চলনবিলে পানি বাড়তেই নৌকা তৈরিতে ব্যস্ত কারিগররা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১১ জুলাই, ২০২৬
  • ৬ বার
চলনবিলে পানি বাড়তেই নৌকা তৈরিতে ব্যস্ত কারিগররা

প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বর্ষার শুরুতেই চলনবিল অঞ্চলে বন্যার পানি বাড়তে শুরু করেছে। নাটোরের সিংড়া উপজেলার নিম্নাঞ্চলে ইতোমধ্যে পানি প্রবেশ করায় স্থানীয় মানুষের মধ্যে বর্ষাকালীন প্রস্তুতি জোরদার হয়েছে। আর সেই প্রস্তুতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে নৌকা। নতুন নৌকা তৈরির পাশাপাশি পুরোনো নৌকা মেরামতের কাজেও ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন কারিগররা। দিনরাত পরিশ্রম করে তারা নৌকা তৈরি করছেন, যাতে বর্ষার পুরো মৌসুমজুড়ে চলনবিলের মানুষের যাতায়াত, মাছ ধরা এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রা সচল থাকে।

চলনবিল বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ জলাভূমি। বর্ষাকালে বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে যায় এবং বহু গ্রামের সঙ্গে স্থলপথের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তখন নৌকাই হয়ে ওঠে মানুষের একমাত্র ভরসা। বাড়ি থেকে বাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে চিকিৎসাকেন্দ্র কিংবা কৃষিজমি—সবখানেই যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয় নৌকা। ফলে বর্ষা এলেই এ অঞ্চলে নৌকার চাহিদা কয়েক গুণ বেড়ে যায়।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সিংড়া উপজেলার বিলদহর, কালিনগর, শেরকোল, তাজপুর, সাঁতপুকুরিয়া, বড়িয়া, ডাহিয়া, বিয়াশসহ বিভিন্ন এলাকায় পানি বাড়তে শুরু করেছে। যদিও এখনো বড় ধরনের বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি, তবে স্থানীয়রা আগাম প্রস্তুতি হিসেবে নৌকা তৈরি ও সংস্কারের দিকে ঝুঁকছেন। কারণ আষাঢ় থেকে কার্তিক পর্যন্ত প্রায় পাঁচ মাস চলনবিলের অনেক এলাকায় জলাবদ্ধতা ও বন্যার প্রভাব থাকে।

সরেজমিনে বিভিন্ন নৌকা তৈরির কারখানা ঘুরে দেখা যায়, কারিগরদের ব্যস্ততার শেষ নেই। কোথাও নতুন ডিঙি নৌকার কাঠ কাটা হচ্ছে, কোথাও আবার পুরোনো নৌকার তক্তা বদলানো, আলকাতরা লাগানো কিংবা লোহার পাত ও তারকাঁটা দিয়ে ফাঁকফোকর বন্ধ করার কাজ চলছে। অনেকেই সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করছেন, যাতে সময়মতো ক্রেতাদের কাছে নৌকা সরবরাহ করা যায়।

স্থানীয় কারিগররা জানান, বর্ষাকাল তাদের জন্য বছরের সবচেয়ে ব্যস্ত সময়। সারা বছর কাঠের আসবাব বা অন্যান্য কাঠের কাজ করলেও বর্ষা এলেই তারা নৌকা তৈরিতে মনোযোগ দেন। এই কয়েক মাসের অতিরিক্ত আয় তাদের সংসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে এবার কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধির কারণে আগের তুলনায় উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়েছে।

সিংড়া পৌর শহরের বালুয়া-বাসুয়া এলাকার এক কাঠমিস্ত্রি জানান, বছরের অন্যান্য সময় তিনি ঘরবাড়ির কাঠের কাজ করেন। কিন্তু বর্ষা শুরু হলে নৌকা তৈরির কাজই হয়ে ওঠে প্রধান পেশা। নতুন নৌকা তৈরির পাশাপাশি পুরোনো নৌকা মেরামতের জন্যও প্রচুর মানুষ আসছেন। এতে অতিরিক্ত আয়ের সুযোগ তৈরি হলেও কাঠ, আলকাতরা ও অন্যান্য উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় আগের মতো লাভ থাকছে না।

চকসিংড়া মহল্লার একটি নৌকা তৈরির কারখানার মালিক আব্দুল হান্নান জানান, তার কারখানায় প্রধানত কড়ই, হিজল ও মেহগনি কাঠ দিয়ে নৌকা তৈরি করা হয়। একটি নৌকা তৈরিতে কাঠের পাশাপাশি বাঁশ, আলকাতরা, লোহার পাত, তারকাঁটা ও অন্যান্য উপকরণ ব্যবহার করতে হয়। চলতি মৌসুমে ইতোমধ্যে প্রায় ৬০টি নতুন নৌকা বিক্রি হয়েছে। মৌসুম শেষ হওয়ার আগেই ২০০ থেকে ২৫০টি নৌকা বিক্রির আশা করছেন তিনি। বর্তমানে কাঠের ছোট ডিঙি নৌকা ৫ হাজার ৫০০ থেকে ৬ হাজার টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে প্লেন শিটের তৈরি নৌকার দাম ৮ হাজার ৫০০ থেকে ৯ হাজার টাকার মধ্যে।

কারিগর স্বপন চন্দ্র সূত্রধর জানান, বর্ষার ব্যস্ত মৌসুমে তিনি প্রতিদিন দুই থেকে তিনটি নৌকা তৈরি করেন। নৌকার ধরন ও আকার অনুযায়ী প্রতিটির জন্য এক হাজার থেকে এক হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত মজুরি পান। বছরের বাকি সময় কাঠমিস্ত্রির কাজ করলেও বর্ষাকালের এই অতিরিক্ত কাজই তার পরিবারের আয়ের অন্যতম উৎস।

নৌকা কিনতে আসা সাঁতপুকুরিয়া গ্রামের বাসিন্দা রুবেল হোসেন বলেন, তাদের গ্রামটি চলনবিলের মাঝামাঝি হওয়ায় সামান্য বৃষ্টিতেই রাস্তাঘাট পানির নিচে চলে যায়। বর্ষার সময় নৌকা ছাড়া চলাচলের বিকল্প থাকে না। তাই আগেভাগেই নতুন নৌকা কিনতে এসেছেন। তবে গত বছরের তুলনায় এবার নৌকার দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে তিনি জানান।

চামারী ইউনিয়নের আনন্দনগর এলাকার আফজাল হোসেন বলেন, পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মাছ ধরা, কৃষিজমিতে যাওয়া এবং এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়িতে যাতায়াতের জন্য নৌকার প্রয়োজনীয়তা বেড়ে যায়। তাই মৌসুমের শুরুতেই নতুন নৌকা কিনে রাখা নিরাপদ বলে মনে করেন তিনি।

আরেক নৌকা প্রস্তুতকারক গোদা কুমার বলেন, কাঠ, লোহা, পেরেক, আলকাতরাসহ প্রায় সব ধরনের উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে আগের দামে নৌকা বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না। ক্রেতাদেরও বাড়তি দাম গুনতে হচ্ছে, যদিও অধিকাংশই প্রয়োজনের তাগিদে নৌকা কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।

স্থানীয়দের মতে, চলনবিলের মানুষের জীবনযাত্রা বর্ষার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বছরের একটি বড় সময় পানিবেষ্টিত অবস্থায় কাটাতে হয় তাদের। এই সময় নৌকা শুধু একটি যানবাহন নয়, বরং শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষিকাজ, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং জীবিকার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত একটি অপরিহার্য মাধ্যম। জেলেদের জন্য মাছ ধরা, কৃষকদের জন্য জমিতে পৌঁছানো এবং সাধারণ মানুষের জন্য দৈনন্দিন চলাচল—সব ক্ষেত্রেই নৌকার বিকল্প নেই।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও আকস্মিক বন্যার প্রবণতা বেড়েছে। ফলে চলনবিলের মতো জলাভূমি এলাকায় আগাম প্রস্তুতির গুরুত্বও বাড়ছে। স্থানীয়ভাবে নৌকা উৎপাদন শুধু মানুষের প্রয়োজনই পূরণ করছে না, বরং বহু কারিগর ও শ্রমিকের জন্য মৌসুমি কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি করছে। তবে উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখতে কাঁচামালের মূল্য স্থিতিশীল রাখা এবং ক্ষুদ্র কারিগরদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ ও সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প আরও বিকশিত হতে পারে।

বর্ষার পানি যত বাড়ছে, ততই চলনবিল অঞ্চলে নৌকার গুরুত্ব নতুন করে সামনে আসছে। নদী, খাল ও বিলঘেরা এই জনপদে মানুষের জীবনযাত্রা সচল রাখতে নৌকা আজও অপরিহার্য। তাই বর্ষার প্রতিটি মৌসুমের মতো এবারও কারিগরদের হাতুড়ির শব্দ, কাঠের গন্ধ আর নতুন নৌকা তৈরির ব্যস্ততা জানান দিচ্ছে—চলনবিল আবারও তার চিরচেনা জলজ জীবনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত