প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে প্রযুক্তির গুরুত্ব অপরিসীম। ডিজিটাল বিপ্লবের এই যুগে সেবা প্রদানের সনাতন পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে এসে প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিকায়নই এখন সময়ের দাবি। সোমবার অর্থ মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত ‘ইনোভেশন শোকেসিং’ শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী দেশের প্রতিটি মানুষকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার লক্ষ্যে প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন যে, দেশের সব সরকারি সেবাকে শতভাগ ডিজিটালাইজেশনের আওতায় নিয়ে আসা হবে। এটি কেবল একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি মজবুত করার একটি কৌশলগত পদক্ষেপ, যা প্রতিটি নাগরিককে ডিজিটাল অর্থনীতির অংশীদার হিসেবে গড়ে তুলবে।
অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তার ওপর আলোকপাত করতে গিয়ে বলেন যে, সরকারি দপ্তরগুলোতে সশরীরে উপস্থিত হওয়ার সংস্কৃতি কমিয়ে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করা প্রয়োজন। জনগণকে ঘরে বসে সেবা নেওয়ার সুবিধা নিশ্চিত করলে তাদের মূল্যবান সময় এবং অর্থের সাশ্রয় হবে। তিনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন যেন সেবাগ্রহীতাদের সরাসরি দপ্তরে না এসে অনলাইনে সেবা গ্রহণের জন্য উৎসাহিত করা হয়। অর্থমন্ত্রীর মতে, সরকারি সেবা যখন জনগণের হাতের মুঠোয় পৌঁছে যাবে, তখনই প্রকৃত উন্নয়নের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাবে। তিনি সব ধরনের সরকারি সেবা ডিজিটাইলাইজেশনের মাধ্যমে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
দেশের জনগণকে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের আওতায় আনার বিষয়টি আলোচনা করতে গিয়ে মন্ত্রী বলেন যে, শুধু অর্থনীতিতে নয়, বরং প্রতিটি সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে অন্তর্ভুক্তিমূলক হওয়া জরুরি। প্রযুক্তির সুফল যাতে কেবল শহরের মানুষ বা ডিজিটাল সচেতনরাই ভোগ করতে না পারে, তা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেন তিনি। তিনি বলেন যে, অনেক প্রয়োজনীয় সেবা এখন ঘরে বসেই পাওয়া সম্ভব, কিন্তু প্রচারের অভাবে মানুষ তা এখনো জানতে পারছে না। জনগণকে এই উদ্ভাবনী সেবাগুলো সম্পর্কে সচেতন করার জন্য ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। শুধু ডিজিটাল সেবা তৈরি করলেই হবে না, বরং সাধারণ নাগরিক কীভাবে সেই সেবা গ্রহণ করবে, তার সহজবোধ্য দিকনির্দেশনাও প্রচার করতে হবে। অর্থমন্ত্রীর এই বক্তব্য সরকারি সেবার পরিধি বাড়িয়ে তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের উদ্যোগে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানের মূল লক্ষ্য ছিল আর্থিক খাতের আধুনিকায়নে বিভিন্ন দপ্তর ও সংস্থার উদ্ভাবনী উদ্যোগগুলো তুলে ধরা। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের আওতাধীন ২৫টি দপ্তর ও সংস্থা এই শোকেসিংয়ে তাদের ৫০টি উদ্ভাবনী উদ্যোগ প্রদর্শন করে। বর্তমানে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের অধীনে ৩২৯টি সেবা সম্পূর্ণ ডিজিটাল করা হয়েছে, যা দেশের আর্থিক খাতের ডিজিটালাইজেশনে এক বিশাল মাইলফলক। এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে, সরকার প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে প্রশাসনিক জটিলতা কাটিয়ে ওঠার লক্ষ্যে কতটা আন্তরিক। অনুষ্ঠানে ডিজিটাল সেবার এই সংখ্যা আগামীতে আরও বাড়বে বলে আশা প্রকাশ করা হয়।
ইনোবেশন শোকেসিংয়ের চূড়ান্ত পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ উদ্ভাবনী উদ্যোগের জন্য পাঁচটি ভিন্ন ক্যাটাগরিতে পাঁচটি প্রতিষ্ঠানকে পুরস্কৃত করা হয়েছে। রাষ্ট্রমালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংক হিসেবে জনতা ব্যাংক পিএলসি, বিশেষায়িত ব্যাংক হিসেবে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক, নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ, অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ক্যাটাগরিতে বাংলাদেশ হাউস বিল্ডিং ফিন্যান্স কর্পোরেশন এবং অন্যান্য ক্যাটাগরিতে পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন বা পিকেএসএফ তাদের কাজের স্বীকৃতি হিসেবে পুরস্কার লাভ করে। এই পুরষ্কার প্রদানের মূল উদ্দেশ্য হলো সংস্থাগুলোর মধ্যে সৃজনশীলতাকে উৎসাহিত করা এবং ডিজিটাল রূপান্তরে তাদের কর্মস্পৃহা বৃদ্ধি করা। অর্থমন্ত্রীর উপস্থিতিতে এই স্বীকৃতি প্রদান উদ্ভাবনী সংস্কৃতি তৈরিতে এক বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করবে।
প্রযুক্তিগত এই পরিবর্তন কেবল কাগজপত্রের কাজ কমানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি দুর্নীতির পথ বন্ধ করার একটি শক্তিশালী মাধ্যম। ডিজিটাল সেবায় যখন সরাসরি মানবিক হস্তক্ষেপ কমে আসে, তখন স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা আপনাআপনিই বৃদ্ধি পায়। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর ভিশন অনুযায়ী, একটি দুর্নীতিমুক্ত ও আধুনিক রাষ্ট্র গঠনে ডিজিটালাইজেশন ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। প্রতিটি সরকারি দপ্তর যখন একে অপরের সাথে প্রযুক্তির মাধ্যমে সংযুক্ত হবে, তখন জাতীয় অর্থনীতি আরও গতিশীল হবে। সরকারি সেবায় প্রযুক্তির এই সংযোজন নাগরিকদের যেমন স্বস্তি দেবে, তেমনি প্রশাসনিক দক্ষতাকে করবে অনন্য। ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে স্মার্ট বাংলাদেশে উত্তরণের পথে এটি এক অমোঘ পদক্ষেপ।
পরিশেষে বলা যায়, প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে সেবা পৌঁছে দেওয়ার যে অঙ্গীকার সরকার গ্রহণ করেছে, তা বাস্তবায়িত হলে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠী থেকে শুরু করে বড় উদ্যোক্তা—সবাই যখন একই ডিজিটাল ছাতার নিচে আসবে, তখন দেশের সমৃদ্ধি হবে নিশ্চিত। প্রযুক্তির বিকল্পহীন এই যুগে অর্থমন্ত্রীর এই আধুনিক চিন্তাভাবনা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট সব মহলের সম্মিলিত সদিচ্ছা। ডিজিটাল সেবা যখন কেবল একটি প্রজেক্ট হিসেবে না থেকে সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের অভ্যাসে পরিণত হবে, তখনই অর্থমন্ত্রীর এই ভিশন পূর্ণতা পাবে। একটি উন্নত ও স্মার্ট অর্থনীতির স্বপ্নে বাংলাদেশ এখন এগিয়ে চলছে প্রযুক্তির হাত ধরেই, আর এই অগ্রযাত্রা নিশ্চিত করতে ডিজিটাল সেবার প্রসারের কোনো বিকল্প নেই।