অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন, রুদ্ধশ্বাস জয় আর্জেন্টিনার

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৮ জুলাই, ২০২৬
  • ১৩ বার
অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন, রুদ্ধশ্বাস জয় আর্জেন্টিনার

প্রকাশ: ০৮ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ফুটবল মানেই যদি হয় আবেগের চরম বহিঃপ্রকাশ এবং স্নায়ুর ওপর অসম্ভব চাপ, তবে আর্জেন্টিনার ম্যাচগুলো যেন সেই সংজ্ঞার বাস্তব প্রতিচ্ছবি। ম্যারাডোনার মেক্সিকো ৮৬ থেকে শুরু করে মেসির কাতার ২০২২—আর্জেন্টাইন ফুটবলের ইতিহাসজুড়ে ছড়িয়ে আছে রুদ্ধশ্বাস সব মুহূর্ত। আটলান্টার মার্সিডিজ বেঞ্জ স্টেডিয়ামে মিসরের বিপক্ষে শেষ ষোলোর লড়াইয়ে সেই চেনা চিত্রনাট্যই যেন নতুন করে মঞ্চস্থ হলো। ম্যাচের ৭৮ মিনিট পর্যন্ত ২-০ গোলে পিছিয়ে থাকা একটি দল যখন শেষ মুহূর্তের জাদুকরী পারফরম্যান্সে ৩-২ ব্যবধানে ম্যাচ জিতে নেয়, তখন তাকে কেবল জয় বললে ভুল হবে; এটি ছিল এক মহাকাব্যিক প্রত্যাবর্তন, যা ফুটবল ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

ম্যাচের প্রথমার্ধ ছিল যেন দুই ভিন্ন মেরুর লড়াই। একদিকে নীল-সাদা জার্সির নান্দনিক ট্যাঙ্গো ফুটবল, আর অন্যদিকে ফারাওদের শারীরিক শক্তির দাপট। মিসরের অমানুষিক গতি এবং পেশিবহুল ফুটবলকে সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছিলেন এনজো ফার্নান্দেজ ও রদ্রিগো ডি পলের মতো অভিজ্ঞ তারকারাও। ম্যাচের শুরুতেই যেন ছন্দহীন আর্জেন্টিনা। গোলমুখে একের পর এক আক্রমণের সুযোগ তৈরি করেও ফিনিশিংয়ের অভাবে বারবার ব্যর্থ হতে থাকেন মেসিরা। এরই মধ্যে বক্সের ভেতর উড়ে আসা একটি ক্রস থেকে মিসরের ডিফেন্ডার ইয়াসের ইব্রাহিম দুর্দান্ত হেডে বল জালে জড়ালে স্তব্ধ হয়ে যায় গ্যালারির আর্জেন্টিনা সমর্থকরা। এরপর সমতায় ফেরার দারুণ সুযোগ এসেছিল মেসির সামনে, কিন্তু পেনাল্টি স্পট থেকে তাঁর নেওয়া শট মিসরের গোলরক্ষক মোস্তফা শৌবির অসাধারণ দক্ষতায় রুখে দিলে আর্জেন্টিনার ওপর ভর করে বিপর্যয়ের কালো ছায়া।

দ্বিতীয়ার্ধে কোচ লিওনেল স্কালোনি যখন কৌশল পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিলেন, তখন মনে হয়েছিল ঘড়ির কাঁটা ততক্ষণে অনেক এগিয়ে গেছে। ৬৯ মিনিটে মিসরের ফরোয়ার্ড মোস্তফা জিকোর নিখুঁত ফিনিশিংয়ে যখন ব্যবধান ২-০ হলো, তখন স্টেডিয়ামের অধিকাংশ দর্শক ধরেই নিয়েছিলেন আর্জেন্টিনার বিদায়ঘণ্টা বেজে গেছে। কিন্তু ফুটবল ঈশ্বর যেন সেদিন অন্য কিছুই ভেবে রেখেছিলেন। ম্যাচের শেষ ২০ মিনিটের সেই লড়াই ছিল অমানবিক প্রচেষ্টার এক অনন্য উদাহরণ। ৭৮ মিনিট পর্যন্ত যেখানে মাঠজুড়ে ছিল হতাশা, সেখানে ৭৯ মিনিটে ক্রিস্টিয়ান রোমেরোর গোল যেন পুরো দলের শরীরে নতুন রক্ত সঞ্চার করল। ২-১ ব্যবধানে ব্যবধান কমানোর পর মাঠের পরিস্থিতি মুহূর্তের মধ্যেই বদলে যায়।

ম্যাচের ৮৩ মিনিটে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। ডি বক্সের সামান্য বাইরে বল পেয়ে মেসি যখন চিতার ক্ষিপ্রতায় শরীর ঘুরিয়ে বাঁ পায়ের সেই চিরচেনা ভলিতে বল জালে জড়ালেন, তখন আটলান্টার গ্যালারি যেন উত্তাল এক সমুদ্রে পরিণত হলো। মাত্র চার মিনিটের ব্যবধানে জোড়া গোল করে আর্জেন্টিনা যেন রূপকথার সেই চরিত্র হয়ে উঠল, যারা শেষ মুহূর্তের ট্র্যাজেডিকে রুখে দিয়ে রাজকীয় প্রত্যাবর্তন করতে জানে। কিন্তু নাটকীয়তার তখনও শেষ বাকি ছিল। নির্ধারিত সময়ের খেলা শেষ হওয়ার পর অতিরিক্ত সময়ের ৯২ মিনিটে লাউতারো মার্টিনেজের দুর্দান্ত এক ক্রস থেকে বাতাসে ভেসে আসা বলে এনজো ফার্নান্দেজের মরণকামড় হেডটি যখন জালে আছড়ে পড়ল, তখন পুরো স্টেডিয়াম আনন্দে ফেটে পড়ল। মাত্র তেইশ মিনিটের সেই অতিমানবীয় ঝড়ে ফারাওদের সব প্রতিরোধ ভেঙে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল।

ম্যাচ শেষে মেসিকে দেখা গেল অশ্রুসজল চোখে। কিন্তু সেই কান্না ছিল পেনাল্টি মিসের খেসারত দেওয়ার যন্ত্রণা থেকে মুক্তির কান্না। রদ্রিগো ডি পল ও এনজো ফার্নান্দেজরা যখন তাদের অধিনায়ককে কাঁধে তুলে নিলেন, তখন মাঠের মাঝখানে শুরু হলো সেই চিরন্তন বিজয় উল্লাস। কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার এই লড়াই প্রমাণ করল, আর্জেন্টিনা মানেই কেবল ফুটবল খেলা নয়, এটি একটি রোলার কোস্টার রাইড, যেখানে আবেগ ও কৌশলের মেলবন্ধন ঘটে প্রতি মুহূর্তে। ১১ জুলাই কানসাস সিটিতে পরবর্তী ম্যাচে কলম্বিয়া কিংবা সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে ফের মাঠে নামবেন মেসিরা। কোয়ার্টার ফাইনালের এই কঠিন পরীক্ষার জন্য আর্জেন্টিনা এখন মানসিকভাবে কতটা প্রস্তুত, তা এই অবিশ্বাস্য জয়ই বলে দিচ্ছে। মাঠের মাঝখানে সতীর্থদের কাঁধে চড়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন রাজার সেই চিরন্তন নাচ আরও একবার বিশ্বকে মনে করিয়ে দিল, আর্জেন্টিনা কখনোই হার মানে না; তারা কেবল শেষ দৃশ্যের রূপকথা লেখার জন্য অপেক্ষায় থাকে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত