কোয়ার্টারের আগে সুইস শিবিরে ধাক্কা, স্বস্তিতে আর্জেন্টিনা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১১ জুলাই, ২০২৬
  • ৭ বার
কোয়ার্টারের আগে সুইস শিবিরে ধাক্কা, স্বস্তিতে আর্জেন্টিনা

প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার সামনে কঠিন পরীক্ষা অপেক্ষা করছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ এই লড়াইয়ের আগে সুইজারল্যান্ড শিবিরে বড় ধরনের দুঃসংবাদ এসেছে। হাঁটুর চোট কাটিয়ে উঠতে না পারায় দলের সর্বোচ্চ গোলদাতা জোহান ম্যানজাম্বি আর্জেন্টিনার বিপক্ষে মাঠে নামতে পারছেন না। সুইস কোচ মুরাত ইয়াকিন আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তার এই অনুপস্থিতি সুইজারল্যান্ডের আক্রমণভাগকে দুর্বল করে দিলেও দলটির অধিনায়ক গ্রানিত জাকা আত্মবিশ্বাস হারাচ্ছেন না। বরং তিনি জানিয়ে দিয়েছেন, তাদের লক্ষ্য লিওনেল মেসিকে ঘিরে নয়, বরং পুরো আর্জেন্টিনা দলকে হারিয়ে ইতিহাস গড়া।

বাংলাদেশ সময় রোববার সকাল ৭টায় কানসাস সিটি স্টেডিয়ামে মুখোমুখি হবে আর্জেন্টিনা ও সুইজারল্যান্ড। দুই দলের জন্যই ম্যাচটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। একদিকে বিশ্বকাপের শিরোপা ধরে রাখার মিশনে এগোতে চায় আর্জেন্টিনা, অন্যদিকে দীর্ঘ ৭২ বছর পর কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে নতুন ইতিহাস গড়ার স্বপ্ন দেখছে সুইজারল্যান্ড।

ম্যাচের আগে সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে জোহান ম্যানজাম্বির অনুপস্থিতি। চলতি বিশ্বকাপে দুর্দান্ত ফর্মে থাকা এই ফরোয়ার্ড ইতোমধ্যে তিনটি গোল করার পাশাপাশি দুটি অ্যাসিস্ট করেছেন। গ্রুপ পর্ব এবং নকআউটে তার পারফরম্যান্স সুইজারল্যান্ডকে আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছে। কিন্তু শেষ ষোলোতে কলম্বিয়ার বিপক্ষে টাইব্রেকারে জেতা ম্যাচে হাঁটুর চোটের কারণে তিনি খেলতে পারেননি। চিকিৎসক ও ফিটনেস স্টাফের সর্বোচ্চ চেষ্টা সত্ত্বেও তিনি পুরোপুরি সুস্থ না হওয়ায় কোয়ার্টার ফাইনাল থেকেও ছিটকে গেলেন।

সংবাদ সম্মেলনে কোচ মুরাত ইয়াকিন বলেন, ম্যানজাম্বিকে ফিরিয়ে আনার জন্য সম্ভাব্য সব ধরনের চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু খেলোয়াড়টির শারীরিক অবস্থার কথা বিবেচনা করে কোনো ঝুঁকি নেওয়া হচ্ছে না। তিনি জানান, এখনও হাঁটুতে ব্যথা অনুভব করছেন ম্যানজাম্বি। এমন একজন খেলোয়াড়কে না পাওয়া নিঃসন্দেহে দলের জন্য বড় ধাক্কা। কারণ মাঠে তার উপস্থিতি শুধু গোল করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং তার আত্মবিশ্বাস, গতি এবং লড়াকু মানসিকতা পুরো দলকে অনুপ্রাণিত করে।

তবে গুরুত্বপূর্ণ এই অনুপস্থিতির মধ্যেও সুইজারল্যান্ড আত্মবিশ্বাস হারাতে রাজি নয়। অধিনায়ক গ্রানিত জাকা মনে করেন, একটি দলের সাফল্য কখনো একজন খেলোয়াড়ের ওপর নির্ভর করে না। তার মতে, দলগত পারফরম্যান্সই ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করবে। তাই ম্যানজাম্বির অভাব থাকলেও বাকিরা সেই শূন্যতা পূরণের চেষ্টা করবেন।

ম্যাচের আগে আরেকটি বিষয় নিয়ে আলোচনার সৃষ্টি হয়। জার্মানির সাবেক গোলরক্ষক ইয়েন্স লেহমান মন্তব্য করেন, সুইস ফুটবলাররা নাকি লিওনেল মেসিকে অতিরিক্ত সম্মান দেখাচ্ছেন এবং ম্যাচ শেষে তার জার্সি পাওয়ার প্রতিই বেশি আগ্রহী। এমন মন্তব্য দ্রুতই আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে।

তবে এই মন্তব্যের জবাবে গ্রানিত জাকা স্পষ্ট ভাষায় জানান, বাইরের মানুষ কী বলছে, তা নিয়ে তারা মোটেও চিন্তিত নন। তাদের মনোযোগ শুধুই ম্যাচে। মাঠে নিজেদের সামর্থ্য প্রমাণ করাই তাদের একমাত্র লক্ষ্য। ব্যক্তিগত কোনো বিষয় বা আলোচনায় তারা বিভ্রান্ত হতে চান না।

মেসিকে থামানোর কৌশল নিয়েও কথা বলেন কোচ ইয়াকিন। তিনি জানান, বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলারকে পুরোপুরি থামানো সহজ নয়। তবে তার বিশ্বাস, বল নিজেদের দখলে রাখতে পারলে মেসির প্রভাব অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব। সুইজারল্যান্ড নিজেদের স্বাভাবিক আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে চায় এবং আর্জেন্টিনাকে সহজে বলের নিয়ন্ত্রণ নিতে দেবে না।

ইয়াকিন বলেন, তারা দল হিসেবে খেলবেন। উঁচুতে প্রেস করবেন, দ্রুত পাস আদান-প্রদান করবেন এবং প্রতিটি মুহূর্তে আর্জেন্টিনার ওপর চাপ সৃষ্টি করার চেষ্টা করবেন। তার মতে, মেসিকে একা আটকানোর কোনো পরিকল্পনা নেই। বরং পুরো দল মিলে এমন কৌশল প্রয়োগ করবে, যাতে আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগ কার্যকর হতে না পারে।

সুইজারল্যান্ডের জন্য এবারের বিশ্বকাপ ইতোমধ্যেই ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছে। ১৯৫৪ সালের পর এই প্রথম তারা বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে। ফলে পুরো দেশ এখন স্বপ্ন দেখছে আরও বড় সাফল্যের।

অধিনায়ক জাকা বলেন, এটি তার ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা মুহূর্ত। ৭২ বছর পর বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে দেশের প্রতিনিধিত্ব করা তার জন্য গর্বের বিষয়। তবে তিনি শুধু এখানেই থেমে থাকতে চান না। তার লক্ষ্য সেমিফাইনালে জায়গা নিশ্চিত করা।

জাকার ভাষায়, তারা শুধু কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে সন্তুষ্ট নন। দলটি আরও এক ধাপ এগোতে চায়। সেই লক্ষ্য পূরণের জন্য খেলোয়াড়দের ভেতরে প্রবল ক্ষুধা কাজ করছে। মাঠে নিজেদের সর্বোচ্চটা উজাড় করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি।

২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপের স্মৃতিও ফিরে এসেছে এই ম্যাচকে ঘিরে। সেবার শেষ ষোলোতে অতিরিক্ত সময়ে অ্যাঞ্জেল দি মারিয়ার গোলে ১-০ ব্যবধানে জয় পেয়েছিল আর্জেন্টিনা। সেই ম্যাচে সুইজারল্যান্ডের হয়ে খেলেছিলেন জাকাও। তবে তিনি এবার সেই ম্যাচকে প্রতিশোধ হিসেবে দেখছেন না।

তার মতে, প্রতিটি বিশ্বকাপ, প্রতিটি ম্যাচ এবং প্রতিটি দল আলাদা। অতীতের ফলাফল বর্তমানকে প্রভাবিত করে না। এবার তাদের একমাত্র লক্ষ্য বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের হারিয়ে সেমিফাইনালে জায়গা করে নেওয়া।

সমর্থকদের উদ্দেশেও বিশেষ বার্তা দিয়েছেন সুইস অধিনায়ক। তিনি বলেন, স্বপ্ন দেখা কখনো বন্ধ করা উচিত নয়। তবে স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য কঠোর পরিশ্রম, আত্মত্যাগ এবং নিজের সীমা অতিক্রম করার মানসিকতা থাকতে হবে। আর্জেন্টিনার মতো শক্তিশালী দলকে হারাতে হলে সেই মানসিকতা নিয়েই মাঠে নামতে হবে।

অন্যদিকে আর্জেন্টিনা শিবিরে ম্যানজাম্বির অনুপস্থিতিকে স্বস্তির খবর হিসেবে দেখা হলেও কোচিং স্টাফ কোনোভাবেই প্রতিপক্ষকে হালকাভাবে নিচ্ছে না। লিওনেল মেসির নেতৃত্বে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা জানে, নকআউট পর্বের প্রতিটি ম্যাচই নতুন চ্যালেঞ্জ। একটি ভুল পুরো টুর্নামেন্টের সমাপ্তি ঘটাতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই ম্যাচে বলের দখল, মাঝমাঠের লড়াই এবং দুই দলের রক্ষণভাগের দৃঢ়তা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। মেসির সৃজনশীলতা, আর্জেন্টিনার অভিজ্ঞতা এবং সুইজারল্যান্ডের শৃঙ্খলাবদ্ধ দলগত ফুটবল—সব মিলিয়ে কানসাস সিটিতে একটি রোমাঞ্চকর লড়াইয়ের অপেক্ষায় ফুটবলপ্রেমীরা।

বিশ্বকাপের শেষ আটের এই ম্যাচ তাই শুধু দুই দলের লড়াই নয়, বরং অভিজ্ঞতা, কৌশল, আত্মবিশ্বাস এবং স্বপ্নেরও এক বড় পরীক্ষা। আর্জেন্টিনা সেমিফাইনালের পথে আরেক ধাপ এগোতে চায়, আর সুইজারল্যান্ড চায় নতুন ইতিহাস লিখতে। সেই উত্তরের জন্য অপেক্ষা আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত