সম্পদ কি প্রকৃত সুখের চাবিকাঠি? ইসলামের দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই, ২০২৬
  • ৩৭ বার
সম্পদ কি প্রকৃত সুখের চাবিকাঠি? ইসলামের দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ

প্রকাশ:  ০৯ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মানুষের চিরন্তন অনুসন্ধানের নাম সুখ। এই সুখের সন্ধানে যুগে যুগে মানুষ দিগ্বিদিক ছুটেছে, আর সেই যাত্রাপথের প্রধান অন্বেষণ ছিল ধন-সম্পদ ও প্রাচুর্য। আধুনিক এই বস্তুবাদী পৃথিবীতে আমাদের অধিকাংশ কর্মযজ্ঞের মূল প্রেরণা হলো অর্থ উপার্জন এবং জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন। সমাজের সাধারণ ধারণা অনুযায়ী, যার ব্যাংক ব্যালেন্স যত বেশি, যার বিলাসবহুল প্রাসাদের সংখ্যা যত বেশি, তিনি সম্ভবত তত বেশি সুখী। কিন্তু বাস্তবতা কি আসলেই তাই? পৃথিবীর ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলে দেখা যায়, অঢেল সম্পদের মালিক হয়েও অনেকে মানসিক অশান্তি, গভীর বিষণ্ণতা এবং একাকীত্বের অতল গহ্বরে হারিয়ে গেছেন। অন্যদিকে, সীমিত আয়ের একজন মানুষও আল্লাহর প্রতি গভীর আস্থা ও কৃতজ্ঞতা নিয়ে পরম প্রশান্তিতে জীবন অতিবাহিত করছেন। প্রকৃত সুখ কি তবে কেবলই বস্তুগত অর্জনের বিষয়, নাকি এর চেয়েও গভীর কোনো সত্তা রয়েছে সুখের মূলে?

ইসলামী দর্শনের আলোকে যদি বিশ্লেষণ করা হয়, তবে দেখা যায় সম্পদ কোনোভাবেই সুখের নিশ্চয়তা দিতে পারে না। সম্পদ কেবল পার্থিব জীবনের একটি প্রয়োজন, চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়। অর্থের মাধ্যমে মানুষের মৌলিক চাহিদা যেমন অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান ও চিকিৎসা নিশ্চিত করা সম্ভব, জীবনযাত্রাকে আরামদায়ক করা যায়, কিন্তু হৃদয়ের গহীন কোণের শূন্যতা অর্থ দিয়ে পূরণ করা অসম্ভব। মানুষের অন্তর হলো আল্লাহর আরশ বা তাঁর স্মরণের জায়গা। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে স্পষ্ট ঘোষণা করেছেন যে, একমাত্র তাঁর স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্তি লাভ করে। যখন মানুষ জাগতিক সম্পদের মোহে অন্ধ হয়ে পড়ে, তখন তার আত্মা তার প্রকৃত উৎস অর্থাৎ স্রষ্টার সান্নিধ্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এই বিচ্ছিন্নতা থেকেই জন্ম নেয় অস্থিরতা।

পবিত্র কোরআন আমাদের বারবার স্মরণ করিয়ে দেয় যে, এই পৃথিবীতে অর্জিত ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি কেবল একটি পরীক্ষা। সম্পদ মানুষের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি আমানত বা বিশেষ অনুগ্রহ হতে পারে, কিন্তু এটিই যে শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ড, তা নয়। কারুনের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, তার ধন-সম্পদ তাকে অহংকারী করে তুলেছিল এবং পরিণামে সেই সম্পদই তার ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সম্পদ যদি বিনয় ও কৃতজ্ঞতা বৃদ্ধি না করে বরং অহংকারে নিমজ্জিত করে, তবে সেই সম্পদ প্রকৃত সুখের পরিবর্তে মানুষের জন্য অভিশাপে পরিণত হয়। সম্পদ মানুষকে আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল বা উদাসীন করে তোলে কি না, সেটাই বড় পরীক্ষা। প্রাচুর্যের তীব্র প্রতিযোগিতায় মত্ত থাকা মানুষ অনেক সময় ইবাদত, নৈতিকতা এবং পরকালের চিরস্থায়ী সফলতার কথা বিস্মৃত হয়।

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শিক্ষা অনুযায়ী, প্রকৃত ধনী সেই ব্যক্তি নয় যার সম্পদের পাহাড় আছে, বরং প্রকৃত ধনী হলো সেই ব্যক্তি যার অন্তর পরিতৃপ্ত। অন্তরের তৃপ্তি বা সন্তুষ্টিই হলো প্রকৃত সুখের মূল ভিত্তি। লোভ বা লালসা এমন এক আগুনের মতো যা মানুষকে কখনো শান্তি দেয় না। মানুষ যতই সম্পদ আহরণ করুক না কেন, তার চাহিদার কোনো শেষ থাকে না। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, আদম সন্তানকে যদি স্বর্ণে পরিপূর্ণ দুটি উপত্যকাও দেওয়া হয়, তবুও সে তৃতীয়টির আকাঙ্ক্ষা করবে। এই অন্তহীন আকাঙ্ক্ষাই মানুষের জীবনের অশান্তির প্রধান উৎস। পক্ষান্তরে, যে ব্যক্তি যা পেয়েছে তাতে সন্তুষ্ট থাকতে শেখে, তার হৃদয়ে তৈরি হয় এক স্বর্গীয় প্রশান্তি।

সম্পদের আরেকটি নিষ্ঠুর সত্য হলো এর অনিত্যতা। মানুষ যত ধনাঢ্যই হোক না কেন, মৃত্যুর সময় এই পৃথিবীর সম্পদ তার সাথে যায় না। ধন-সম্পদ, ক্ষমতা কিংবা প্রভাব—সবই জীবনের শেষ প্রান্তে এসে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। কবর কিংবা পরকালে এই সম্পদের কোনো কার্যকর ভূমিকা নেই; সেখানে কেবল সঙ্গী হয় মানুষের ঈমান, সৎকর্ম এবং স্রষ্টার সন্তুষ্টি। সুতরাং, সম্পদকে জীবনের চূড়ান্ত গন্তব্য না বানিয়ে তাকে একটি মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করাই বুদ্ধিমানের কাজ। সম্পদ উপার্জনের ক্ষেত্রে হালাল পথের সন্ধান করা, জাকাত ও সদকার মাধ্যমে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং অপচয় ও অহংকার পরিহার করে জীবন পরিচালনা করাই ইসলামের মূল শিক্ষা।

পবিত্র কোরআনে সুরা নাহলে আল্লাহ তাআলা ওয়াদা করেছেন যে, যে নারী কিংবা পুরুষ ঈমানদার অবস্থায় সৎকর্ম করবে, তিনি অবশ্যই তাকে এক পবিত্র ও সুন্দর জীবন দান করবেন। এই ‘পবিত্র জীবন’ কেবল জাগতিক সুখ নয়, বরং এটি অন্তরের এমন এক প্রশান্তি, যা কোনো অট্টালিকার ভেতরে পাওয়া সম্ভব নয়। সম্পদ উপার্জনের সময় যদি আল্লাহকে মনে রাখা হয় এবং সেই সম্পদ দিয়ে মানুষের কল্যাণ করা হয়, তবেই সেই সম্পদ সুখের মাধ্যম হতে পারে। কিন্তু যখনই সম্পদ মানুষের নৈতিকতাকে পদদলিত করে, তখন তা মানুষের পতন নিশ্চিত করে। আমাদের উচিত সম্পদ আহরণের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত না হয়ে নিজের চরিত্র গঠন ও পরকালের পাথেয় সংগ্রহের দিকে মনোনিবেশ করা।

পরিশেষে বলা যায়, মানুষ কেবল অন্ন-বস্ত্রের জন্য বাঁচে না। মানুষের হৃদয়ে এমন এক শূন্যস্থান রয়েছে যা কেবল আল্লাহর ভালোবাসা ও আনুগত্যের মাধ্যমেই পূর্ণ করা সম্ভব। প্রকৃত সুখ কোনো ব্যাংক ব্যালেন্স, বিলাসবহুল জীবনযাত্রা কিংবা খ্যাতি নয়; বরং এটি হলো স্রষ্টার প্রতি গভীর ঈমান, তাকওয়া, ধৈর্য এবং কৃতজ্ঞতাময় একটি জীবন। যারা সম্পদকে জীবনের লক্ষ্য না বানিয়ে তাকে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যম বানায়, তারাই পৃথিবীতে প্রকৃত সুখী। দুনিয়ার সম্পদ একদিন নিঃশেষ হয়ে যাবে, কিন্তু ঈমান ও সৎকাজের মর্যাদা থাকবে চিরকাল। প্রকৃত সুখ সেই চিরস্থায়ী ঠিকানায় পৌঁছানোর প্রচেষ্টার মধ্যেই বিদ্যমান।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত