প্রতিশ্রুতি ভাঙলে সমঝোতা মানবে না ইরান: তেহরানের হুঁশিয়ারি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৩ জুলাই, ২০২৬
  • ৭ বার
প্রতিশ্রুতি ভাঙলে সমঝোতা মানবে না ইরান: তেহরানের হুঁশিয়ারি

প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান উত্তেজনার মধ্যে নতুন করে কূটনৈতিক বার্তা দিয়েছে তেহরান। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্পষ্ট করে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি যুদ্ধ অবসান এবং পারস্পরিক সমঝোতা বাস্তবায়নের বিষয়ে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করে, তাহলে তেহরানও দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক আর মেনে চলবে না। ইরানের ভাষ্য অনুযায়ী, পারস্পরিক আস্থার ভিত্তিতেই যেকোনো আন্তর্জাতিক সমঝোতা কার্যকর হতে পারে এবং একতরফাভাবে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা হলে ইরানও নিজেদের দায়বদ্ধতা বহাল রাখবে না।

সোমবার (১৩ জুলাই) রাজধানী তেহরানে নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই। তিনি বলেন, ইরান সবসময় আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল আচরণ করেছে এবং যেকোনো আলোচনায় দেশের জনগণের স্বার্থ ও নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে অংশ নিয়েছে। তবে একই ধরনের দায়িত্বশীলতা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকেও প্রত্যাশা করে তেহরান।

ইসমাইল বাঘাই বলেন, সমঝোতায় পৌঁছানোর পর ইরান আন্তরিকতা ও সদিচ্ছার সঙ্গে নিজেদের অঙ্গীকার বাস্তবায়নে কাজ করেছে। তাঁর দাবি, তেহরান কখনোই কোনো চুক্তি বা সমঝোতা প্রথমে ভঙ্গ করেনি। বরং অতীতের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রতিপক্ষই আগে প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘন করেছে। তিনি বলেন, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান কখনোই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকারী প্রথম পক্ষ নয় এবং এই নীতি ভবিষ্যতেও বজায় থাকবে।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আরও বলেন, ওয়াশিংটন যদি যুদ্ধ বন্ধ এবং সমঝোতা বাস্তবায়নের বিষয়ে দেওয়া অঙ্গীকার পালন করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে ইরানও সমঝোতা স্মারকের শর্তাবলি অনুসরণ করবে না। তাঁর ভাষায়, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পারস্পরিক দায়বদ্ধতার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। যখন অন্য পক্ষ তাদের দায়িত্ব পালন করে না, তখন একতরফাভাবে দায়বদ্ধতা বহন করার কোনো যৌক্তিকতা থাকে না।

বাঘাই বলেন, অতীতেও এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে ইরান একই নীতি অনুসরণ করেছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য কোনো পক্ষ যদি নিজেদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না করে, তাহলে ইরানও তার অবস্থান পুনর্বিবেচনা করবে এবং প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেবে। তিনি বলেন, “যখনই অপর পক্ষ তার দায়বদ্ধতা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে, আমরাও আমাদের দায়বদ্ধতা রক্ষা করিনি। ভবিষ্যতেও একই নীতি অনুসরণ করা হবে।”

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি সামরিক অভিযান, ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং কূটনৈতিক উত্তেজনা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। যদিও বিভিন্ন পর্যায়ে যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তবুও উভয় পক্ষের বক্তব্যে এখনো অবিশ্বাসের ছাপ স্পষ্ট।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই বক্তব্য মূলত যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি একটি রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বার্তা। তেহরান বোঝাতে চাইছে যে, কোনো সমঝোতা তখনই কার্যকর থাকবে যখন উভয় পক্ষ সমানভাবে নিজেদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করবে। একতরফাভাবে শর্ত মানার নীতি থেকে ইরান সরে আসতে প্রস্তুত বলেও এই বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

পর্যবেক্ষকদের মতে, সাম্প্রতিক সংঘাতের পর দুই দেশের মধ্যে আস্থার সংকট আরও গভীর হয়েছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সামরিক কর্মকাণ্ড নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছে, অন্যদিকে ইরান অভিযোগ করছে যে ওয়াশিংটন বারবার চুক্তি ও প্রতিশ্রুতির বিষয়ে দ্বৈত নীতি অনুসরণ করছে। এই পারস্পরিক অবিশ্বাস ভবিষ্যতের যেকোনো আলোচনাকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

এদিকে ইরানের শীর্ষ সামরিক বাহিনী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) সম্প্রতি দাবি করেছে, সাম্প্রতিক সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সামরিক সক্ষমতা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা নিতে ব্যর্থ হয়েছে। আইআরজিসির কর্মকর্তারা বলেছেন, ইরান নিজের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত রয়েছে এবং যেকোনো ধরনের আগ্রাসনের জবাব দেওয়া হবে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক সংলাপ অব্যাহত রাখা উভয় পক্ষের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সামরিক উত্তেজনা দীর্ঘায়িত হলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তাও বড় ধরনের প্রভাবের মুখে পড়তে পারে। বিশেষ করে পারস্য উপসাগর অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা বৃদ্ধি পেলে বিশ্ব অর্থনীতিতেও এর প্রতিফলন দেখা দিতে পারে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র এখনো ইরানের সর্বশেষ মন্তব্যের আনুষ্ঠানিক জবাব দেয়নি। তবে অতীতের মতোই ওয়াশিংটন বরাবরই দাবি করে আসছে যে, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার লক্ষ্যেই তাদের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে ইরান বলছে, তাদের প্রতিটি সিদ্ধান্ত দেশের সার্বভৌমত্ব, জাতীয় নিরাপত্তা এবং জনগণের স্বার্থকে কেন্দ্র করেই নেওয়া হচ্ছে।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, দুই দেশের মধ্যে ভবিষ্যতে নতুন করে আলোচনা শুরু হলেও তা সহজ হবে না। কারণ সাম্প্রতিক সামরিক সংঘাত এবং পারস্পরিক কঠোর বক্তব্যের ফলে আস্থার যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে। একই সঙ্গে উভয় পক্ষের রাজনৈতিক অবস্থান এবং অভ্যন্তরীণ চাপও আলোচনার গতিপথকে প্রভাবিত করতে পারে।

বিশ্ব রাজনীতিতে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই অন্যতম স্পর্শকাতর ইস্যু। সাম্প্রতিক এই বক্তব্য সেই উত্তেজনাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে দিয়েছে। এখন আন্তর্জাতিক মহলের নজর থাকবে, ওয়াশিংটন এই বার্তার কী জবাব দেয় এবং ভবিষ্যতে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সংলাপ ও সমঝোতার পথ কতটা খোলা থাকে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত