পুনর্ব্যবহারযোগ্য রকেট প্রযুক্তিতে নতুন মাইলফলক চীনের

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১১ জুলাই, ২০২৬
  • ৯ বার
পুনর্ব্যবহারযোগ্য রকেট প্রযুক্তিতে নতুন মাইলফলক চীনের

প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মহাকাশ প্রযুক্তিতে নিজেদের সক্ষমতা আরও এক ধাপ এগিয়ে নেওয়ার পথে গুরুত্বপূর্ণ সাফল্যের দাবি করেছে চীন। প্রথমবারের মতো পুনর্ব্যবহারযোগ্য রকেট উদ্ধার ও নিয়ন্ত্রিত অবতরণ প্রযুক্তির সফল পরীক্ষা চালিয়ে দেশটি ভবিষ্যতের মহাকাশ অভিযানের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে। এই পরীক্ষাকে চীনের মহাকাশ কর্মসূচির একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। কারণ পুনর্ব্যবহারযোগ্য রকেট প্রযুক্তি আয়ত্ত করতে পারলে উৎক্ষেপণ ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর পাশাপাশি মহাকাশ মিশনের গতি ও কার্যকারিতা বাড়ানো সম্ভব হবে।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে পরিচালিত পরীক্ষায় চীন ‘লং মার্চ ১০এ’ রকেট ব্যবহার করে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ সফলভাবে সম্পন্ন করে। পরীক্ষার সময় রকেটটিকে নিয়ন্ত্রিতভাবে নিচে নামানো হয় এবং পরে এটি নির্ধারিত একটি বিশেষ উদ্ধার প্ল্যাটফর্মের পাশে সমুদ্রে নিরাপদে অবতরণ করে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, এই পরীক্ষার মূল উদ্দেশ্য ছিল রকেট পুনরুদ্ধার এবং ভবিষ্যতে পুনরায় ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তির কার্যকারিতা যাচাই করা।

মহাকাশ গবেষণায় পুনর্ব্যবহারযোগ্য রকেট প্রযুক্তি বর্তমানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভাবনগুলোর একটি। দীর্ঘদিন ধরে একটি রকেট একবার উৎক্ষেপণের পর সেটি ব্যবহার অযোগ্য হয়ে যেত। ফলে প্রতিটি মহাকাশ মিশনের জন্য নতুন রকেট তৈরি করতে হতো, যা সময়সাপেক্ষ এবং অত্যন্ত ব্যয়বহুল। কিন্তু একই রকেট বারবার ব্যবহার করা গেলে উৎক্ষেপণ ব্যয় অনেক কমে আসে এবং মহাকাশ গবেষণা আরও অর্থনৈতিক ও টেকসই হয়ে ওঠে।

চীনের মহাকাশ কর্মসূচিতে ‘লং মার্চ’ সিরিজের রকেট দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। নতুন প্রজন্মের ‘লং মার্চ ১০বি’ রকেটকে দেশটির অন্যতম শক্তিশালী উৎক্ষেপণযান হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, এই রকেট পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথ বা লো আর্থ অরবিটে অন্তত ১৬ মেট্রিক টন পর্যন্ত পণ্য বহন করতে সক্ষম। ফলে ভবিষ্যতে বড় আকারের স্যাটেলাইট, মহাকাশ স্টেশনের সরঞ্জাম কিংবা চন্দ্র ও গভীর মহাকাশ অভিযানে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

এই সক্ষমতার কারণে অনেক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ইতোমধ্যেই ‘লং মার্চ ১০বি’-এর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বেসরকারি মহাকাশ প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্সের বহুল ব্যবহৃত ‘ফ্যালকন ৯’ রকেটের তুলনা শুরু করেছেন। যদিও দুটি প্রযুক্তির লক্ষ্য একই—রকেট পুনর্ব্যবহার নিশ্চিত করা—তবে বাস্তবায়নের পদ্ধতিতে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য।

স্পেসএক্সের ফ্যালকন ৯ উৎক্ষেপণের পর নিজস্ব ইঞ্জিন ব্যবহার করে নির্ধারিত অবতরণস্থল কিংবা সমুদ্রে অবস্থানরত ড্রোন জাহাজে উল্লম্বভাবে অবতরণ করে। এই প্রযুক্তি ইতোমধ্যে বহুবার সফলভাবে ব্যবহৃত হয়েছে এবং বিশ্বের মহাকাশ শিল্পে বিপ্লব ঘটিয়েছে। একই রকেট একাধিকবার ব্যবহার করে উৎক্ষেপণ ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

অন্যদিকে চীন ভিন্নধর্মী একটি প্রযুক্তিগত পদ্ধতি অনুসরণ করছে। ‘লং মার্চ ১০বি’ সরাসরি মাটিতে বা ড্রোন জাহাজে অবতরণ করবে না। পরিবর্তে রকেটে সংযুক্ত বিশেষ ‘অবতরণ হুক’ ব্যবহার করে সমুদ্রে ভাসমান একটি উদ্ধার প্ল্যাটফর্মে স্থাপিত বিশেষ জালের সঙ্গে সংযুক্ত হবে। এই পদ্ধতিতে রকেটকে নিরাপদভাবে থামিয়ে পরবর্তীতে পুনরুদ্ধার করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রযুক্তি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে এটি বিশ্ব মহাকাশ প্রযুক্তিতে একটি নতুন ধারা তৈরি করতে পারে।

চীনের বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই পরীক্ষা মূলত প্রযুক্তিগত সক্ষমতা যাচাইয়ের প্রথম ধাপ। ভবিষ্যতে আরও উন্নত পরীক্ষা পরিচালনা করা হবে এবং ধাপে ধাপে পূর্ণাঙ্গ পুনর্ব্যবহারযোগ্য উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। এর মাধ্যমে চীন শুধু নিজস্ব মহাকাশ কর্মসূচিকে শক্তিশালী করবে না, বরং আন্তর্জাতিক মহাকাশ প্রতিযোগিতায়ও আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারবে।

বিশ্লেষকদের মতে, পুনর্ব্যবহারযোগ্য রকেট প্রযুক্তি এখন বিশ্বের প্রধান মহাকাশ শক্তিগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতার অন্যতম ক্ষেত্র। যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি ইউরোপ, জাপান এবং অন্যান্য দেশও এই প্রযুক্তি উন্নয়নে কাজ করছে। চীনের সাম্প্রতিক অগ্রগতি সেই প্রতিযোগিতাকে আরও তীব্র করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

চীনের এই সফল পরীক্ষার প্রভাব শুধু প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। দেশটির মহাকাশ শিল্পসংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর শেয়ারবাজারেও এর ইতিবাচক প্রতিফলন দেখা গেছে। পরীক্ষার খবর প্রকাশের পর ‘চায়না স্পেসস্যাট’ এবং ‘চায়না স্যাটেলাইট কমিউনিকেশন্স’-এর শেয়ারের দাম একদিনেই ১০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। এটি চীনের শেয়ারবাজারে এক দিনে অনুমোদিত সর্বোচ্চ মূল্যবৃদ্ধির সীমা। বিনিয়োগকারীদের এই আগ্রহ থেকে বোঝা যায়, ভবিষ্যতে মহাকাশ প্রযুক্তি খাতে চীনের সম্ভাবনা নিয়ে বাজারে ইতিবাচক প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।

মহাকাশ গবেষণা বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তির সফল বাস্তবায়ন ভবিষ্যতে স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ, বৈজ্ঞানিক গবেষণা, মহাকাশ স্টেশন পরিচালনা এবং চন্দ্র ও মঙ্গল অভিযানের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনতে সহায়তা করবে। একই সঙ্গে বাণিজ্যিক মহাকাশ খাতের সম্প্রসারণেও এটি বড় ভূমিকা রাখবে।

বর্তমানে চীন নিজস্ব মহাকাশ স্টেশন পরিচালনা করছে এবং আগামী বছরগুলোতে চাঁদে মানব মিশন পাঠানোর উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনা নিয়েছে। এসব লক্ষ্য বাস্তবায়নে কম খরচে নির্ভরযোগ্য রকেট ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই পুনর্ব্যবহারযোগ্য রকেট প্রযুক্তির উন্নয়নকে দেশটির দীর্ঘমেয়াদি মহাকাশ কৌশলের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বের মহাকাশ শিল্প দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। একসময় যেখানে রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল, সেখানে এখন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সমানতালে প্রযুক্তি উন্নয়নে কাজ করছে। এই বাস্তবতায় চীনের নতুন সাফল্য শুধু একটি প্রযুক্তিগত অর্জন নয়, বরং বৈশ্বিক মহাকাশ প্রতিযোগিতায় নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করার কৌশলগত পদক্ষেপও বটে।

চীনের সাম্প্রতিক এই অগ্রগতি প্রমাণ করছে যে, পুনর্ব্যবহারযোগ্য মহাকাশ প্রযুক্তির দৌড়ে দেশটি এখন নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। ধারাবাহিক গবেষণা, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং সফল পরীক্ষার মাধ্যমে ভবিষ্যতে বিশ্ব মহাকাশ শিল্পে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার লক্ষ্য নিয়েই এগিয়ে যাচ্ছে বেইজিং।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত