কলকাতা বিমানবন্দরের পুরোনো মসজিদে নামাজ বন্ধ, বিতর্ক তুঙ্গে

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৩ জুলাই, ২০২৬
  • ৭ বার
কলকাতা বিমানবন্দরের পুরোনো মসজিদে নামাজ বন্ধ, বিতর্ক তুঙ্গে

প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

কলকাতার নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের অভ্যন্তরে অবস্থিত প্রায় ১৩৬ বছরের পুরোনো গৌরীপুর জামে মসজিদে সাময়িকভাবে জামাতে নামাজ আদায় বন্ধের সিদ্ধান্তকে ঘিরে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের দাবি, নিরাপত্তা জোরদার করা এবং দ্বিতীয় রানওয়ের সম্প্রসারণ প্রকল্প বাস্তবায়নের স্বার্থে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে মসজিদ পরিচালনা কমিটি বলছে, বিষয়টি নিয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনা চলমান থাকা অবস্থায় হঠাৎ করে মুসল্লিদের প্রবেশ বন্ধ করে দেওয়া অপ্রয়োজনীয় এবং দুঃখজনক।

ভারতের সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, বিমানবন্দরের ভেতরে অবস্থিত ঐতিহাসিক এই মসজিদটি স্থানীয়ভাবে ‘বাঁকড়া মসজিদ’ নামে পরিচিত। প্রায় দেড় শতাব্দীর পুরোনো এই উপাসনালয় দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় মুসল্লিদের ধর্মীয় কার্যক্রমের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। তবে বিমানবন্দরের সম্প্রসারণ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে কয়েক বছর ধরেই মসজিদটি অন্যত্র স্থানান্তরের বিষয়ে প্রশাসন ও মসজিদ কর্তৃপক্ষের মধ্যে আলোচনা চলছিল।

বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, কলকাতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বর্তমানে দুটি রানওয়ে রয়েছে। প্রধান রানওয়েটি নিয়মিত যাত্রীবাহী ও কার্গো উড়োজাহাজের উড্ডয়ন ও অবতরণের জন্য ব্যবহৃত হয়। দ্বিতীয় রানওয়েটি তুলনামূলক ছোট এবং এটি মূলত বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে ব্যবহারের উপযোগী। তবে ভবিষ্যতের বিমান চলাচলের চাপ মোকাবিলা করতে দ্বিতীয় রানওয়েটি সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। কর্তৃপক্ষের দাবি, মসজিদটির বর্তমান অবস্থান সেই সম্প্রসারণ প্রকল্পের অন্যতম বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ আরও জানিয়েছে, নিরাপত্তার বিষয়টিও সমান গুরুত্ব পাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সংবেদনশীল এলাকায় বহিরাগতদের নিয়মিত প্রবেশ নিরাপত্তা ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে বলে তাদের ধারণা। এই কারণেই গত শনিবার থেকে বিমানবন্দরের প্রবেশপথ দিয়ে মসজিদে যাওয়ার জন্য দেওয়া গেট পাস সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে বর্তমানে সেখানে জামাতে নামাজ আদায়ও স্থগিত রয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিমানবন্দর এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।

এই সিদ্ধান্তের পর বিষয়টি দ্রুত রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। পশ্চিমবঙ্গের বিরোধী দলীয় নেতা শুভেন্দু অধিকারী বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তকে সমর্থন জানিয়ে বলেন, জাতীয় নিরাপত্তা এবং বিমানবন্দরের নিরাপত্তা সবকিছুর ঊর্ধ্বে। তাঁর মতে, কলকাতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ভৌগোলিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থানে অবস্থিত। বাংলাদেশ ও চীনের নিকটবর্তী হওয়ায় এই বিমানবন্দরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

শুভেন্দু অধিকারী আরও বলেন, বিমানবন্দরের মতো উচ্চ নিরাপত্তা সম্পন্ন এলাকায় সাধারণ মানুষের অবাধ প্রবেশের সুযোগ রাখা যায় না। তবে তিনি একই সঙ্গে দাবি করেন, সরকার কারও ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করছে না। আইন ও নিরাপত্তা বিধি মেনে ব্যক্তিগতভাবে ধর্মীয় অনুশীলনে কোনো বাধা নেই বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদারও একই অবস্থান ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই দ্বিতীয় রানওয়ে সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও মসজিদটির অবস্থানের কারণে সেই কাজ এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি। তাঁর অভিযোগ, অতীতের সরকারগুলো রাজনৈতিক কারণে এই বিষয়ে কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। বর্তমান প্রশাসন অবকাঠামো উন্নয়ন ও নিরাপত্তার স্বার্থে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে এবং প্রয়োজনে মসজিদটি স্থানান্তরের উদ্যোগ বাস্তবায়ন করবে।

অন্যদিকে মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি এবং পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মন্ত্রী সিদ্দিকুল্লাহ চৌধুরী প্রশাসনের এই পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, মসজিদটি নিয়ে সরকার ও বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছিল এবং সেই আলোচনায় তারা ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছেন। শান্তিপূর্ণ ও আলোচনার মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছানোর আগ্রহও ছিল তাদের। কিন্তু আলোচনা চলাকালেই হঠাৎ করে মুসল্লিদের প্রবেশ বন্ধ করে জামাতে নামাজ স্থগিত করা পরিস্থিতিকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে জটিল করে তুলেছে বলে তিনি মনে করেন।

সিদ্দিকুল্লাহ চৌধুরীর মতে, ধর্মীয় অনুভূতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আরও বিস্তৃত আলোচনা হওয়া উচিত ছিল। তিনি আশা প্রকাশ করেন, প্রশাসন সংলাপের মাধ্যমে এমন একটি সমাধান বের করবে যাতে নিরাপত্তা ও উন্নয়ন নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি ধর্মীয় অধিকারও অক্ষুণ্ন থাকে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা পশ্চিমবঙ্গে অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং ধর্মীয় ঐতিহ্য সংরক্ষণের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার প্রশ্নকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। একদিকে দ্রুত বর্ধনশীল বিমান চলাচলের প্রয়োজন মেটাতে বিমানবন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি, অন্যদিকে দীর্ঘদিনের ধর্মীয় স্থাপনা ও স্থানীয় মানুষের আবেগকেও গুরুত্ব দিতে হবে। ফলে বিষয়টি কেবল প্রশাসনিক নয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক দিক থেকেও অত্যন্ত সংবেদনশীল।

নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ভেতরে অবস্থিত যেকোনো স্থাপনা নিরাপত্তা পরিকল্পনার আওতায় নিয়মিত মূল্যায়নের বিষয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও বিমানবন্দর সম্প্রসারণের সময় ধর্মীয়, ঐতিহাসিক কিংবা আবাসিক স্থাপনা স্থানান্তরের নজির রয়েছে। তবে এসব ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পক্ষের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান বের করাই আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি হিসেবে বিবেচিত হয়।

এদিকে স্থানীয় বাসিন্দা ও মুসল্লিদের একটি অংশ আশা করছেন, প্রশাসন ও মসজিদ কর্তৃপক্ষ আলোচনার মাধ্যমে এমন একটি সমাধানে পৌঁছাবে যাতে ধর্মীয় কার্যক্রম পুনরায় চালু করা সম্ভব হয় এবং একই সঙ্গে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ও উন্নয়ন প্রকল্পও বাধাগ্রস্ত না হয়।

বর্তমানে গৌরীপুর জামে মসজিদে জামাতে নামাজ বন্ধ থাকলেও মসজিদটির ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশাসনিক আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। মসজিদটি স্থানান্তর করা হবে নাকি বিকল্প কোনো সমাধান বের হবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গে নিরাপত্তা, উন্নয়ন এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার ভারসাম্য নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা আগামী দিনেও রাজনৈতিক ও সামাজিক আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে থাকবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত