প্রকাশ: ০৮ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আন্তর্জাতিক রাজনীতির গতিপ্রকৃতি যে কতটা দ্রুত পরিবর্তিত হয়, তার সর্বশেষ প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির মধ্যকার সাম্প্রতিক কূটনৈতিক টানাপোড়েনে। এক সময় যাদের সম্পর্ককে বেশ ঘনিষ্ঠ হিসেবে বিবেচনা করা হতো, আজ সেই সম্পর্কে যেন তিক্ততার ছায়া পড়েছে। তুরস্কের আঙ্কারায় অনুষ্ঠিত ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনের প্রাক্কালে ট্রাম্পের মন্তব্য আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একদিকে মেলোনিকে ‘ভালো মানুষ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন, অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে চলমান ভূ-রাজনৈতিক সংকটে ইতালির সহযোগিতা না পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছেন। এই দ্বিধাবিভক্ত অবস্থান কেবল দুই নেতার ব্যক্তিগত সম্পর্ককেই নয়, বরং ওয়াশিংটন ও রোমের মধ্যকার কৌশলগত অংশীদারিত্বকেও এক অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সংবাদমাধ্যমের সামনে খোলাখুলি স্বীকার করেছেন যে, মেলোনির সঙ্গে তার সম্পর্কের অবনতির পেছনে মূল কারণ হলো ইরান নীতি। ট্রাম্পের প্রত্যাশা ছিল, মধ্যপ্রাচ্যে ওয়াশিংটনের কৌশলগত প্রয়োজনে ইতালি সক্রিয়ভাবে পাশে দাঁড়াবে। কিন্তু রোম সরকার তাদের নিজস্ব ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে অটল থাকায় ট্রাম্প অনেকটা ক্ষুব্ধই হয়েছেন। ট্রাম্পের ভাষায়, ইরান ইস্যুতে মেলোনি তাদের সাহায্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন, যা ছিল এক বড় ধরনের ভুল। মূলত গত মার্চ মাসে সিসিলির সিগোনেলা বিমান ঘাঁটিতে মার্কিন সামরিক বিমানের অবতরণের অনুমতি না দেওয়া নিয়ে যে দ্বন্দ্বের শুরু হয়েছিল, তা আজ ইরান ইস্যুকে কেন্দ্র করে আরও প্রকট হয়েছে। ট্রাম্পের অভিযোগ, ইতালি তাদের পাশে না দাঁড়ালে হরমুজ প্রণালীর মতো স্পর্শকাতর স্থানে ইতালির স্বার্থের সুরক্ষায় মার্কিন প্রশাসনও আগের মতো সক্রিয় থাকবে না।
ব্যক্তিগত রেষারেষির বিষয়টিও এই কূটনৈতিক সংঘাতের উত্তাপ বাড়িয়ে দিয়েছে। গত মাসে জি-৭ সম্মেলনের একটি ছবি নিয়ে দুই নেতার পাল্টাপাল্টি মন্তব্য বিশ্বজুড়ে আলোচনার খোরাক জুগিয়েছে। মেলোনির দিকে তাকিয়ে থাকার একটি ছবি ট্রুথ সোশ্যালে পোস্ট করে ট্রাম্প লিখেছিলেন ‘সংযম প্রয়োজন’, যা ইতালির রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলে প্রচণ্ড ক্ষোভের সৃষ্টি করেছিল। মেলোনি এই দাবিকে ভিত্তিহীন এবং ডাহা মিথ্যা বলে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। এরপর থেকেই দুই নেতার মধ্যে এক অদৃশ্য দেয়াল তৈরি হয়েছে। যদিও ট্রাম্প এখন তাকে ভালো মানুষ বলছেন, কিন্তু রাজনীতির মাঠে তার এই মন্তব্যকে অনেকেই রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে দেখছেন, যেখানে ব্যক্তিগত প্রশংসা ও প্রকাশ্যে সমালোচনা একই সঙ্গে চলছে।
ইতালীয় সরকারের পক্ষ থেকে এই উত্তেজনার বিপরীতে এক ধরনের নীরবতা পালন করা হচ্ছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তোনিও তাজানির মন্তব্য থেকে বোঝা যায় যে, রোম সরকার ট্রাম্পের এই অস্থির ও উসকানিমূলক আচরণের সঙ্গে আর পাল্লা দিতে ইচ্ছুক নয়। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, ট্রাম্প নিজের মতো কথা বলেন এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উসকানিমূলক মন্তব্য করা তার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। রোম এই বিতর্ককে আরও বড় হতে দিতে চায় না। মেলোনির কার্যালয় থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া না পাওয়া গেলেও, ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো বলছে যে, ন্যাটো সম্মেলনে ট্রাম্পের সঙ্গে দেখা হলে প্রধানমন্ত্রী মেলোনি অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে পরিস্থিতি সামাল দেবেন। তিনি কোনো ধরনের ব্যক্তিগত বিরোধে না জড়িয়ে বরং ইতালির জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে হাসিমুখেই ট্রাম্পের অভিবাদন গ্রহণ করবেন।
মানবিক ও কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই পরিস্থিতির বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বড় রাষ্ট্রগুলোর উচ্চাকাঙ্ক্ষা যখন ছোট বা মাঝারি দেশগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করে, তখন সেখানে সংঘাত অনিবার্য হয়ে ওঠে। মেলোনি তার দেশের জনগণের স্বার্থের কথা ভেবে ইরান সংকটে নিরপেক্ষ অবস্থান নিয়েছেন। অন্যদিকে, ট্রাম্প বিশ্বের প্রধান শক্তি হিসেবে সব মিত্রকে তাদের নির্দেশমতো কাজ করতে দেখতে চান। এই দুই বিপরীতধর্মী আদর্শের সংঘাতই আজকের কূটনৈতিক অচলাবস্থার মূল কারণ। ন্যাটো সম্মেলনের মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় এই দুই নেতার ব্যক্তিগত বিরোধের প্রভাব কতটুকু পড়ে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
পরিশেষে বলা যায়, জর্জিয়া মেলোনি ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই বৈপরীত্যপূর্ণ সম্পর্কের ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে আসন্ন ন্যাটো সম্মেলনের সিদ্ধান্তের ওপর। ট্রাম্প যদি তার কঠোর অবস্থান থেকে সরে এসে মিত্র দেশগুলোর সার্বভৌমত্বের প্রতি আরও বেশি শ্রদ্ধাশীল হন, তবেই এই উত্তেজনা প্রশমিত হওয়া সম্ভব। আর যদি ওয়াশিংটন কেবল নিজস্ব এজেন্ডা বাস্তবায়নে মরিয়া হয়ে থাকে, তবে ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ফাটল আরও বড় হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। আঙ্কারার সম্মেলনে দুই নেতার এই মুখোমুখি সাক্ষাৎ কি সম্পর্কের তিক্ততা দূর করবে, নাকি নতুন কোনো বিতর্কের জন্ম দেবে—সেই অপেক্ষায় রয়েছে পুরো বিশ্ব। একটি বাংলাদেশ অনলাইন এই আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রতিটি মোড় অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে এবং আপনাদের কাছে সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পৌঁছে দিতে অঙ্গীকারবদ্ধ।