প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
জুলাই গণ–অভ্যুত্থানকালীন সহিংসতা ও হত্যাচেষ্টার ঘটনায় দায়ের করা একটি গুরুত্বপূর্ণ মামলায় সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হককে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদনের শুনানির তারিখ পিছিয়েছে। ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. সেফাতুল্লাহ সোমবার এই আদেশ প্রদান করেন। মামলার নথি যথাসময়ে আদালতে উপস্থাপন করতে না পারার কারণে শুনানি ৮ জুলাই পর্যন্ত স্থগিত করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট আদালত সূত্রে জানা গেছে, পরবর্তী শুনানির দিন ভার্চ্যুয়াল পদ্ধতিতে এই আইনি প্রক্রিয়ার পরবর্তী ধাপ সম্পন্ন করা হবে। বনানী থানার এসআই সাইফুল ইসলাম কর্তৃক দায়ের করা এই আবেদনটি নিয়ে বিচারিক অঙ্গনে ব্যাপক কৌতূহল বিরাজ করছে।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত বছরের ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট রাজধানীর মহাখালীর সেতু ভবনের সামনে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের শিক্ষার্থীরা শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচি পালন করছিলেন। সেই কর্মসূচি থেকে মিছিল নিয়ে শাহবাগের দিকে অগ্রসর হওয়ার পথে ভয়াবহ হামলার শিকার হন আন্দোলনকারীরা। অভিযোগ রয়েছে, এই মিছিলে অতর্কিতে গুলিবর্ষণ, ককটেল ও হাতবোমা নিক্ষেপ করা হয়। এই পৈশাচিক হামলায় উজ্জ্বল মিয়াসহ প্রায় ২৫ থেকে ৩০ জন আন্দোলনকারী মারাত্মকভাবে আহত হন। ঘটনার পর ভুক্তভোগী উজ্জ্বল মিয়া বাদী হয়ে বনানী থানায় একটি মামলা দায়ের করেন, যেখানে হত্যাচেষ্টা ও বিস্ফোরকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের বিভিন্ন ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।
সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের বিচারিক জীবনের প্রেক্ষাপট অত্যন্ত বিতর্কিত ও ঘটনাবহুল। তিনি ২০১০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে ২০১১ সালের ১৭ মে পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর নেতৃত্বাধীন আপিল বেঞ্চই ২০১১ সালের ১০ মে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা–সংক্রান্ত সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করে ঐতিহাসিক ও বিতর্কিত রায় দিয়েছিলেন, যা পরবর্তী সময়ে দেশের রাজনীতির গতিপথকে আমূল বদলে দিয়েছিল। সেই সময় থেকেই তিনি নানা মহলে তুমুল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন। দীর্ঘ বিচারিক ক্যারিয়ারের পর বর্তমানে তাঁকে দেশের বিভিন্ন সহিংস ও নাশকতামূলক মামলার আসামি হিসেবে আদালতের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
উল্লেখ্য, বিচারপতি খায়রুল হককে গত বছরের ২৪ জুলাই ধানমন্ডির নিজস্ব বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। শুরুর দিকে তাঁকে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময় যাত্রাবাড়ীতে যুবদলের কর্মী আবদুল কাইয়ুম আহাদ হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছিল। এরপর ধাপে ধাপে দেশের বিভিন্ন স্থানে দায়ের করা একাধিক নাশকতার মামলায় তাঁকে আসামি করে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। আইনি লড়াইয়ের পর তিনি ইতিমধ্যেই আটটি ভিন্ন মামলায় জামিন লাভ করেছেন। তবে একের পর এক নতুন মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদনের কারণে তাঁর কারাবাসের মেয়াদ ও আইনি জটিলতা ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। এই আইনি প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপই বর্তমান সরকারের বিচারিক স্বচ্ছতা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আদালতের শুনানির তারিখ পিছিয়ে যাওয়ার বিষয়টি বিচারিক প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক নিয়ম হলেও, জনমনে এটি নিয়ে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হচ্ছে। মামলার নথি যথাসময়ে আদালতে উপস্থাপন করতে না পারার বিষয়টি মামলার তদন্ত প্রক্রিয়ার ধীরগতির প্রতি ইঙ্গিত দেয়। এদিকে, ৮ জুলাইয়ের ভার্চ্যুয়াল শুনানিকে কেন্দ্র করে আইনজীবীদের মধ্যেও নতুন করে প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। আইনজীবী মহল এই মামলার শুনানিকে দেশের বর্তমান বিচারিক পরিস্থিতির একটি অংশ হিসেবে দেখছেন, যেখানে সাবেক শীর্ষ বিচারপতির বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলোর গুরুত্ব অপরিসীম। সাধারণ মানুষের নজর এখন এই শুনানির দিকে, কারণ জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করা বর্তমান সরকারের জন্য একটি বড় রাজনৈতিক ও নৈতিক দায়বদ্ধতা।
সাবেক এই বিচারপতির বিরুদ্ধে কেবল একটি মামলা নয়, বরং দেশের বিভিন্ন থানায় দায়ের করা একাধিক মামলার বোঝা ক্রমবর্ধমান। জুলাই বিপ্লবের পর ছাত্র-জনতার আকাঙ্ক্ষা ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচারের ব্যবস্থা করা। ফলে একের পর এক নাশকতার মামলায় গ্রেপ্তার হওয়ার ঘটনাটি সেই আকাঙ্ক্ষারই এক ধরণের আইনি প্রতিফলন। তবে একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে, আটটি মামলায় জামিন পাওয়ার পরও বনানী থানার এই মামলায় নতুন করে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন মামলার তদন্তের মোড় কোন দিকে নিয়ে যায়। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এবং রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা কীভাবে এই জট খুলবেন এবং আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী পরবর্তী শুনানি কীভাবে পরিচালিত হবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
পরিশেষে বলা যায়, এ বি এম খায়রুল হকের মামলাটি কেবল একটি আইনি প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি দেশের সংবিধানের অস্পষ্ট ও বিতর্কিত অধ্যায়গুলোর চূড়ান্ত বিচারের প্রতীক্ষা। বিচারপতির আসন থেকে যিনি আইন প্রণেতা বা সংবিধানের ব্যাখ্যাদাতা ছিলেন, আজ তিনি নিজেই আইনের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে নিজের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে লড়াই করছেন। এটি বিচার বিভাগের প্রতি মানুষের আস্থা ও আইনের শাসনের সর্বোচ্চ পরীক্ষার সমান। বনানী থানার এই মামলার শুনানি ৮ জুলাই যে সিদ্ধান্ত নিয়ে আসবে, তা তাঁর কারামুক্তি বা কারাবাসের মেয়াদ আরও দীর্ঘায়িত করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। তবে যে কোনো পরিস্থিতিতেই ন্যায়বিচার যেন কোনোভাবে বাধাগ্রস্ত না হয়, সেটাই এখন দেশের বিবেকবান মানুষের একমাত্র দাবি।