দক্ষিণ এশিয়ায় এফডিআই প্রবৃদ্ধিতে বাংলাদেশ শীর্ষে

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৮ জুলাই, ২০২৬
  • ৩ বার
দক্ষিণ এশিয়ায় এফডিআই প্রবৃদ্ধিতে বাংলাদেশ শীর্ষে

প্রকাশ: ০৮ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বৈশ্বিক অর্থনীতির এক জটিল ও অনিশ্চিত সমীকরণের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে ২০২৬ সাল। ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, বাণিজ্য যুদ্ধ এবং উচ্চ সুদের হারের কারণে যখন বিশ্বের বেশিরভাগ দেশ বিনিয়োগ আকর্ষণে হিমশিম খাচ্ছে, ঠিক সেই সময়েই এক অনন্য সাফল্যের বার্তা নিয়ে হাজির হয়েছে বাংলাদেশ। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন বিষয়ক সংস্থা আঙ্কটাড-এর প্রকাশিত ‘ওয়ার্ল্ড ইনভেস্টমেন্ট রিপোর্ট ২০২৬’ অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ বা এফডিআই প্রবৃদ্ধিতে শীর্ষস্থান দখল করে নিয়েছে বাংলাদেশ। এই অর্জন কেবল পরিসংখ্যানের একটি সংখ্যামাত্র নয়, বরং এটি বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সম্ভাবনার এক নতুন স্বীকৃতির বহিঃপ্রকাশ।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে মোট এফডিআই প্রবাহের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৭৮ কোটি মার্কিন ডলার বা ১ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন ডলারে। আগের বছরের অর্থাৎ ২০২৪ সালের ১২৩ কোটি বা ১ দশমিক ২৩ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় এই বৃদ্ধির হার প্রায় ৪৫ শতাংশ। এই অভাবনীয় প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছে। যেখানে সারা বিশ্বে বিনিয়োগ প্রবাহ ছিল অত্যন্ত অস্থির এবং অনিশ্চিত, সেখানে ৪৫ শতাংশের এই ঊর্ধ্বগতি বাংলাদেশের অর্থনীতির অভ্যন্তরীণ শক্তি ও প্রতিকূলতা জয় করার অদম্য মানসিকতার পরিচয় দেয়। বিনিয়োগকারীদের এই ধারাবাহিক আগ্রহ প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশ তার বৃহৎ অভ্যন্তরীণ বাজার, ক্রমবর্ধমান শিল্পায়ন এবং কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে আন্তর্জাতিক পুঁজির জন্য একটি আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত হয়েছে।

আঙ্কটাডের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে যে, যদিও স্থায়ী মূলধন গঠনে এফডিআইয়ের অবদান এখনো অন্যান্য অনেক দেশের তুলনায় কম, তবুও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে দেশীয় বিনিয়োগ এখনো এক অবিচল স্তম্ভের মতো দাঁড়িয়ে আছে। তবে বিদেশি বিনিয়োগের এই ৪৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা এখন বাংলাদেশের প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প, জ্বালানি রূপান্তর প্রযুক্তি এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের দিকে নজর দিচ্ছে। ২০২৫ সালে এশিয়াজুড়ে মোট ৬৪৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের এফডিআই এসেছে, যা বিশ্ব বিনিয়োগের গন্তব্য হিসেবে উন্নয়নশীল এশিয়ার আধিপত্যকে প্রমাণ করে। সেই বিশাল প্রবাহের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান এখন নতুনভাবে মূল্যায়িত হচ্ছে।

বাংলাদেশের এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে একগুচ্ছ অর্থনৈতিক সংস্কার ও ধারাবাহিক উন্নয়ন। বিশেষ করে ডিজিটাল অবকাঠামো, উৎপাদন শিল্প এবং জ্বালানি খাতের আধুনিকায়ন বিনিয়োগকারীদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন বড় বড় কোম্পানি এখন বাংলাদেশে তাদের উৎপাদন ইউনিট স্থাপন এবং স্থানীয় বাজারের সাথে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা যাচাই করছে। প্রতিযোগিতামূলক কর্মশক্তি এবং সাশ্রয়ী উৎপাদন খরচ বাংলাদেশকে এশিয়ার অন্যান্য অনেক দেশের তুলনায় এগিয়ে রেখেছে। জিডিপির আকার ৫০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার পর থেকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা নিয়ে বৈশ্বিক সংস্থাগুলোর দৃষ্টিভঙ্গিতে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। অবকাঠামো উন্নয়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি, যেমন বড় বড় প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন এবং সংযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন—আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশের গুরুত্ব বাড়িয়ে তুলেছে বহুগুণ।

তবে এই সাফল্যের পথচলা মোটেও সহজ ছিল না। বাণিজ্য অনিশ্চয়তা এবং বিশ্ব অর্থনীতির মন্দাভাবের ঝুঁকি মাথায় নিয়েই বাংলাদেশ তার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রেখেছে। আঙ্কটাডের রিপোর্ট অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে গত দুই বছর পতনের পর ২০২৫ সালে বৈশ্বিক এফডিআই প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশ বেড়ে ১ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এই পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ার মূল মূলে ছিল কৌশলগত খাতের বিনিয়োগ। বাংলাদেশ সেই কৌশলগত খাতের যথাযথ ব্যবহার করতে পেরেছে বলেই আজ এই সাফল্য সম্ভব হয়েছে। প্রযুক্তি ও সেবানির্ভর শিল্পে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এখন বাংলাদেশমুখী হচ্ছেন। দেশের পোশাক খাতের সফলতার পর এখন প্রযুক্তি এবং সেবা খাত বিদেশি বিনিয়োগের নতুন কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠছে।

অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের এই এফডিআই প্রবৃদ্ধি আগামী দিনের জন্য এক শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করেছে। বাংলাদেশের বৃহৎ অভ্যন্তরীণ বাজার এবং ক্রমবর্ধমান মধ্যবিত্ত শ্রেণির ভোক্তা চাহিদা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে এক বড় আকর্ষণ। কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশকে একটি হাব বা সংযোগস্থলে পরিণত করার সুযোগ তৈরি করেছে। দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একটি নির্ভরযোগ্য নাম। তবে এই সাফল্য ধরে রাখতে হলে চলমান অর্থনৈতিক সংস্কারের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং বিনিয়োগ সহজীকরণ বা ‘ইজ অব ডুইং বিজনেস’ সূচকে আরও উন্নতির প্রয়োজন রয়েছে।

বাংলাদেশের মানুষ এখন এক উচ্চাভিলাষী অর্থনীতির স্বপ্নে বিভোর। এই অর্থনীতির মূল ভিত্তি হলো কর্মসংস্থান ও শিল্পায়ন। বিদেশি বিনিয়োগ বাড়লে প্রযুক্তির স্থানান্তর হয়, কর্মসংস্থান তৈরি হয় এবং দক্ষতা বৃদ্ধি পায়। বাংলাদেশে যদি এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকে, তবে ২০৩০ সালের মধ্যে এফডিআইয়ের প্রবৃদ্ধির হার আরও বড় কোনো মাইলফলক স্পর্শ করবে। ২০২৫ সালের এই সাফল্য আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, প্রতিকূলতার মধ্যেও সঠিক নীতি ও দূরদর্শী নেতৃত্ব থাকলে বড় সাফল্য ছিনিয়ে আনা সম্ভব। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের এই ভাবমূর্তির উত্তরণ দেশের সকল সাধারণ মানুষের জন্য এক গর্বের বিষয়। সামনের দিনগুলোতে আরও বেশি স্বচ্ছতা ও দক্ষতার মাধ্যমে এই সাফল্যের শিখর স্পর্শ করাটাই হবে বাংলাদেশের নতুন লক্ষ্য। একটি বাংলাদেশ অনলাইন এই অগ্রযাত্রার প্রতিটি মাইলফলক আপনাদের সামনে তুলে ধরতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত