প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
টানা ভারী বর্ষণ, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং নদ-নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম, সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও বান্দরবানসহ কয়েকটি জেলার পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হচ্ছে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (বাপাউবো) বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, শনিবার (১১ জুলাই) সকাল ৯টার তথ্য অনুযায়ী দেশের চারটি প্রধান নদীর ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। একই সঙ্গে আগামী ৪৮ ঘণ্টায় দেশের বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতির আশঙ্কা রয়েছে বলে সতর্ক করেছে সংস্থাটি।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের সর্বশেষ পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, সাঙ্গু, কুশিয়ারা, মনু এবং খোয়াই নদীর বিভিন্ন স্থানে পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে। বান্দরবান পয়েন্টে সাঙ্গু নদীর পানি বিপৎসীমার ১০৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে, যা বর্তমানে সবচেয়ে উদ্বেগজনক অবস্থানগুলোর একটি। একই নদীর দোহাজারী পয়েন্টেও পানি বিপৎসীমার ১৯ সেন্টিমিটার ওপরে রয়েছে। এতে বান্দরবান ও চট্টগ্রামের নিম্নাঞ্চলে নতুন করে প্লাবনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে কুশিয়ারা নদীর পানি সুনামগঞ্জের মারকুলি পয়েন্টে বিপৎসীমার ১৭ সেন্টিমিটার এবং সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ পয়েন্টে ২১ সেন্টিমিটার ওপরে প্রবাহিত হচ্ছে। মনু নদীর মৌলভীবাজার পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ৩৮ সেন্টিমিটার ওপরে উঠে গেছে। এছাড়া হবিগঞ্জের বল্লা পয়েন্টে খোয়াই নদীর পানি বিপৎসীমার এক সেন্টিমিটার ওপরে অবস্থান করছে। এসব এলাকায় নদীর তীরবর্তী নিম্নাঞ্চলে পানি প্রবেশ অব্যাহত থাকায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, দেশের ১২৭টি পর্যবেক্ষণাধীন নদী স্টেশনের মধ্যে ৫৭টি পয়েন্টে পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সময়ে ৬৪টি পয়েন্টে পানি কমলেও ছয়টি পয়েন্টে পানির স্তর অপরিবর্তিত রয়েছে। তবে যেসব এলাকায় পানি বাড়ছে, সেখানে পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে এবং নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সাম্প্রতিক ২৪ ঘণ্টার বৃষ্টিপাতের তথ্য পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। দেশের অভ্যন্তরে সর্বোচ্চ ১৫৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে সিলেটের জাফলংয়ে। অন্যদিকে ভারতের মেঘালয়ের চেরাপুঞ্জিতে একই সময়ে ১৩০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। উজানের এই অতিবৃষ্টির পানি সীমান্তবর্তী নদীগুলোর মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রবেশ করায় নদ-নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র আরও জানিয়েছে, বর্তমানে আরও নয়টি নদী পর্যবেক্ষণ পয়েন্ট বিপৎসীমার কাছাকাছি বা সতর্কসীমায় অবস্থান করছে। এসব পয়েন্টের মধ্যে রয়েছে তিস্তা নদীর ডালিয়া, কাউনিয়া ও তারাপুর, কুশিয়ারা নদীর শেরপুর, সুরমা নদীর কানাইঘাট ও ছাতক, সোমেশ্বরী নদীর কলমাকান্দা, মুহুরী নদীর হরিপুর এবং মাতামুহুরী নদীর চিরিঙ্গা। এসব এলাকায় পানি আরও বৃদ্ধি পেলে দ্রুত বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী সরদার উদয় রায়হান জানিয়েছেন, আগামী ৪৮ ঘণ্টা দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে, অব্যাহত বৃষ্টিপাত এবং উজান থেকে নেমে আসা ঢলের কারণে বন্যা পরিস্থিতি আরও অবনতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে এরপর বৃষ্টিপাত কমে এলে এবং নদীর প্রবাহ স্বাভাবিক হলে পরিস্থিতির ধীরে ধীরে উন্নতি হতে পারে।
এদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, আগামী ১৩ জুলাই পর্যন্ত দেশের উত্তর, দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলে ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকতে পারে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় অতিবৃষ্টির সম্ভাবনা থাকায় নতুন করে জলাবদ্ধতা, পাহাড়ি ঢল এবং নদীর পানি বৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। ফলে স্থানীয় প্রশাসন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে সতর্ক অবস্থানে থাকতে বলা হয়েছে।
বন্যার প্রভাবে অনেক এলাকায় কৃষিজমি ইতোমধ্যে পানির নিচে চলে গেছে। আমন ধানের বীজতলা, সবজি ক্ষেত এবং বিভিন্ন মৌসুমি ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি গ্রামীণ সড়ক, কালভার্ট এবং যোগাযোগ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবরও বিভিন্ন এলাকা থেকে পাওয়া যাচ্ছে। কোথাও কোথাও নৌযানই হয়ে উঠেছে মানুষের একমাত্র যাতায়াতের মাধ্যম।
নিম্নাঞ্চলের বহু পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। অনেকেই নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে উঁচু স্থানে কিংবা আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান নিচ্ছেন। বিশুদ্ধ পানির সংকট, খাদ্য সরবরাহে বিঘ্ন এবং স্বাস্থ্যঝুঁকিও ধীরে ধীরে বাড়ছে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং গর্ভবতী নারীদের জন্য পরিস্থিতি আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে বলে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, বন্যার সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আগাম সতর্কতা এবং দ্রুত সমন্বিত উদ্যোগ। স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং সাধারণ মানুষের সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। নদীতীরবর্তী এলাকার মানুষকে প্রয়োজন ছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে না যাওয়ার পাশাপাশি প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে চলারও আহ্বান জানানো হয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, সার্বিক পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন পূর্বাভাস প্রকাশ করা হবে। একই সঙ্গে নদীতীরবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার, গবাদিপশু নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার এবং জরুরি প্রয়োজনীয় সামগ্রী প্রস্তুত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
দেশজুড়ে চলমান এই বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে আগামী দুই দিন পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। তবে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী ৪৮ ঘণ্টা সতর্ক থাকা ছাড়া বিকল্প নেই। আবহাওয়ার উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত বন্যাপ্রবণ এলাকার মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।