প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সুস্থ, সবল ও প্রাণবন্ত জীবনের পেছনে শরীরের অভ্যন্তরীণ পুষ্টির ভারসাম্য রক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানের একটি অপরিহার্য অংশ হলো ভিটামিন বি৩, যা চিকিৎসা বিজ্ঞানে ‘নায়াসিন’ হিসেবে পরিচিত। এটি একটি পানিতে দ্রবণীয় ভিটামিন, যার অর্থ আমাদের শরীর এই পুষ্টি উপাদানটি নিজে থেকে দীর্ঘস্থায়ীভাবে সংরক্ষণ করতে পারে না। শরীর তার প্রয়োজনীয় অংশটুকু গ্রহণ করার পর অতিরিক্ত অংশ প্রস্রাবের মাধ্যমে বের করে দেয়। এই কারণে আমাদের নিয়মিত খাদ্যতালিকায় প্রতিদিন এই ভিটামিনের সরবরাহ নিশ্চিত করা অপরিহার্য হয়ে পড়ে। শরীরের বিপাক প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে ত্বকের সৌন্দর্য রক্ষা পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রেই নায়াসিনের ভূমিকা অনন্য ও ব্যাপক।
ভিটামিন বি৩ বা নায়াসিনের প্রধান কাজগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো শরীরে শক্তির যোগান দেওয়া। আমরা প্রতিদিন যেসব শর্করা, প্রোটিন বা চর্বিযুক্ত খাবার গ্রহণ করি, শরীর সেগুলোকে কোষের উপযোগী শক্তিতে রূপান্তর করতে ভিটামিন বি৩ ব্যবহার করে। শরীরের প্রতিটি কোষের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে এটি জ্বালানি হিসেবে কাজ করে। এই প্রক্রিয়ার অভাবে শরীর ক্লান্ত হয়ে পড়ে এবং কর্মক্ষমতা দ্রুত হ্রাস পায়। তাই দীর্ঘ কর্মঘণ্টা শেষেও সতেজ থাকতে নিয়মিত ভিটামিন বি৩ সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ করা অত্যন্ত প্রয়োজন। শক্তির উৎপাদনের পাশাপাশি হৃদযন্ত্রের সুরক্ষা নিশ্চিত করতেও নায়াসিন অদ্বিতীয়। বর্তমান সময়ে হৃদরোগের ঝুঁকি কমানোর জন্য চিকিৎসকরা এই উপাদানের ওপর গুরুত্বারোপ করে থাকেন। রক্তে ভালো কোলেস্টেরল বা এইচডিল-এর মাত্রা বৃদ্ধি করতে এবং ক্ষতিকর কোলেস্টেরল ও ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে ভিটামিন বি৩ জাদুকরী ভূমিকা পালন করে, যা শেষ পর্যন্ত আমাদের হার্ট অ্যাটাকের মতো ভয়াবহ ঝুঁকি থেকে রক্ষা করে।
আমাদের মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের জটিল কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ভিটামিন বি৩ অপরিহার্য একটি উপাদান। স্নায়ুতন্ত্রের কোষগুলোর মধ্যে সঠিক বার্তা আদান-প্রদান নিশ্চিত করতে এটি কাজ করে, যা দীর্ঘমেয়াদে মানসিক প্রশান্তি ও একাগ্রতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। গবেষণায় দেখা গেছে, পর্যাপ্ত নায়াসিন গ্রহণের ফলে মানসিক অবসাদ, দুশ্চিন্তা এবং খিটখিটে মেজাজ দূর করা সম্ভব। মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা বজায় রাখতে এবং দীর্ঘমেয়াদে স্মৃতিশক্তি অটুট রাখতে দৈনন্দিন পুষ্টি তালিকায় এই ভিটামিন রাখা খুবই জরুরি। এছাড়া ত্বকের স্বাস্থ্য রক্ষা ও ঔজ্জ্বল্য বাড়াতেও নায়াসিন কার্যকরী ভূমিকা রাখে। সূর্যরশ্মির অতিবেগুনি বিকিরণ থেকে ত্বককে সুরক্ষা দিতে এবং ডিএনএ মেরামতের কাজে এটি অত্যন্ত কার্যকর। শরীরে ভিটামিন বি৩-এর চরম ঘাটতি হলে ‘পেলাগ্রা’ নামক একটি গুরুতর চর্মরোগ হতে পারে, যার ফলে ত্বকে খসখসে ভাব, চুলকানি ও ঘা দেখা দেয়। তাই ত্বকের লাবণ্য ধরে রাখতে ও স্বাস্থ্যকর ত্বক পেতে ভিটামিন বি৩ সমৃদ্ধ খাবারের কোনো বিকল্প নেই।
ভিটামিন বি৩ পাওয়ার উৎসগুলোকে আমরা মূলত প্রাণিজ এবং উদ্ভিজ্জ—এই দুই ভাগে বিভক্ত করতে পারি। প্রাণিজ উৎসগুলোর মধ্যে রয়েছে মুরগির মাংস, লিভার বা কলিজা, ইলিশ, রুই, কাতলা, ভেটকি ও মাগুর মাছের মতো পুষ্টিকর সামুদ্রিক ও মিঠা পানির মাছ। এছাড়া ডিম একটি চমৎকার মাধ্যম হতে পারে এই ভিটামিন পাওয়ার জন্য। যারা নিরামিষাশী বা উদ্ভিজ্জ উৎস থেকে পুষ্টি খুঁজছেন, তাদের জন্য রয়েছে চিনাবাদাম, সূর্যমুখীর বীজ, মাশরুম, সবুজ মটরশুঁটি, লাল চাল এবং নারকেলের মতো সমৃদ্ধ খাবার। এই খাবারগুলো প্রাত্যহিক খাদ্যতালিকায় সমন্বয় করা খুব একটা কঠিন কাজ নয় এবং তা আমাদের শরীরের নায়াসিনের চাহিদা সহজেই পূরণ করতে পারে।
আমাদের খাদ্যতালিকায় প্রোটিন বা আমিষজাতীয় খাবারের আধিক্য থাকলে সাধারণত ভিটামিন বি৩-এর ঘাটতি হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম থাকে। এর কারণ হলো, প্রোটিনে থাকা ট্রিপটোফ্যান নামক একটি অ্যামিনো অ্যাসিড আমাদের লিভার বা যকৃৎ খুব সহজে প্রক্রিয়াজাত করে ভিটামিন বি৩-তে রূপান্তর করতে পারে। এটি আমাদের শরীরের এক চমৎকার অভ্যন্তরীণ স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা। তাই খাবারে মাছ, মাংস, ডিম বা ডালের মতো প্রোটিনের পর্যাপ্ত উপস্থিতি নিশ্চিত করতে পারলে ভিটামিন বি৩-এর ঘাটতি নিয়ে চিন্তার বিশেষ কারণ থাকে না। তবে আধুনিক ব্যস্ত জীবনযাত্রায় অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস ও প্রক্রিয়াজাত খাবারের প্রতি ঝোঁক আমাদের শরীরের এই পুষ্টি সরবরাহকে ব্যাহত করছে।
পরিশেষে বলা যায়, সুস্থ শরীরের জন্য ভিটামিন বি৩ কোনো বিলাসবহুল উপাদান নয়, বরং এটি বেঁচে থাকার এক অপরিহার্য জ্বালানি। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান এবং পুষ্টিবিদরা বারবার গুরুত্ব দিচ্ছেন কেন আমাদের প্রতিদিনের খাবারের মেন্যুতে এই ভিটামিন রাখা উচিত। এটি আমাদের হৃদযন্ত্রের সুরক্ষা, স্নায়বিক প্রশান্তি এবং ত্বকের সৌন্দর্য বজায় রাখতে এক নিরবচ্ছিন্ন যোদ্ধার মতো কাজ করে। শরীরকে সচল রাখতে এবং অকাল ক্লান্তি থেকে মুক্তি পেতে আজ থেকেই আপনার খাবারের তালিকায় ভিটামিন বি৩ সমৃদ্ধ পুষ্টিকর খাবারের উপস্থিতি নিশ্চিত করুন। পরিমিত ও সুষম খাবার গ্রহণের অভ্যাসই পারে আপনাকে একটি দীর্ঘ, সুস্থ ও রোগমুক্ত জীবন উপহার দিতে। তাই সচেতন হোন আজই, কারণ পুষ্টির সঠিক জোগানই হলো সুস্থ থাকার সেরা বিনিয়োগ।