প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজধানীকেন্দ্রিক স্বাস্থ্যসেবার ওপর চাপ কমিয়ে দেশের প্রতিটি অঞ্চলের মানুষের দোরগোড়ায় উন্নত চিকিৎসা পৌঁছে দিতে উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম, দক্ষ জনবল, বিশেষায়িত সেবা এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের মাধ্যমে একটি বিকেন্দ্রীভূত স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
শনিবার (১১ জুলাই) রাজধানীর ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের ৮১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত ‘ডিএমসি ডে’ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে চিকিৎসক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, স্বাস্থ্য প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন পর্যায়ের অতিথিরা উপস্থিত ছিলেন। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যখাতের বর্তমান অবস্থা, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং চিকিৎসাসেবার মানোন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
অনুষ্ঠানের শুরুতে প্রশ্নোত্তর পর্বে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকরা স্বাস্থ্যখাতের বিভিন্ন বাস্তব সমস্যা, চিকিৎসক সংকট, আধুনিক যন্ত্রপাতির প্রয়োজন, রোগীর অতিরিক্ত চাপ, বিশেষায়িত সেবার সীমাবদ্ধতা এবং হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ প্রধানমন্ত্রীর সামনে তুলে ধরেন। তাদের বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শোনার পর প্রধানমন্ত্রী সরকারের চলমান স্বাস্থ্য উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের অধিকাংশ মানুষ এখনো জটিল কিংবা বিশেষায়িত চিকিৎসার জন্য রাজধানীমুখী হন। ফলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ রাজধানীর বড় হাসপাতালগুলোতে রোগীর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়। এই চাপ কমাতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সরকারি হাসপাতালগুলোকে আরও কার্যকর, আধুনিক এবং জনবান্ধব প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। স্থানীয় পর্যায়েই যদি অধিকাংশ রোগী প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পান, তাহলে রাজধানীর হাসপাতালগুলোতে অযথা ভিড়ও কমবে এবং রোগীরা দ্রুত ও মানসম্মত সেবা পাবেন।
তিনি আরও বলেন, স্বাস্থ্যসেবার বিকেন্দ্রীকরণ এখন সময়ের দাবি। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ যেন নিজ নিজ এলাকায় উন্নত চিকিৎসা গ্রহণ করতে পারেন, সে লক্ষ্যেই হাসপাতালের অবকাঠামো উন্নয়ন, নতুন ভবন নির্মাণ, আধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তি সংযোজন এবং প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের কাজ চলমান রয়েছে। একই সঙ্গে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংখ্যা বাড়ানো এবং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে চিকিৎসাসেবার মান উন্নয়নের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
চিকিৎসকদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে দেশের সার্বিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা উন্নত করা সম্ভব নয়। গ্রামাঞ্চলের মানুষের জন্যও সমান আন্তরিকতা ও দায়িত্ববোধ নিয়ে কাজ করতে হবে। চিকিৎসকদের পেশাগত দায়িত্বের পাশাপাশি মানবিক মূল্যবোধকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে রোগীদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান তিনি। তার মতে, একজন চিকিৎসকের সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো মানুষের জীবন রক্ষা করা এবং সেই দায়িত্ব পালনে শহর ও গ্রামের মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকা উচিত নয়।
তিনি বলেন, একটি শক্তিশালী স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করাও জরুরি। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে। তাই চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর স্বাস্থ্যসেবার বিস্তারে সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার এবং আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার ওপরও জোর দেওয়া হচ্ছে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দীর্ঘ ইতিহাসের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের চিকিৎসা শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় এই প্রতিষ্ঠান বহু দশক ধরে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে। এখান থেকে তৈরি হওয়া অসংখ্য চিকিৎসক দেশে ও বিদেশে সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। ভবিষ্যতেও এই প্রতিষ্ঠান চিকিৎসা শিক্ষা, গবেষণা এবং রোগীসেবায় আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
এর আগে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা অতিক্রম করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উদ্দেশে যাত্রা করে। শহীদ মিনার এলাকায় পৌঁছালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ, ইডেন কলেজ, সরকারি তিতুমীর কলেজ এবং ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা সড়কের দুই পাশে অবস্থান নিয়ে স্লোগান ও শুভেচ্ছা জানিয়ে তাকে স্বাগত জানান। পুরো এলাকায় উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
প্রধানমন্ত্রীর সফরকে কেন্দ্র করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল এলাকায় নেওয়া হয় ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা হাসপাতাল এবং আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন। একই সঙ্গে হাসপাতাল চত্বর ও সংলগ্ন সড়কে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে ফুটপাত দখল করে থাকা ভ্রাম্যমাণ হকার, অস্থায়ী দোকান এবং অবৈধ স্থাপনা সরিয়ে দেওয়ায় হাসপাতালসংলগ্ন এলাকায় চলাচল অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে আসে। রোগী, স্বজন এবং সাধারণ পথচারীরাও এতে স্বস্তি প্রকাশ করেন।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো রাজধানীকেন্দ্রিক চিকিৎসাসেবা। দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা হাসপাতালে চিকিৎসক সংকট, বিশেষজ্ঞ সেবার সীমাবদ্ধতা এবং আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাবের কারণে অনেক রোগীকেই ঢাকায় আসতে হয়। এতে রাজধানীর হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বাড়ে এবং অনেক সময় জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থাপনাও ব্যাহত হয়। তাই স্থানীয় পর্যায়ের হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো হলে একদিকে যেমন সাধারণ মানুষ দ্রুত চিকিৎসা পাবেন, অন্যদিকে রাজধানীর হাসপাতালগুলোর ওপর চাপও উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।
বিশ্লেষকদের মতে, স্বাস্থ্যসেবার টেকসই উন্নয়নের জন্য শুধু নতুন ভবন নির্মাণই যথেষ্ট নয়। দক্ষ চিকিৎসক, আধুনিক প্রযুক্তি, পর্যাপ্ত ওষুধ, কার্যকর ব্যবস্থাপনা এবং সবার জন্য সমান স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করাই হবে ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সরকারের চলমান উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের স্বাস্থ্যখাতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে এবং সাধারণ মানুষের চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ আরও সহজ হবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই আয়োজন শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস উদযাপন নয়, বরং দেশের স্বাস্থ্যখাতের বর্তমান বাস্তবতা, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং চিকিৎসাসেবাকে মানুষের আরও কাছাকাছি নিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকারও নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। সরকারের বিকেন্দ্রীভূত স্বাস্থ্যসেবা পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে রাজধানীর ওপর চাপ কমার পাশাপাশি দেশের প্রতিটি অঞ্চলের মানুষ মানসম্মত চিকিৎসাসেবার সুবিধা আরও সহজে উপভোগ করতে পারবেন।