এফডিসিতে লাশ নিতে নিষেধ করলেন কিংবদন্তি রোজিনা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৬ জুলাই, ২০২৬
  • ৪ বার
এফডিসিতে লাশ নিতে নিষেধ করলেন কিংবদন্তি রোজিনা

প্রকাশ: ০৬ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনের উজ্জ্বল নক্ষত্র, বরেণ্য অভিনেত্রী রোজিনা সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে এমন কিছু কথা বলেছেন যা শোনার পর চলচ্চিত্রপাড়ায় পড়ে গেছে শোকের ছায়া। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বর্তমান এফডিসির পরিবেশ ও শিল্পীদের পারস্পরিক সম্পর্কের অবনতি দেখে তিনি যে কতটা মর্মাহত, তা তাঁর বক্তব্যে ফুটে উঠেছে। ঢাকার উত্তরায় নিজ বাসভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে রোজিনা দৃঢ় কণ্ঠে ঘোষণা করেছেন, মৃত্যুর পর যেন তাঁর মরদেহ আর এফডিসিতে নেওয়া না হয়। দীর্ঘ কর্মজীবনে যে এফডিসিকে তিনি নিজের আপন ঠিকানা মনে করতেন, আজ সেই জায়গাটির প্রতি তাঁর এই চরম অভিমান কেবল একজন শিল্পীর ব্যক্তিগত ক্ষোভ নয়, বরং এটি সমসাময়িক চলচ্চিত্র রাজনীতির এক করুণ পরিণতির বহিঃপ্রকাশ।

রোজিনার এমন বিস্ফোরক মন্তব্যের মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে শিল্পী সমিতির সাম্প্রতিক নির্বাচন ঘিরে সৃষ্ট অস্থিরতা ও অনিয়মের অভিযোগ। ভোটগ্রহণ থেকে শুরু করে ফলাফল ঘোষণার প্রক্রিয়া পর্যন্ত যে অসংগতি তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন, তা তাঁকে গভীর হতাশায় নিমজ্জিত করেছে। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় তিনি দেখেছেন এফডিসির ঐতিহ্যবাহী পরিবেশ কীভাবে ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তিনি আক্ষেপের সুরে বলেছেন, আগে এফডিসিতে যে মর্যাদা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও মূল্যবোধের চর্চা ছিল, তা আজ প্রায় বিলুপ্ত। এখনকার চলচ্চিত্রাঙ্গনে শিল্পীদের প্রতি যে দৃষ্টিভঙ্গি ও সম্মান প্রদর্শনের মানসিকতা থাকা উচিত, তার অভাব তিনি স্পষ্টভাবে অনুভব করছেন। তাঁর এই সিদ্ধান্ত কোনো মুহূর্তের আবেগের বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং চলচ্চিত্র জগতের পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে দীর্ঘদিনের অস্বস্তি ও যন্ত্রণার ফসল।

কথার প্রসঙ্গে তিনি অত্যন্ত আবেগী হয়ে স্মরণ করেছেন বাংলা চলচ্চিত্রের প্রাণপুরুষ, প্রয়াত নায়করাজ রাজ্জাকের কথা। রোজিনা জানিয়েছেন, জীবদ্দশায় নায়করাজ রাজ্জাকও এই চলচ্চিত্র অঙ্গনের প্রতি এক বুক অভিমান নিয়ে বলেছিলেন, মৃত্যুর পর যেন তাঁর দেহ এফডিসিতে নেওয়া না হয়। সেই বরেণ্য ব্যক্তিত্বের অভিজ্ঞতা এবং বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে রোজিনা অনেক আগে থেকেই নিজের পরিবারকে একই নির্দেশনা দিয়ে রেখেছেন। তাঁর কথায়, ‘এখনকার মানুষগুলোর মধ্যে শিল্পীদের শ্রদ্ধা করার মতো মানসিকতা একেবারেই নেই।’ এই মন্তব্যটি দেশের চলচ্চিত্রপ্রেমী দর্শকদের মনে বড় ধরনের আঘাত করেছে। একজন প্রবীণ ও কিংবদন্তি শিল্পী যখন নিজের শেষ যাত্রার স্থান নিয়ে এমন বিতর্কিত কিন্তু হৃদয়বিদারক সিদ্ধান্ত নেন, তখন তা পুরো চলচ্চিত্রশিল্পের অধঃপতনের চিত্রই তুলে ধরে।

রোজিনা অবশ্য পরিষ্কার করেছেন যে, শিল্পী সমিতির প্রতি ক্ষোভ থাকলেও তিনি এফডিসির সঙ্গে একেবারেই সম্পর্ক ছিন্ন করছেন না। তিনি জানিয়েছেন, সরকারি কোনো অনুষ্ঠান বা প্রযোজক সমিতির সদস্য হিসেবে প্রয়োজন পড়লে তিনি সেখানে যাবেন, কারণ চলচ্চিত্রের সঙ্গে তাঁর আত্মার টান দীর্ঘদিনের। তবে সাধারণ কোনো প্রয়োজনে বা শিল্পী সমিতির কোনো কর্মকাণ্ডে নিজের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে তিনি আর আগ্রহী নন। এবারের নির্বাচনে নিজের পরাজয় প্রসঙ্গে তিনি কোনো অজুহাত দেখাননি বা ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তোলেননি। বরং তিনি জানিয়েছেন, ফলাফল যাই হোক, এই পরিবেশ থেকে তিনি আগেই সরে আসার মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিলেন। এটি কোনো পরাজয়ের গ্লানি নয়, বরং এক যুগের পরিবর্তনকে মেনে নিয়ে নিজের মর্যাদাকে অক্ষুণ্ন রাখার প্রয়াস।

রোজিনার এই বক্তব্যের পর চলচ্চিত্রপাড়ায় শুরু হয়েছে তুমুল আলোচনা ও সমালোচনা। শিল্পীরা একে দেখছেন চলচ্চিত্রের জন্য এক দুঃসময়ের সংকেত হিসেবে। অনেকেই মনে করছেন, সিনিয়র শিল্পীদের প্রতি সম্মান না দেখানো এবং নির্বাচনের নামে কাদা ছোঁড়াছুড়ির যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তা চলচ্চিত্রকে শিল্পের চেয়ে রাজনীতির আখড়ায় পরিণত করেছে। একজন কিংবদন্তি শিল্পীর এমন অভিমানে চলচ্চিত্রকাররা মনে করছেন, সময় এসেছে নিজেদের ভুলগুলো শুধরে নেওয়ার। এফডিসি এখন কেবল একটি ভবনের সমষ্টি নয়, এটি চলচ্চিত্রপ্রেমীদের কাছে একটি আবেগের নাম। আর সেই আবেগের কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়ে যখন এমন প্রবীণ শিল্পী অশ্রুসজল চোখে বিদায়ের নিষেধাজ্ঞা জারি করেন, তখন তা পুরো শিল্পের জন্যই এক বড় লজ্জা।

তবে শিল্পী সমিতির সাম্প্রতিক নির্বাচনকে ঘিরে একাধিক প্রার্থী ও শিল্পীর অনিয়মের অভিযোগ তোলা নতুন কিছু নয়। নির্বাচন প্রক্রিয়াকে ঘিরে এমন বিতর্ক ও অস্বস্তি দীর্ঘকাল ধরে চলচ্চিত্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে। তবে রোজিনার মতো ব্যক্তিত্বের এমন কঠোর অবস্থান এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। অনেকে বলছেন, এটি কেবল রোজিনার ব্যক্তিগত অভিমত নয়, বরং অনেক সিনিয়র শিল্পীর মনের দীর্ঘদিনের জমে থাকা অব্যক্ত বেদনার প্রতিফলন। তারা শিল্পীদের মাঝে হারানো ঐক্য ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন। এফডিসির পরিবেশ যদি দ্রুত স্বাভাবিক না হয় এবং শিল্পীদের মাঝে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ পুনরায় জেগে না ওঠে, তবে ভবিষ্যতে চলচ্চিত্রের আরও অনেক কৃতি শিল্পীই হয়তো একইভাবে নিজেকে আড়াল করে নেবেন।

পরিশেষে বলা যায়, রোজিনার এই ঘোষণা চলচ্চিত্র জগতের ইতিহাসে এক কালো অধ্যায়ের সাক্ষী হয়ে থাকবে। যখন একজন বরেণ্য শিল্পী তাঁর জীবনের শেষ গন্তব্য হিসেবে প্রিয় এফডিসিকে অস্বীকার করেন, তখন তা পুরো চলচ্চিত্র পরিবারের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। তাঁর এই অভিমান কেবল ব্যক্তিগত নয়, এটি বর্তমান চলচ্চিত্রাঙ্গনের রূঢ় বাস্তবতার প্রতিফলন। আমরা আশা করি, শিল্পী সমিতি ও চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকরা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখবেন এবং এমন একটি পরিবেশ তৈরির উদ্যোগ নেবেন, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো কিংবদন্তি শিল্পীকে এমন কঠোর সিদ্ধান্তের কথা উচ্চারণ করতে না হয়। চলচ্চিত্রে শান্তির বাতাবরণ ফিরে আসুক এবং শিল্পের জয়গান গাওয়ার পরিবেশ বজায় থাকুক—এটাই এখন দেশের কোটি কোটি মানুষের প্রাণের দাবি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত