রোনালদোকে ঘিরে নতুন পরিকল্পনা জানালেন হেসুস

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১১ জুলাই, ২০২৬
  • ৭ বার
রোনালদোকে ঘিরে নতুন পরিকল্পনা জানালেন হেসুস

প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

পর্তুগাল জাতীয় ফুটবলে শুরু হলো নতুন এক অধ্যায়। সাম্প্রতিক বিশ্বকাপে প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হওয়ার পর কোচিং স্টাফে বড় পরিবর্তন এনেছে পর্তুগিজ ফুটবল ফেডারেশন। রবার্তো মার্তিনেজের বিদায়ের পর জাতীয় দলের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে অভিজ্ঞ কোচ হোর্হে হেসুসকে। ৭১ বছর বয়সী এই কৌশলী কোচের হাতে ২০৩০ সাল পর্যন্ত জাতীয় দলের দায়িত্ব তুলে দিয়েছে ফেডারেশন। ঘরের মাঠে অনুষ্ঠিতব্য ২০৩০ ফিফা বিশ্বকাপকে সামনে রেখে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই এই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে মনে করছেন ফুটবল বিশ্লেষকরা।

নতুন দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল—পর্তুগালের সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোকে নিয়ে হেসুসের পরিকল্পনা কী? কারণ, বিশ্বকাপ শেষে রোনালদো নিজেই জানিয়েছেন, বিশ্বমঞ্চে সেটিই ছিল তার শেষ আসর। তবে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে আনুষ্ঠানিক অবসরের ঘোষণা এখনো দেননি পাঁচবারের ব্যালন ডি’অরজয়ী এই তারকা। ফলে জাতীয় দলে তার ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলেও নতুন কোচের প্রথম সংবাদ সম্মেলনে সেই জল্পনার অনেকটাই অবসান হয়েছে।

দায়িত্ব গ্রহণের পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে হোর্হে হেসুস স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, রোনালদোকে তিনি পর্তুগাল ফুটবলের প্রতীক হিসেবে দেখেন। তার ভাষায়, একজন ফুটবলারের মূল্য শুধু মাঠের পারফরম্যান্সে নয়, বরং দলের ওপর তার প্রভাব, অভিজ্ঞতা এবং নেতৃত্বেও নির্ভর করে। তাই রোনালদো যতদিন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে খেলার মতো ফিট ও প্রতিযোগিতামূলক অবস্থায় থাকবেন, ততদিন জাতীয় দলের দরজা তার জন্য খোলা থাকবে।

তবে একই সঙ্গে হেসুস এটিও পরিষ্কার করেছেন যে, জাতীয় দলে কোনো খেলোয়াড়ের অবস্থান কখনোই ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা অতীতের অর্জনের ওপর নির্ভর করবে না। দলের প্রয়োজন, ম্যাচ পরিকল্পনা এবং সামগ্রিক কৌশল বিবেচনা করেই তিনি সিদ্ধান্ত নেবেন। অর্থাৎ রোনালদো জাতীয় দলে থাকবেন, তবে সেটি হবে নির্দিষ্ট পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই। নতুন কোচের এই মন্তব্য থেকে স্পষ্ট, তিনি একদিকে যেমন রোনালদোর অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে চান, অন্যদিকে ভবিষ্যতের জন্য নতুন প্রজন্মের খেলোয়াড়দেরও প্রস্তুত করতে আগ্রহী।

রোনালদোর সঙ্গে হেসুসের সম্পর্কও বেশ ইতিবাচক। জাতীয় দলের দায়িত্ব নেওয়ার আগে তিনি সৌদি আরবের ক্লাব আল নাসরের কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সেই সময় রোনালদোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার সুযোগ হয় তার। হেসুসের অধীনেই আল নাসর সৌদি প্রো লিগের শিরোপা জেতে, যা রোনালদোর ক্লাব ক্যারিয়ারে সৌদি আরবে প্রথম লিগ ট্রফি। সেই অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে নতুন পর্তুগাল কোচ বলেন, রোনালদোর সঙ্গে কাজ করা সবসময়ই আনন্দের ছিল এবং তিনি কখনোই ড্রেসিংরুমে সমস্যা তৈরি করেননি।

হেসুস আরও জানান, জাতীয় দলের দায়িত্ব নেওয়ার পর এখনো রোনালদোর সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে কথা হয়নি। তবে তাদের পারস্পরিক বোঝাপড়া এতটাই ভালো যে, আলাদা করে কোনো জটিলতা হওয়ার সম্ভাবনা তিনি দেখছেন না। তার বিশ্বাস, রোনালদো সবসময় জাতীয় দলের স্বার্থকেই অগ্রাধিকার দেন এবং ভবিষ্যতেও সেটিই করবেন।

বিশ্বকাপে পর্তুগালের বিদায়ের পর দলটির সামনে এখন সবচেয়ে বড় লক্ষ্য ২০৩০ সালের বিশ্বকাপ। স্পেন ও মরক্কোর সঙ্গে যৌথভাবে সেই আসরের অন্যতম আয়োজক হবে পর্তুগাল। ফলে নিজেদের সমর্থকদের সামনে স্মরণীয় সাফল্য এনে দেওয়ার জন্য এখন থেকেই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করছে দেশটির ফুটবল কর্তৃপক্ষ। সেই পরিকল্পনার মূল দায়িত্বই দেওয়া হয়েছে অভিজ্ঞ এই কোচের কাঁধে।

রবার্তো মার্তিনেজের অধীনে পর্তুগাল বেশ কয়েকটি ভালো ম্যাচ খেললেও বড় টুর্নামেন্টে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য আসেনি। এবারের বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হেরে বিদায় নেয় দলটি। এরপরই দায়িত্ব ছাড়ার ঘোষণা দেন মার্তিনেজ। নতুন কোচ হিসেবে হেসুসের নিয়োগকে তাই পরিবর্তনের সূচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

দীর্ঘ কোচিং ক্যারিয়ারে হেসুসের অর্জনও কম নয়। পর্তুগালের ক্লাব ফুটবলে বেনফিকার দায়িত্বে থেকে একাধিক লিগ শিরোপা জিতেছেন তিনি। ২০১০, ২০১৪ এবং ২০১৫ সালে তার নেতৃত্বে বেনফিকা পর্তুগিজ লিগের শিরোপা জিতে। এরপর ব্রাজিলের ঐতিহ্যবাহী ক্লাব ফ্লামেঙ্গোতে দায়িত্ব নিয়ে ২০১৯ সালে মাত্র এক বছরেই পাঁচটি ট্রফি জয়ের কীর্তি গড়েন। সেই সাফল্যের মধ্যে ছিল দক্ষিণ আমেরিকার সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ক্লাব প্রতিযোগিতা কোপা লিবার্তাদোরেসের শিরোপাও। সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরবের আল নাসরেও সফল সময় কাটিয়েছেন তিনি।

ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, হেসুসের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো দলের কৌশলগত ভারসাম্য তৈরি করা এবং খেলোয়াড়দের সর্বোচ্চ সামর্থ্য বের করে আনা। তরুণ ও অভিজ্ঞ ফুটবলারদের সমন্বয়ে প্রতিযোগিতামূলক দল গঠনে তিনি দক্ষ। ফলে রোনালদোকে ঘিরেও তিনি আবেগ নয়, বাস্তবতা ও পারফরম্যান্সভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেবেন বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

এদিকে রোনালদোর ভবিষ্যৎ নিয়েও আগ্রহ কম নয়। বর্তমানে তার বয়স ৩৯ বছর হলেও শারীরিক সক্ষমতা ও পেশাদার মানসিকতার কারণে এখনো বিশ্বের অন্যতম ফিট ফুটবলার হিসেবে বিবেচিত হন তিনি। আল নাসরের সঙ্গে তার চুক্তি রয়েছে ২০২৭ সাল পর্যন্ত। ফলে ক্লাব ফুটবলে আরও কয়েক বছর খেলার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে জাতীয় দলে তিনি কতদিন খেলবেন, সেটি নির্ভর করবে তার শারীরিক অবস্থা, পারফরম্যান্স এবং নতুন কোচের পরিকল্পনার ওপর।

পর্তুগালের সামনে এখন অপেক্ষা করছে উয়েফা নেশনস লিগের নতুন মৌসুম। আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর গ্রুপ ‘ডি’-র উদ্বোধনী ম্যাচে ওয়েলসের বিপক্ষে মাঠে নামবে দলটি। সেই ম্যাচ দিয়েই আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে হোর্হে হেসুস যুগ। নতুন কোচের অধীনে পর্তুগাল কী ধরনের ফুটবল খেলবে, রোনালদোর ভূমিকা কী হবে এবং ভবিষ্যতের দল গঠনে কী ধরনের পরিবর্তন আসবে—সেদিকেই থাকবে সমর্থক ও বিশ্লেষকদের দৃষ্টি।

পর্তুগাল ফুটবল বর্তমানে এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে রোনালদোর মতো কিংবদন্তির অভিজ্ঞতা, অন্যদিকে নতুন প্রজন্মের প্রতিভাবান ফুটবলারদের সম্ভাবনা—এই দুইয়ের সমন্বয় ঘটিয়ে আগামী দিনের শক্তিশালী দল গড়ে তোলাই হেসুসের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সেই পথচলায় রোনালদোকে তিনি দলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবেই দেখছেন, তবে সেটি হবে জাতীয় দলের স্বার্থ ও পারফরম্যান্সকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েই। এখন দেখার বিষয়, অভিজ্ঞ এই কোচের পরিকল্পনা কতটা সফল হয় এবং ২০৩০ সালের ঘরের বিশ্বকাপের আগে পর্তুগালকে তিনি কতটা শক্তিশালী ও প্রতিযোগিতামূলক দলে পরিণত করতে পারেন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত