প্রশান্ত মহাসাগরে চীনের পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্রের সফল পরীক্ষা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৬ জুলাই, ২০২৬
  • ১৯ বার
প্রশান্ত মহাসাগরে চীনের পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্রের সফল পরীক্ষা

প্রকাশ: ০৬ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিশ্বের সামরিক শক্তির ভারসাম্যে এক নতুন মেরুকরণ তৈরি করে প্রশান্ত মহাসাগরের গভীর জলসীমায় একটি কৌশলগত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সফল পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণ সম্পন্ন করেছে চীন। বেইজিংয়ের সামরিক সক্ষমতার এই প্রদর্শনী কেবল আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতেই আলোড়ন সৃষ্টি করেনি, বরং এটি বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক অস্ত্র বহনে সক্ষম দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের নতুন দৌড়কেও সামনে নিয়ে এসেছে। চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি নেভির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, একটি কৌশলগত পারমাণবিক সাবমেরিন থেকে এই পরীক্ষাটি পরিচালনা করা হয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্রটি একটি ডামি ওয়ারহেড বহন করছিল এবং তা অত্যন্ত নিখুঁতভাবে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রায় গিয়ে পতিত হয়েছে। ১৯৮০ সালের পর থেকে চীন এ ধরনের পরীক্ষা বিরল রাখলেও, গত ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের পর এটি তাদের সামরিক আধুনিকায়নের এক বড় মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের কয়েক ঘণ্টা আগেই বেইজিং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বেশ কয়েকটি দেশকে এই পরিকল্পিত পরীক্ষার বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করেছিল। স্বচ্ছতার বার্তা দিতে চীন যে কূটনৈতিক কৌশল অবলম্বন করেছে, তা অনেকটা বিশ্ব রাজনীতিতে নিজেদের দায়িত্বশীল ভূমিকা তুলে ধরার প্রচেষ্টার অংশ। চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া নিউজ জানিয়েছে যে, স্থানীয় সময় দুপুর ১২টা ০১ মিনিটে ক্ষেপণাস্ত্রটি আকাশপথে পাড়ি দিয়ে নির্দিষ্ট জলসীমায় অবতরণ করে। এটি কোনো আকস্মিক আগ্রাসনের বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং বেইজিংয়ের নিয়মিত বার্ষিক সামরিক প্রশিক্ষণ মহড়ার অংশ। চীনের দাবি অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক আইন ও রীতিনীতি মেনেই এই পরীক্ষা পরিচালনা করা হয়েছে এবং এটি কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা লক্ষ্যবস্তুকে উদ্দেশ্য করে করা হয়নি।

এই পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে জাপান, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডের মতো দেশগুলো বেইজিংয়ের এই সামরিক পদক্ষেপে অস্বস্তি প্রকাশ করেছে। জাপানের গণমাধ্যম কিয়োডো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, টোকিও বেইজিংকে এই ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষাটি পুনর্বিবেচনা করার জন্য সরাসরি অনুরোধ জানিয়েছিল এবং তাদের গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। জাপানের মতো প্রতিবেশী রাষ্ট্রের এই অবস্থান চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক শক্তির মোকাবিলায় অঞ্চলের নিরাপত্তার ঝুঁকিগুলোকে আরও স্পষ্টভাবে সামনে নিয়ে এসেছে। সামরিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, চীন তাদের পারমাণবিক সাবমেরিন বহরের আধুনিকায়ন এবং গভীর সমুদ্রে তাদের কৌশলগত আধিপত্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই এই পরীক্ষা চালিয়েছে।

সামুদ্রিক গোয়েন্দা সংস্থা স্টারবোর্ড প্রকাশিত উপগ্রহ চিত্রের তথ্যে আরও নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের অন্তত দুটি স্যাটেলাইট ট্র্যাকিং জাহাজ অবস্থান করছে। মূলত এই জাহাজগুলোর কাজ হলো পরীক্ষামূলক ক্ষেপণাস্ত্রের গতিপথ, নির্ভুলতা এবং পারফরম্যান্স পর্যবেক্ষণ করা। বেইজিংয়ের এই নিখুঁত প্রস্তুতির পেছনে লুকিয়ে আছে তাদের নিজস্ব ব্যালিস্টিক সক্ষমতা যাচাইয়ের এক সুদূরপ্রসারী আকাঙ্ক্ষা। কৌশলগত পারমাণবিক সক্ষমতা প্রদর্শন কেবল একটি দেশের সামরিক শক্তি বাড়ায় না, এটি আন্তর্জাতিক আলোচনার টেবিলে ওই দেশের দরকষাকষির সক্ষমতাকেও বাড়িয়ে দেয়। চীন যখন তাদের পারমাণবিক সাবমেরিন থেকে এই ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করে, তখন তারা মূলত বিশ্বশক্তিকে তাদের দ্বিতীয় স্ট্রাইক সক্ষমতার বার্তাটিই পৌঁছে দিচ্ছে।

সামরিক প্রশিক্ষণের কথা বলে চীন এই পরীক্ষা পরিচালনা করলেও, ভূ-রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা এটিকে চীনের শক্তির মহড়া হিসেবেই দেখছেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দক্ষিণ চীন সাগর থেকে শুরু করে প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত চীনের নৌ-বাহিনীর সরব উপস্থিতি এবং তাদের বিশাল সামরিক অবকাঠামো নির্মাণের বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্রদের কাছে গভীর উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। চীন যখন নিজেকে আধুনিক বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী সামরিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার লড়াইয়ে লিপ্ত, তখন তাদের এই ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা নতুন কোনো সামরিক প্রতিযোগিতার জন্ম দেয় কি না, তা নিয়েও বিশ্বজুড়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিশেষ করে পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহারের সম্ভাবনা এবং এ ধরনের পরীক্ষার নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এক ধরনের চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছে।

বেইজিংয়ের এই নিয়মিত মহড়ার যৌক্তিকতা যাই হোক না কেন, এটি পরিষ্কার যে চীনের সামরিক নেতৃত্ব এখন স্থলভাগের চেয়ে সমুদ্রকেন্দ্রীক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। সাবমেরিন থেকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ একটি অত্যন্ত জটিল ও প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত প্রক্রিয়া। এই প্রযুক্তিতে পারদর্শিতা অর্জন করা মানে হলো যেকোনো গোপন জায়গা থেকে শত্রুকে আঘাত করার সক্ষমতা তৈরি করা। চীন যে দ্রুতগতিতে তাদের এই সক্ষমতা বাড়িয়ে তুলছে, তা বিশ্ব রাজনীতির সমীকরণে বড় ধরণের পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে। আঞ্চলিক সরকারগুলো এই ঘটনাকে তাদের নিরাপত্তার প্রতি একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখলেও, চীন তার নিজের অবস্থান থেকে এই ঘটনাকে তাদের সার্বভৌম অধিকার ও সামরিক প্রস্তুতির অংশ হিসেবে দেখছে।

পরিশেষে বলা যায়, প্রশান্ত মহাসাগরের উত্তাল জলরাশিতে চীনের এই সফল ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা কেবল একটি ডামি ওয়ারহেডের আঘাত নয়, এটি বৈশ্বিক সামরিক শক্তির ভারসাম্যের এক নতুন সংকেত। আন্তর্জাতিক রীতিনীতি মেনে দেশগুলোকে অবহিত করলেও, বেইজিংয়ের এই সক্ষমতা প্রদর্শনী যে বিশ্বজুড়ে আলোচনার নতুন খোরাক যোগাবে তা নিশ্চিত। ভবিষ্যতে এ ধরনের সামরিক মহড়া এ অঞ্চলের নিরাপত্তা কাঠামোকে কোন দিকে নিয়ে যায়, তা দেখার বিষয়। তবে আপাতত চীন তাদের পারমাণবিক সক্ষমতার যে মহড়া দিল, তা বিশ্বশান্তি ও স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে নতুন চ্যালেঞ্জের সূচনা হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে থাকবে। কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে উত্তেজনা কমানোর পথ খোলা থাকলেও, সামরিক শক্তির এই অসম প্রতিযোগিতা আগামী দিনগুলোতে ভূ-রাজনীতিকে আরও জটিল করে তুলবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত