জামায়াতের উসকানিমূলক রাজনীতি ও কূটনৈতিক ঝুঁকি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৮ জুলাই, ২০২৬
  • ১ বার
জামায়াতের উসকানিমূলক রাজনীতি ও কূটনৈতিক ঝুঁকি

প্রকাশ: ০৮ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক অত্যন্ত স্পর্শকাতর এবং বহুমুখী। এই অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য পারস্পরিক শ্রদ্ধা, অখণ্ডতা রক্ষা এবং সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান প্রদর্শন অপরিহার্য। অথচ সম্প্রতি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর একজন কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি ব্যারিস্টার শাহরিয়ারের ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো বা তথাকথিত ‘সেভেন সিস্টার্স’ নিয়ে করা মন্তব্য রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। তিনি এই রাজ্যগুলোকে ‘দখলকৃত দেশ’ হিসেবে অভিহিত করে সেখানকার নির্দিষ্ট ধর্মীয় সম্প্রদায়কে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে, এমন মন্তব্য কেবল উসকানিমূলকই নয়, বরং এটি একটি রাজনৈতিক দলের চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতার বহিঃপ্রকাশ। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জটিল সমীকরণে এ ধরনের দায়িত্বজ্ঞানহীন বাগাড়ম্বর বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের জন্য কোনো সুফল বয়ে আনবে না, বরং তা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে মারাত্মক হুমকির মুখে ঠেলে দিতে পারে।

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে দীর্ঘকাল ধরে জাতিগত ও রাজনৈতিক জটিলতা বিদ্যমান থাকলেও, আন্তর্জাতিক আইনের মানদণ্ডে এগুলো ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে স্বীকৃত। কোনো একটি রাজনৈতিক দলের মুখপাত্র যখন এসব ভূখণ্ডকে ‘দখলকৃত’ বলে ঘোষণা করেন, তখন তা সরাসরি প্রতিবেশী দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের শামিল। ভারতের অখণ্ডতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার এই প্রবণতা কেবল কূটনৈতিক শিষ্টাচারই লঙ্ঘন করে না, এটি বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ভিত্তিমূলকেও নড়বড়ে করে দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি করে। আরও ভয়ংকর বিষয় হলো, এই বিচ্ছিন্নতাবাদী ডাকে তিনি একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় সম্প্রদায়কে বেছে নিয়েছেন। একটি রাজনৈতিক সংকটে ধর্মের রং চড়ানো সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা উসকে দেওয়ার সরাসরি উসকানি ছাড়া আর কিছুই নয়।

জামায়াতে ইসলামীর ইতিহাসের সঙ্গে এ ধরনের বক্তব্যের এক অদ্ভুত যোগসূত্র বিদ্যমান। বাংলাদেশের মানুষ ভুলে যায়নি ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের কথা। সেই রক্তক্ষয়ী সময়ে জামায়াতে ইসলামী যেভাবে বাঙালি জাতির স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল এবং পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীকে সহায়তা করেছিল, তা আজও বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে ক্ষত হয়ে আছে। তৎকালীন জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধে যে রায় হয়েছিল এবং তাদের বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে, তা বাংলাদেশের ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। যারা নিজেদের দেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল, আজ তারাই যখন প্রতিবেশী দেশের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের উৎসাহিত করে, তখন তাদের রাজনৈতিক দর্শনের সীমাবদ্ধতা ও বৈপরীত্য অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে।

বাংলাদেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষার প্রশ্নে জামায়াত বরাবরই নিজেদের অবস্থান শক্ত বলে দাবি করে। পার্বত্য চট্টগ্রামের বিচ্ছিন্নতাবাদী সহিংসতার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের প্রতিটি রাজনৈতিক দলই ঐক্যবদ্ধ। যদি বাংলাদেশ নিজ দেশের অখণ্ডতার জন্য আন্তর্জাতিক সমর্থন আশা করে, তবে প্রতিবেশী দেশের বিচ্ছিন্নতাবাদী মনোভাবকে উসকে দেওয়ার কোনো নৈতিক অধিকার কোনো রাজনৈতিক দলের নেই। সার্বভৌমত্বের নীতি হতে হবে দ্বিমুখী ও স্বচ্ছ। আপনি যখন নিজের দেশের নিরাপত্তার কথা ভাববেন, তখন প্রতিবেশীর নিরাপত্তার ওপর আঘাত আসতে পারে এমন বক্তব্য পরিহার করাই বিচক্ষণ রাজনীতিবিদের লক্ষণ। নির্বাচনকেন্দ্রিক রাজনীতি বা সরকার গঠনের স্বপ্ন দেখলেই হয় না, সেই স্বপ্নের পেছনে থাকতে হয় দায়িত্বশীল আচরণ ও রাষ্ট্র পরিচালনার দূরদর্শী চিন্তাধারা।

ব্যারিস্টার শাহরিয়ারের এই মন্তব্য বাংলাদেশের জন্য একটি কূটনৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। বিশ্ব রাজনীতিতে প্রতিটি বক্তব্যের গুরুত্ব রয়েছে। দেশের সীমানার বাইরে কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীকে সরাসরি উসকানি দেওয়া মানে হলো বাংলাদেশকে একটি অস্থিতিশীলতার উৎস হিসেবে বিশ্বের দরবারে উপস্থাপন করা। যারা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র পরিচালনার স্বপ্ন দেখে, তাদের বোঝা উচিত যে, কূটনীতি কোনো খেলনা নয়। আন্তর্জাতিক রীতি-নীতি ও প্রতিবেশীর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেই একটি দেশকে তার স্বার্থ রক্ষা করতে হয়। উসকানিমূলক বক্তব্য হয়তো সাময়িক রাজনৈতিক ফায়দা দিতে পারে, কিন্তু তা দীর্ঘমেয়াদে একটি জাতির জন্য কূটনৈতিক নিঃসঙ্গতা বয়ে আনে।

পরিশেষে, রাজনীতি যদি কল্যাণমূলক রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্য নিয়ে হয়, তবে সেখানে বিভেদ উসকে দেওয়ার কোনো স্থান থাকতে পারে না। জামায়াতে ইসলামী যদি সত্যিই নিজেকে একটি বিশ্বাসযোগ্য গণতান্ত্রিক বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়, তবে তাদের অবশ্যই অতীত থেকে শিক্ষা নিতে হবে। নীতিগত ধারাবাহিকতা, বিচক্ষণতা এবং জনপরিসরে দায়িত্বশীল আচরণের কোনো বিকল্প নেই। অন্য দেশের বিচ্ছিন্নতাবাদী রাজনীতিকে উৎসাহিত করে নিজেদের উগ্রবাদী ভাবমূর্তি আরও স্পষ্ট করা ছাড়া এর কোনো সুফল নেই। বাংলাদেশের জনগণ চায় এমন নেতৃত্ব, যারা আন্তর্জাতিক বাস্তবতা ও কূটনৈতিক সূক্ষ্মতা বজায় রেখে রাষ্ট্র পরিচালনা করবে। সীমানার বাইরে উসকানি দেওয়া নয়, বরং দেশের ভেতরে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক সম্প্রীতি আনাই প্রকৃত রাজনীতির কাজ। আশা করা যায়, এ ধরনের চরম ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থান থেকে সরে এসে সংশ্লিষ্টরা বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার প্রতি আরও বেশি শ্রদ্ধাশীল হবেন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত