প্রকাশ: ০৮ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
প্রকৃতির বৈরী আচরণে বিপর্যস্ত চট্টগ্রাম জনপদ। টানা বর্ষণ, পাহাড়ী ঢল আর জলাবদ্ধতার চরম সংকটে স্থবির হয়ে পড়েছে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। এই দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতির ঢেউ আছড়ে পড়েছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) সবুজ ক্যাম্পাসেও। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের চরম প্রতিকূলতা বিবেচনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বুধবার (৮ জুলাই) সব ধরনের ক্লাস ও পরীক্ষা স্থগিত ঘোষণা করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে এই সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়েছে, যা পুরো ক্যাম্পাসে এক ধরনের অনিশ্চয়তা ও নীরবতা তৈরি করেছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভৌগোলিক অবস্থান ও যাতায়াত ব্যবস্থার ওপর প্রকৃতির এই আঘাত অত্যন্ত প্রকট। নগরী থেকে ক্যাম্পাস পর্যন্ত পৌঁছানোর প্রধান মাধ্যম হিসেবে যে শাটল ট্রেন ও শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের বাসগুলো ব্যবহৃত হয়, সেগুলো আজ পুরোপুরি অচল হয়ে পড়েছে। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া এবং অতি বর্ষণের কারণে সৃষ্ট নজিরবিহীন জলাবদ্ধতা ও পরিবহন সংকটের প্রেক্ষাপটে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এই কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে শিক্ষকদের নিয়ে শহরের বিভিন্ন গন্তব্যে যাওয়া বাসগুলো জলাবদ্ধতায় আটকা পড়েছিল। ভয়াবহ সেই জলমগ্ন অবস্থা থেকে মুক্তি পেয়ে সকাল পর্যন্ত কোনো বাসই ক্যাম্পাসে ফিরে আসতে পারেনি। যাতায়াত ব্যবস্থার এই ভয়াবহ বিপর্যয় কেবল শিক্ষার্থীদের শিক্ষা জীবনকেই নয়, বরং বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার প্রশাসনিক কাঠামোকেও একটি বড় সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, অধিকাংশ শিক্ষক নগরীতে আটকা পড়েছেন এবং পরিবহন ব্যবস্থা সচল না হওয়ায় তাদের পক্ষে ক্যাম্পাসে আসা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও সুবিধার কথা চিন্তা করেই সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এই স্থগিতাদেশ প্রদান করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি বিভাগ, অনুষদ ও হলগুলোতে এই বার্তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। ক্লাস ও পরীক্ষা স্থগিত হওয়ায় আবাসিক হলগুলোতে থাকা শিক্ষার্থীরা অনেকটা অলস সময় কাটাচ্ছেন, অন্যদিকে যারা প্রতিদিন শহর থেকে ক্যাম্পাসে যাতায়াত করেন, তারা পড়ে গেছেন চরম দুর্ভাবনায়। বিশেষ করে যাদের পরীক্ষা থাকার কথা ছিল, তাদের মধ্যে উদ্বেগের ছাপ দেখা গেছে। এই স্থগিত পরীক্ষার পরবর্তী সময়সূচি কখন দেওয়া হবে, তা নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে চলছে নানা জল্পনা-কল্পনা।
চট্টগ্রাম মহানগরী ও এর আশপাশের পাহাড়ি এলাকায় গত কয়েকদিন ধরে অবিরাম বৃষ্টিপাত হচ্ছে। ফলে রাস্তাঘাট তলিয়ে গেছে এবং পাহাড় ধসের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এমন একটি দুর্যোগপূর্ণ সময়ে ক্যাম্পাসে ক্লাস ও পরীক্ষা চলমান রাখা মানে শিক্ষার্থীদের জীবনের ঝুঁকি বৃদ্ধি করা। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পরিস্থিতি মোকাবিলায় অত্যন্ত সতর্ক রয়েছে। জলাবদ্ধতার কারণে নগরীর অনেক এলাকা এখন পানির নিচে। এই পরিস্থিতিতে একজন শিক্ষার্থীর পক্ষে ঘর থেকে বের হয়ে ক্যাম্পাসে আসা বা পরীক্ষা কেন্দ্রে উপস্থিত হওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। মানবিক দিক বিবেচনা করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের এই সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানিয়েছেন অনেক শিক্ষার্থী ও অভিভাবক। তারা মনে করছেন, পরীক্ষার চেয়ে শিক্ষার্থীদের প্রাণের নিরাপত্তা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
তবে দীর্ঘস্থায়ী এই দুর্যোগ নিয়ে উদ্বেগ কাটছে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত একাডেমিক ক্যালেন্ডার ও শিডিউল এই স্থগিতাদেশের কারণে কিছুটা ব্যাহত হবে। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা সেশনজট এবং বর্তমানের এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ—সব মিলিয়ে শিক্ষার্থীরা তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছুটা চিন্তিত। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শাটল ট্রেন লাইন, পাহাড়ি টিলা এবং রাস্তার বিভিন্ন অংশ যেভাবে অতি বর্ষণের শিকার হচ্ছে, তাতে দ্রুত স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরে আসা নিয়ে সংশয় রয়েছে। পাহাড়ের ঢালে অবস্থিত এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামো এবং প্রকৃতি কীভাবে এই বিপর্যয় সামলে নেবে, তা এখন দেখার বিষয়। শিক্ষার্থীদের নিরাপদ যাতায়াতের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কী ধরনের দীর্ঘমেয়াদী পদক্ষেপ গ্রহণ করে, সেদিকে তাকিয়ে আছে সংশ্লিষ্ট সবাই।
প্রকৃতির এই বিপর্যয় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য নতুন কোনো অভিজ্ঞতা নয়। অতীতেও বহুবার পাহাড়ের ঢালে অবস্থিত এই ক্যাম্পাসটি দুর্যোগের মোকাবিলা করেছে। তবে বর্তমানে আধুনিক নগরায়ণ ও জলবায়ুর চরম পরিবর্তনের কারণে দুর্যোগের তীব্রতা বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের ধৈর্য ধারণ করার আহ্বান জানানো হয়েছে। নিয়মিত পরিস্থিতির ওপর নজর রাখা হচ্ছে এবং আবহাওয়া অনুকূলে এলে বিশ্ববিদ্যালয় পুনরায় তার চেনা প্রাণচাঞ্চল্যে ফিরে আসবে বলে আশা করছেন কর্তৃপক্ষ। দুর্যোগের এই দিনে ক্যাম্পাসের সবুজ পাহাড়, শান্ত হ্রদ আর শাটল ট্রেনের হুইসেল আজ যেন গুমোট এক বিষণ্নতায় ঢাকা পড়ে আছে। সবকিছু কাটিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় আবারও তার একাডেমিক ব্যস্ততায় ফিরে যাবে, কিন্তু বর্তমানের এই রুদ্ধশ্বাস পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এখন প্রধান লক্ষ্য।