প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিশ্বকাপের উত্তাপ যতই চূড়ান্ত পর্বের দিকে এগোচ্ছে, ততই জমে উঠছে প্রতিটি ম্যাচের নাটকীয়তা। শিরোপার স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখতে এখন আর কোনো ভুলের সুযোগ নেই। এমন বাস্তবতায় ফুটবল বিশ্বের কোটি সমর্থকের চোখ এখন যুক্তরাষ্ট্রের কনসাস সিটির দিকে। বাংলাদেশ সময় রোববার সকাল ৭টায় বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালের শেষ ম্যাচে মুখোমুখি হবে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা ও ইউরোপের অন্যতম সংগঠিত দল সুইজারল্যান্ড। একদিকে লিওনেল মেসির অনন্য নেতৃত্বে টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জয়ের লক্ষ্যে এগিয়ে চলা আর্জেন্টিনা, অন্যদিকে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ওঠার স্বপ্নে বিভোর সুইজারল্যান্ড। ফলে ম্যাচটি শুধুই দুই দলের লড়াই নয়, এটি আক্রমণাত্মক ফুটবল বনাম শৃঙ্খলাবদ্ধ রক্ষণভাগেরও এক দুর্দান্ত পরীক্ষা।
বিশ্বকাপের শুরু থেকেই আর্জেন্টিনা নিজেদের অন্যতম শক্তিশালী দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। গ্রুপ পর্বে ধারাবাহিক আধিপত্য বিস্তার করে নকআউটে ওঠার পরও তারা কঠিন প্রতিপক্ষের সামনে নিজেদের মানসিক দৃঢ়তার পরিচয় দিয়েছে। বিশেষ করে নকআউট পর্বে কেপ ভার্দের বিপক্ষে ২-১ গোলের জয় এবং রাউন্ড অব সিক্সটিনে মিসরের বিপক্ষে দুই গোলে পিছিয়ে থেকেও ৩-২ ব্যবধানে অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন করে জয় তুলে নেওয়া আর্জেন্টিনার আত্মবিশ্বাসকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। সেই ম্যাচে আবারও প্রমাণ হয়েছে, সংকট যত বড়ই হোক, লিওনেল মেসি থাকলে আর্জেন্টিনা কখনোই ম্যাচ থেকে ছিটকে পড়ে না।
৩৯ বছর বয়সেও মেসি যেন সময়কে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে খেলছেন। এবারের বিশ্বকাপে তার পারফরম্যান্স অনেক তরুণ ফুটবলারের জন্যও ঈর্ষণীয়। গোল করা, সুযোগ তৈরি, দলের আক্রমণ পরিচালনা এবং কঠিন সময়ে নেতৃত্ব দেওয়া—সব ক্ষেত্রেই তিনি অসাধারণ। টুর্নামেন্টে এখন পর্যন্ত ধারাবাহিক গোল করে গোল্ডেন বুটের লড়াইয়েও এগিয়ে রয়েছেন তিনি। শুধু গোলই নয়, প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভেঙে সতীর্থদের জন্য সুযোগ তৈরির ক্ষেত্রেও তার ভূমিকা অনন্য। মেসির প্রতিটি স্পর্শ, প্রতিটি পাস এবং প্রতিটি সিদ্ধান্ত আর্জেন্টিনার আক্রমণে নতুন মাত্রা যোগ করছে।
মেসির পাশাপাশি জুলিয়ান আলভারেজ, লাউতারো মার্টিনেজ এবং মধ্যমাঠের সৃজনশীল ফুটবলাররাও দারুণ ছন্দে রয়েছেন। তাদের দ্রুত গতির আক্রমণ, ছোট ছোট পাস এবং বক্সের ভেতরে কার্যকর উপস্থিতি যে কোনো প্রতিপক্ষের জন্য ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে। কোচ লিওনেল স্কালোনি পুরো টুর্নামেন্টজুড়েই ভারসাম্যপূর্ণ ফুটবলের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তার কৌশলগত পরিবর্তন এবং ম্যাচ পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা আর্জেন্টিনাকে আরও পরিণত দলে পরিণত করেছে।
তবে এই আর্জেন্টিনার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে সুইজারল্যান্ডের সুসংগঠিত রক্ষণভাগ। পুরো টুর্নামেন্টে সুইসরা এখন পর্যন্ত অপরাজিত রয়েছে এবং মাত্র তিনটি গোল হজম করেছে। তাদের ডিফেন্সের শৃঙ্খলা, সঠিক পজিশনিং, নিখুঁত ট্যাকল এবং অফসাইড ট্র্যাপ প্রতিপক্ষের আক্রমণকে বারবার ব্যর্থ করে দিয়েছে। ফলে মেসি-আলভারেজদের জন্য গোলের সুযোগ তৈরি করা মোটেও সহজ হবে না।
বিশেষ করে গোলরক্ষক গ্রেগর কোবেল এবারের বিশ্বকাপে সুইজারল্যান্ডের অন্যতম বড় শক্তি হয়ে উঠেছেন। রাউন্ড অব সিক্সটিনে কলম্বিয়ার বিপক্ষে টাইব্রেকারে তার অসাধারণ সেভ দলকে কোয়ার্টার ফাইনালে তুলে আনে। পুরো টুর্নামেন্টে তার আত্মবিশ্বাসী গোলকিপিং, দ্রুত সিদ্ধান্ত এবং দুর্দান্ত রিফ্লেক্স প্রশংসা কুড়িয়েছে ফুটবল বিশ্লেষকদের। আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগকে ঠেকাতে কোবেলের ভূমিকা আবারও নির্ধারণী হয়ে উঠতে পারে।
অবশ্য সুইজারল্যান্ড শুধু রক্ষণেই শক্তিশালী নয়। সুযোগ পেলেই দ্রুত পাল্টা আক্রমণে যাওয়ার সক্ষমতাও রয়েছে তাদের। মাঝমাঠ থেকে দ্রুত বল বের করে প্রতিপক্ষের রক্ষণে চাপ তৈরি করতে তারা দক্ষ। আর্জেন্টিনা যদি অতিরিক্ত আক্রমণে উঠে গিয়ে রক্ষণে ফাঁক তৈরি করে, তাহলে সেই সুযোগ কাজে লাগাতে দ্বিধা করবে না সুইসরা। কোচ মুরাত ইয়াকিনও জানেন, মেসিকে পুরোপুরি থামানো প্রায় অসম্ভব। তাই তার পরিকল্পনা হবে মেসিকে যতটা সম্ভব বল থেকে দূরে রাখা, মাঝমাঠে জায়গা সংকুচিত করা এবং বক্সের সামনে অতিরিক্ত খেলোয়াড় রেখে আর্জেন্টিনার আক্রমণ ভেঙে দেওয়া।
এদিকে আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় উদ্বেগ তাদের রক্ষণভাগ। নকআউট পর্বের দুই ম্যাচে চার গোল হজম করেছে স্কালোনির দল। বিশেষ করে দ্রুত কাউন্টার অ্যাটাক সামলাতে গিয়ে ডিফেন্সে কিছু সমন্বয়হীনতা দেখা গেছে। সুইজারল্যান্ড নিশ্চয়ই সেই দুর্বল জায়গাগুলো লক্ষ্য করেই নিজেদের আক্রমণ সাজাবে। ফলে আর্জেন্টিনার ডিফেন্ডারদেরও পুরো ম্যাচজুড়ে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে।
অতীত পরিসংখ্যান অবশ্য আর্জেন্টিনার পক্ষেই কথা বলছে। দুই দলের মধ্যে এখন পর্যন্ত সাতটি আন্তর্জাতিক ম্যাচে পাঁচটিতে জয় পেয়েছে আর্জেন্টিনা এবং দুটি ম্যাচ ড্র হয়েছে। বিশ্বকাপের মঞ্চেও দুইবার মুখোমুখি হয়ে দুবারই জয় পেয়েছে দক্ষিণ আমেরিকার দলটি। বিশেষ করে ২০১৪ সালের বিশ্বকাপের রাউন্ড অব সিক্সটিনে অতিরিক্ত সময়ে অ্যাঙ্গেল দি মারিয়ার গোলে ১-০ ব্যবধানে জয় পেয়েছিল আর্জেন্টিনা। যদিও সেই ম্যাচে সুইজারল্যান্ড আর্জেন্টিনাকে দীর্ঘ সময় চাপে রেখেছিল এবং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সমানতালে লড়াই করেছিল। তাই অতীতের অভিজ্ঞতা থেকেই বোঝা যায়, সুইজারল্যান্ডকে কখনোই হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই।
কৌশলগত দিক থেকেও ম্যাচটি হতে পারে অত্যন্ত আকর্ষণীয়। ধারণা করা হচ্ছে, স্কালোনি ৪-১-৩-২ ফরমেশনে দল সাজাতে পারেন, যেখানে মেসি ও আলভারেজ আক্রমণের মূল দায়িত্ব পালন করবেন। অন্যদিকে ইয়াকিন ৪-২-৩-১ ফরমেশন ব্যবহার করে মাঝমাঠে বাড়তি শক্তি রেখে আর্জেন্টিনার আক্রমণ ভাঙার চেষ্টা করতে পারেন। দুই কোচের পরিকল্পনা, খেলোয়াড়দের মানসিক দৃঢ়তা এবং ম্যাচের ছোট ছোট মুহূর্তই শেষ পর্যন্ত ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশ্বকাপের এই পর্যায়ে এসে কোনো দলই কেবল ভাগ্যের ওপর নির্ভর করে টিকে থাকে না। প্রতিটি দলই নিজেদের সামর্থ্যের সর্বোচ্চটা দিয়ে লড়াই করে। আর্জেন্টিনা যেমন নিজেদের আক্রমণাত্মক ফুটবল দিয়ে আবারও বিশ্বজয়ের স্বপ্ন দেখছে, তেমনি সুইজারল্যান্ড বিশ্বাস করছে তাদের সংগঠিত রক্ষণ এবং লড়াকু মানসিকতা ইতিহাস গড়তে পারে। তাই কনসাস সিটির এই লড়াইয়ে প্রতিটি মিনিটই হতে পারে উত্তেজনায় ভরপুর।
সবকিছু মিলিয়ে ফুটবলপ্রেমীদের জন্য অপেক্ষা করছে আরেকটি উচ্চমানের বিশ্বকাপ লড়াই। মেসির জাদু কি আবারও আর্জেন্টিনাকে সেমিফাইনালের পথে এগিয়ে দেবে, নাকি সুইজারল্যান্ডের অদম্য রক্ষণ ভেঙে উঠতে ব্যর্থ হবে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা? সেই প্রশ্নের উত্তর মিলবে রোববার সকালের ৯০ মিনিট, কিংবা প্রয়োজন হলে অতিরিক্ত সময় ও টাইব্রেকারের রোমাঞ্চ শেষে। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত, বিশ্বকাপের এই কোয়ার্টার ফাইনাল ফুটবলপ্রেমীদের জন্য স্মরণীয় এক লড়াই উপহার দেওয়ার সব উপকরণই বহন করছে।