প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
চট্টগ্রামে টানা ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যায় জেলার কৃষি ও মৎস্যখাত বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। কয়েক দিনের বৃষ্টিতে নদ-নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় হাজার হাজার কৃষক ও মৎস্যচাষির স্বপ্ন এক নিমেষেই ভেসে যেতে শুরু করেছে। জেলা প্রশাসন, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এবং মৎস্য অধিদপ্তরের প্রাথমিক তথ্য বলছে, চট্টগ্রামের ১৫টি উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা পানির নিচে চলে গেছে। এতে প্রায় ১০ হাজার পুকুর, দিঘি ও চিংড়ি ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ১৪ হাজার হেক্টরের বেশি কৃষিজমি তলিয়ে গেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ শতকোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের এই ধাক্কায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন কৃষক ও মাছচাষিরা। বছরের পর বছর শ্রম, বিনিয়োগ ও প্রত্যাশা নিয়ে গড়ে তোলা মাছের খামার, ধানের ক্ষেত এবং সবজির জমি এখন পানির নিচে। অনেক এলাকায় পুকুরের পাড় ভেঙে মাছ নদী ও খালে চলে গেছে। কোথাও আবার প্রবল স্রোতে চিংড়ি ঘের ভেসে গেছে। এতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে।
জেলা মৎস্য অধিদপ্তরের প্রাথমিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জেলার ১৫৩টি ইউনিয়নে ৯ হাজার ৯৩৩টি পুকুর ও দিঘি, ৩২০টি চিংড়ি ঘের এবং প্রায় ৪ হাজার ১১২ হেক্টর জলাশয়ের মাছচাষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হয়েছে বাঁশখালী উপজেলা। সেখানে প্রায় ২ হাজার ৫০০টি পুকুর, ৩১০টি চিংড়ি ঘের এবং প্রায় ১ হাজার ৯৭০ হেক্টর জলাশয়ের মাছ উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সাতকানিয়াতেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, যেখানে প্রায় ৪৬৬ হেক্টর জলাশয়ে মাছচাষের ওপর বন্যার প্রভাব পড়েছে।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সালমা বেগম জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য প্রাথমিক। পানি নেমে যাওয়ার পর প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও স্পষ্ট হবে। তবে বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় ক্ষতির পরিমাণ শতকোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি বলেন, মাছচাষিদের ক্ষতি কমিয়ে আনতে সরকারিভাবে সহায়তার বিষয়টি মূল্যায়ন করা হবে এবং ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে।
মৎস্যখাতের পাশাপাশি কৃষিখাতেও ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় ৮ হাজার ৭৬৮ হেক্টর আউশ ধান, ৬২১ দশমিক ৬৬ হেক্টর আমনের বীজতলা এবং ৪ হাজার ৯০৭ হেক্টর গ্রীষ্মকালীন সবজির আবাদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সব মিলিয়ে ১৪ হাজার ২৯৬ দশমিক ৬৬ হেক্টর কৃষিজমি পানির নিচে চলে গেছে। এতে কৃষকদের চলতি মৌসুমের উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলাগুলোর মধ্যে রয়েছে বাঁশখালী, চন্দনাইশ, সীতাকুণ্ড ও সন্দ্বীপ। বাঁশখালীতে প্রায় ২ হাজার ১৫০ হেক্টর, চন্দনাইশে ২ হাজার ১২০ হেক্টর, সীতাকুণ্ডে ১ হাজার ৫০০ হেক্টর এবং সন্দ্বীপে প্রায় ১ হাজার হেক্টর আউশ ধানের জমি পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এসব এলাকার অনেক কৃষক জানান, ধানের শীষ গজানোর আগেই জমি তলিয়ে যাওয়ায় তারা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
গ্রীষ্মকালীন সবজির ক্ষেতও বন্যার পানিতে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চন্দনাইশে প্রায় ৮৩০ হেক্টর, সীতাকুণ্ডে ৭০০ হেক্টর, সন্দ্বীপে ৬০০ হেক্টর, ফটিকছড়িতে ৪৭৫ হেক্টর, সাতকানিয়ায় ৪৬০ হেক্টর এবং বাঁশখালীতে প্রায় ৪০০ হেক্টর সবজির জমি নষ্ট হয়েছে। বাজারে এসব সবজির সরবরাহ কমে গেলে আগামী কয়েক সপ্তাহে দাম বাড়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না সংশ্লিষ্টরা।
জেলা কৃষি কর্মকর্তা আপ্রু মারমা বলেন, বর্তমানে মাঠপর্যায়ে ক্ষয়ক্ষতির তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। পানি নেমে গেলে প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করে বিস্তারিত প্রতিবেদন তৈরি করা হবে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসনে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণের বিষয়েও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কাজ করছে বলে তিনি জানান।
এদিকে বন্যার কারণে শুধু কৃষি ও মৎস্য নয়, গ্রামীণ অর্থনীতিতেও বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। অনেক কৃষক ঋণ নিয়ে আবাদ করেছিলেন। মাছচাষিরাও ব্যাংক ও বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিয়ে পুকুরে মাছের পোনা ছাড়েন। হঠাৎ বন্যায় সেই বিনিয়োগ পানিতে ভেসে যাওয়ায় তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য এই ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা অত্যন্ত কঠিন হবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
আবহাওয়া পরিস্থিতিও এখনো পুরোপুরি অনুকূলে আসেনি। আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী কয়েক দিন দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে চট্টগ্রামের নিম্নাঞ্চলে পানি আরও বাড়তে পারে এবং ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষি ও মৎস্যখাতে নতুন করে বিপর্যয় নেমে আসার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে আকস্মিক বন্যা ও অতিবৃষ্টির ঘটনা ক্রমেই বাড়ছে। তাই কৃষি ও মৎস্যখাতকে টেকসই রাখতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, আধুনিক পানি ব্যবস্থাপনা, আগাম সতর্কবার্তা এবং ক্ষতিগ্রস্তদের দ্রুত পুনর্বাসনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে দুর্যোগ-পরবর্তী পুনরুদ্ধার কার্যক্রম দ্রুত বাস্তবায়ন না হলে স্থানীয় অর্থনীতিতে এর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
চট্টগ্রামের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে এখনো পানি কমেনি। অনেক কৃষক ও মাছচাষি তাদের জমি ও জলাশয়ের দিকে অসহায়ের মতো তাকিয়ে আছেন। তাদের একটাই প্রত্যাশা—আবহাওয়া দ্রুত স্বাভাবিক হবে এবং সরকার ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়িয়ে পুনরায় ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ করে দেবে।