প্রকাশ: ০৮ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক, বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নতুন মুখ হিসেবে যুক্ত হলেন অভিজ্ঞ ব্যাংকার নাহিদ রহমান। সম্প্রতি ব্যাংকটির এক বিশেষ আদেশে তাকে নির্বাহী পরিচালক (ইডি) পদে পদোন্নতি প্রদান করা হয়েছে। দীর্ঘদিনের সততা, কর্মদক্ষতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ এই পদোন্নতিকে ব্যাংকিং খাতে তার ক্যারিয়ারের এক বড় মাইলফলক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। গত মঙ্গলবার আনুষ্ঠানিকভাবে এই পদোন্নতির বিষয়টি নিশ্চিত করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। পদোন্নতি পাওয়ার পূর্বে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছিলেন দি সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশন (বাংলাদেশ) লিমিটেডে। সেখানে মহাব্যবস্থাপক হিসেবে ফাইন্যান্স অ্যান্ড অ্যাকাউন্টস বিভাগের দায়িত্ব সামলানোর সময় তিনি তার পেশাদারিত্বের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন।
নাহিদ রহমানের ব্যাংকিং ক্যারিয়ারের যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৯৯ সালে। বাংলাদেশ ব্যাংকের জেনারেল সাইডে সহকারী পরিচালক হিসেবে যোগদানের মাধ্যমে তিনি তার দীর্ঘ কর্মজীবনের পথে পা বাড়ান। তবে তার ব্যাংকিং জীবনের হাতেখড়ি হয়েছিল এর আগেই, যখন তিনি সাউথইস্ট ব্যাংকে প্রবেশনারি কর্মকর্তা হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন। দীর্ঘ প্রায় আড়াই দশকের এই পথচলায় তিনি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল বিভাগে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ, ফরেক্স রিজার্ভ অ্যান্ড ট্রেজারি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যাংক ট্রেনিং একাডেমি এবং ক্রেডিট গ্যারান্টি বিভাগের মতো গুরুত্বপূর্ণ শাখায় কাজ করে তিনি নিজেকে একজন দক্ষ ও আপসহীন ব্যাংকার হিসেবে গড়ে তুলেছেন। তার এই বিশাল অভিজ্ঞতা দেশের আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে বড় ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
শিক্ষাজীবনেও নাহিদ রহমান অত্যন্ত মেধাবী ও কৃতি ছাত্র ছিলেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগ থেকে ফাইন্যান্সে এম.কম ডিগ্রি অর্জন করেছেন। পরবর্তীতে পেশাগত উৎকর্ষ সাধনের লক্ষ্যে তিনি প্রেষণে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট থেকে এমবিএম ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। তবে তার শিক্ষার তৃষ্ণা এখানেই থেমে থাকেনি। তিনি উচ্চতর শিক্ষার জন্য পাড়ি জমিয়েছিলেন জাপানে। সে দেশের সরকারের বিশেষ জেডিএস স্কলারশিপের আওতায় রিৎসুমেইকান এশিয়া প্যাসিফিক ইউনিভার্সিটি থেকে ডেভেলপমেন্ট ইকোনমিক্সে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। এ ছাড়াও তিনি ইনস্টিটিউট অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের একজন ডিপ্লোমেইড অ্যাসোসিয়েট হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন। ব্যাংকিং খাতের জটিল ও আধুনিক বিষয়গুলো বোঝার জন্য তিনি ডিএফআই ও দ্য ফ্লেচার স্কুল, টাফটস ইউনিভার্সিটির যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত সিডিএফপি বিষয়ের ওপর উচ্চতর পেশাগত সার্টিফিকেশন কোর্সও সম্পন্ন করেছেন।
শুধু ব্যবহারিক ক্ষেত্রেই নয়, গবেষণামূলক প্রবন্ধ ও প্রকাশনায়ও তার রয়েছে বিশেষ ঝোঁক। ব্যাংকিং খাতের সমসাময়িক চ্যালেঞ্জ, মুদ্রানীতি এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ওপর তার লেখা বেশ কয়েকটি গবেষণাপত্র ও প্রবন্ধ দেশের বিভিন্ন পেশাগত সাময়িকীতে সমাদৃত হয়েছে। একজন একাডেমিক ব্যাংকার হিসেবে তার এই জ্ঞান তাকে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আরও কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে বলে আশা করা হচ্ছে। সহকর্মীদের কাছে অত্যন্ত বিনয়ী ও কর্মঠ হিসেবে পরিচিত নাহিদ রহমান সততা এবং নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করার কারণে সবার প্রশংসা অর্জন করেছেন।
খুলনার এক সম্ভ্রান্ত ও আলোকিত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণকারী নাহিদ রহমানের পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ড তাকে শুরু থেকেই উচ্চশিক্ষা ও নৈতিকতার প্রতি অনুপ্রাণিত করেছে। তার বাবা আতিকুর রহমান ছিলেন একজন অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার, যার কাছ থেকে তিনি ব্যাংকিং খাতের প্রাথমিক শিক্ষা ও মূল্যবোধের উত্তরাধিকার পেয়েছিলেন। তার মা সেলিমা রহমান একজন গৃহিণী, যিনি তাকে সবসময় মানবিক মানুষ হয়ে ওঠার শিক্ষা দিয়েছেন। তার জীবনসঙ্গী অধ্যাপক মো. আলমগীর নিজেও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের একজন শিক্ষক হিসেবে শিক্ষা ও গবেষণার সঙ্গে যুক্ত আছেন। অর্থাৎ মেধাবী এই দম্পতির সংসারে জ্ঞানচর্চা ও পেশাদারিত্বের এক চমৎকার সমন্বয় রয়েছে, যা নাহিদ রহমানের কর্মজীবনের অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে।
নাহিদ রহমানের এই নির্বাহী পরিচালক হিসেবে নিয়োগ কেবল একটি পদের পরিবর্তন নয়, বরং দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আধুনিকায়ন ও গতিশীলতা আনার একটি অংশ। দেশের আর্থিক খাতের বর্তমান প্রেক্ষাপট ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য এখন প্রয়োজন অভিজ্ঞ ও আধুনিক চিন্তার নেতৃত্ব। নাহিদ রহমানের মতো কর্মকর্তাদের পদোন্নতি সেই শূন্যতা পূরণে সহায়ক হবে। তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং গবেষণাধর্মী মানসিকতা তাকে নীতিনির্ধারণী টেবিলের আলোচনায় এক নতুন মাত্রা যোগ করতে সাহায্য করবে। দেশের আর্থিক খাতের সামগ্রিক কল্যাণে এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে তিনি তার মেধা ও শ্রম দিয়ে সামনের দিনগুলোতে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন—এমনটাই প্রত্যাশা করছেন দেশের ব্যাংকিং খাতের সংশ্লিষ্টরা।