বলতে মহররম মাসের দশম দিনকে বোঝানো হয়। হিজরি ৬১ সনের ১০ মহররম বর্তমান ইরাকের কারবালার প্রান্তরে সংঘটিত এক মর্মান্তিক ঘটনার মধ্য দিয়ে দিনটি ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্ব লাভ করে। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র হজরত ইমাম হোসেন (রা.), তাঁর পরিবার ও অল্পসংখ্যক সঙ্গী সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নিয়ে ইয়াজিদের বাহিনীর বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে গিয়ে শহীদ হন। ইসলামের ইতিহাসে কারবালার এই ঘটনা আত্মত্যাগ, ন্যায় প্রতিষ্ঠা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের এক অনন্য প্রতীক হিসেবে বিবেচিত।

কারবালার এই শোকাবহ ঘটনা শুধু শিয়া সম্প্রদায়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন অংশে নানা ধর্মীয় কর্মসূচির মাধ্যমে দিনটি স্মরণ করা হয়। তবে তাজিয়া মিছিল মূলত শিয়া মুসলিমদের ঐতিহ্যবাহী আয়োজন, যেখানে কারবালার স্মৃতি প্রতীকীভাবে তুলে ধরা হয় এবং শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। বাংলাদেশেও দীর্ঘদিন ধরে শান্তিপূর্ণভাবে এ আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।

ধর্মীয় বিশ্লেষকদের মতে, কারবালার শিক্ষা কেবল একটি ঐতিহাসিক ঘটনার স্মরণ নয়; এটি অন্যায়, অবিচার ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে অবিচল থাকার অনুপ্রেরণা দেয়। মানবিক মূল্যবোধ, আত্মত্যাগ এবং নৈতিকতার যে দৃষ্টান্ত ইমাম হোসেন (রা.) স্থাপন করেছিলেন, তা যুগে যুগে মানুষের জন্য প্রেরণার উৎস হয়ে রয়েছে।

এদিকে মিছিল উপলক্ষে রাজধানীর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কে সাময়িক যানজটের সৃষ্টি হলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হয়েছে। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠান নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত কার্যক্রম ছিল চোখে পড়ার মতো।

শান্তিপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত এই তাজিয়া মিছিলের মধ্য দিয়ে আবারও ফুটে উঠেছে বাংলাদেশের ধর্মীয় সহাবস্থান, সহনশীলতা এবং সম্প্রীতির চিত্র। শোকের আবহে অনুষ্ঠিত এ আয়োজন কারবালার আত্মত্যাগের বার্তাকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি মানবতা, ন্যায়বিচার ও সত্য প্রতিষ্ঠার চিরন্তন শিক্ষাও স্মরণ করিয়ে দেয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত