অপরিকল্পিত নগরায়ণে নিয়ম ভাঙাকেই দায়ী করলেন প্রতিমন্ত্রী

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১১ জুলাই, ২০২৬
  • ৭ বার
অপরিকল্পিত নগরায়ণে নিয়ম ভাঙাকেই দায়ী করলেন প্রতিমন্ত্রী

প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের দ্রুত নগরায়ণের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে অবকাঠামোগত চ্যালেঞ্জ, জনসংখ্যার চাপ এবং পরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তা। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরে অপরিকল্পিত আবাসন, অনিয়ন্ত্রিত ভবন নির্মাণ এবং বিধিমালা উপেক্ষা করে গড়ে ওঠা স্থাপনার কারণে নগর ব্যবস্থাপনা দিন দিন আরও জটিল হয়ে উঠছে। এই বাস্তবতায় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেছেন, দেশের অপরিকল্পিত নগরায়ণের জন্য শুধু সরকারি পরিকল্পনা বা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে দায়ী করা যাবে না। বরং সাধারণ মানুষের নিয়ম না মানার প্রবণতা এবং অনুমোদিত পরিকল্পনা অনুসরণ না করাই এ সমস্যার অন্যতম প্রধান কারণ।

শনিবার (১১ জুলাই) সকালে রাজধানীতে ‘প্রকল্প ব্যবস্থাপনার সফলতা ও ব্যর্থতা’ শীর্ষক এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রতিমন্ত্রী এসব কথা বলেন। দেশের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন, নগর পরিকল্পনা, অবকাঠামো নির্মাণ এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী, পরিকল্পনাবিদ ও নীতিনির্ধারকদের আরও সমন্বিতভাবে কাজ করার ওপরও তিনি গুরুত্বারোপ করেন।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, দেশের বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্প কিংবা মেগাপ্রকল্পের ব্যয় নির্ধারণ রাজনৈতিক বিবেচনায় নয়, বরং সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী ও বিশেষজ্ঞদের কারিগরি পরিকল্পনা এবং বাস্তবসম্মত মূল্যায়নের ভিত্তিতেই নির্ধারিত হয়। একটি প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই, নকশা, প্রযুক্তিগত প্রয়োজন, নির্মাণ ব্যয় এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারযোগ্যতা বিবেচনায় নিয়েই প্রকল্পের বাজেট নির্ধারণ করা হয়। তাই উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে আলোচনা বা সমালোচনার ক্ষেত্রে প্রকৌশলগত বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

মীর শাহে আলম বলেন, পরিকল্পিত নগর গড়ে তোলার জন্য সরকার দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করে আসছে। কিন্তু বাস্তবায়নের পর্যায়ে অনেক ক্ষেত্রেই নানা ধরনের বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। বিশেষ করে রাজধানীসহ দেশের বড় শহরগুলোর অনেক এলাকায় অনুমোদিত মাস্টারপ্ল্যান অনুসরণ না করে যত্রতত্র ভবন নির্মাণ, সড়কের জায়গা দখল, জলাধার ভরাট এবং অনিয়ন্ত্রিত আবাসন প্রকল্প গড়ে ওঠায় নগর পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

তিনি উল্লেখ করেন, কোনো এলাকার জন্য ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) বা বিস্তারিত উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে সেই পরিকল্পনা অনুসরণ করা হয় না। এর ফলে সড়ক সম্প্রসারণ, ড্রেনেজ ব্যবস্থা উন্নয়ন, খেলার মাঠ, উন্মুক্ত স্থান কিংবা অন্যান্য জনসেবামূলক অবকাঠামো নির্মাণে বড় ধরনের সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়। একবার পরিকল্পনাবহির্ভূত স্থাপনা গড়ে উঠলে পরবর্তীতে সেটি সংশোধন করতে সরকারের বিপুল অর্থ, সময় এবং প্রশাসনিক সক্ষমতা ব্যয় করতে হয়।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে দ্রুত নগরায়ণের ফলে প্রতিনিয়ত শহরমুখী মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। কর্মসংস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগের কারণে শহরগুলোতে জনসংখ্যার ঘনত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই বাস্তবতায় শুধুমাত্র ছোট ছোট প্রকল্প দিয়ে নগর সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। তাই সরকার এখন দীর্ঘমেয়াদি, সমন্বিত এবং টেকসই নগর পরিকল্পনার দিকে অগ্রসর হচ্ছে, যাতে আগামী কয়েক দশকের জনসংখ্যা ও অবকাঠামোগত চাহিদাও বিবেচনায় রাখা যায়।

তিনি আরও বলেন, একটি আধুনিক ও বাসযোগ্য নগর গড়ে তুলতে শুধু সরকারের উদ্যোগই যথেষ্ট নয়। নাগরিকদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে। ভবন নির্মাণের আগে প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেওয়া, নির্ধারিত নকশা অনুসরণ করা এবং বিদ্যমান আইন ও বিধিমালা মেনে চলা প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব। নিয়ম অমান্য করে গড়ে ওঠা স্থাপনা শেষ পর্যন্ত পুরো নগরের জন্যই ঝুঁকি তৈরি করে।

সেমিনারে উপস্থিত প্রকৌশলী ও সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের উদ্দেশে প্রতিমন্ত্রী বলেন, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রকৌশলীদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি প্রকল্পের গুণগত মান, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, সময়মতো বাস্তবায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা অনেকাংশেই তাদের দক্ষতা ও পরিকল্পনার ওপর নির্ভর করে। তাই প্রকৌশলীদের আরও দায়িত্বশীল ও ভবিষ্যতমুখী পরিকল্পনা গ্রহণের আহ্বান জানান তিনি।

নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসঙ্গ তুলে মীর শাহে আলম বলেন, পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন নিশ্চিত করতে সরকার বর্তমানে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধির পাশাপাশি আবাসিক ভবনেও সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার সম্প্রসারণকে উৎসাহিত করা হচ্ছে। তিনি প্রকৌশলীদের প্রতি আহ্বান জানান, নতুন ভবনের নকশা প্রণয়নের সময় যেন সোলার সিস্টেম অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এতে ভবিষ্যতে বিদ্যুতের ওপর চাপ কমবে, জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়বে এবং পরিবেশ সংরক্ষণেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে।

তিনি বলেন, টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় ভবিষ্যতের নগর পরিকল্পনায় পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি, জ্বালানি সাশ্রয়ী স্থাপনা এবং সবুজ অবকাঠামোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে পরিকল্পিত নগরায়ণ নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় সরকার, নগর পরিকল্পনাবিদ, প্রকৌশলী, স্থপতি এবং সাধারণ নাগরিকদের সমন্বিত অংশগ্রহণ প্রয়োজন। নগর উন্নয়নের প্রতিটি ধাপে আইন ও নীতিমালা কঠোরভাবে বাস্তবায়নের পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, পরিকল্পনাবহির্ভূত নির্মাণ শুধু যানজট, জলাবদ্ধতা বা পরিবেশ দূষণের কারণই নয়, বরং দুর্যোগের সময় মানুষের জীবন ও সম্পদের জন্যও বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, দ্রুত নগরায়ণের এই সময়ে বাংলাদেশকে একটি টেকসই, আধুনিক এবং নিরাপদ নগরব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে উন্নয়ন পরিকল্পনার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার পাশাপাশি আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে নাগরিকদেরও সচেতন ও দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। সরকারের পরিকল্পনা এবং জনগণের সহযোগিতা একসঙ্গে কার্যকর হলে তবেই গড়ে উঠবে একটি সুশৃঙ্খল, বাসযোগ্য এবং ভবিষ্যৎ উপযোগী নগরব্যবস্থা।

সেমিনারে প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে উঠে আসা এসব বিষয় দেশের নগর উন্নয়ন পরিকল্পনা, অবকাঠামো ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশবান্ধব নির্মাণনীতির গুরুত্বকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। সংশ্লিষ্ট মহলের আশা, পরিকল্পিত উন্নয়ন, প্রযুক্তিনির্ভর প্রকল্প ব্যবস্থাপনা এবং আইন মেনে নগর গড়ে তোলার সংস্কৃতি জোরদার হলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের শহরগুলো আরও নিরাপদ, কার্যকর ও টেকসই হয়ে উঠবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত