রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতি, লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম ৯৩ হাজার কোটি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৩ জুলাই, ২০২৬
  • ৮ বার
রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতি, লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম ৯৩ হাজার কোটি

প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব আদায়ে সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। সরকারের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ৯৩ হাজার কোটি টাকা কম রাজস্ব সংগ্রহ করেছে সংস্থাটি। যদিও আগের অর্থবছরের তুলনায় রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি বজায় রয়েছে, তবুও লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এই বড় ব্যবধান দেশের সামগ্রিক রাজস্ব ব্যবস্থাপনা, বাজেট বাস্তবায়ন এবং উন্নয়ন ব্যয়ের অর্থায়ন নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

জাতীয় সংসদে সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আবদুল্লাহর এক প্রশ্নের লিখিত জবাবে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এই তথ্য তুলে ধরেন। অর্থমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা। তবে সাময়িক হিসাব অনুযায়ী সংস্থাটি আদায় করতে পেরেছে ৪ লাখ ১০ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৮১ দশমিক ৬ শতাংশ অর্জিত হয়েছে। ফলে লক্ষ্যমাত্রা থেকে পিছিয়ে রয়েছে ৯২ হাজার ৬১০ কোটি টাকা, যা প্রায় ৯৩ হাজার কোটি টাকার সমান।

যদিও লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা সম্ভব হয়নি, তবুও রাজস্ব আদায়ে ইতিবাচক একটি দিকও রয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এনবিআর মোট ৩ লাখ ৬৯ হাজার ৫২৮ কোটি টাকা রাজস্ব সংগ্রহ করেছিল। সেই তুলনায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আদায় বেড়েছে ৪০ হাজার ৮৬২ কোটি টাকা। শতাংশের হিসাবে এই প্রবৃদ্ধি প্রায় ১১ শতাংশ, যা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতা এবং কর সংগ্রহে কিছুটা উন্নতির ইঙ্গিত দেয়।

তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রবৃদ্ধি থাকলেও লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় এত বড় ঘাটতি সরকারের আর্থিক পরিকল্পনার ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। কারণ বাজেটে নির্ধারিত উন্নয়ন ব্যয়, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সরকারি পরিচালন ব্যয়ের বড় অংশই রাজস্ব আয়ের ওপর নির্ভরশীল। প্রত্যাশিত রাজস্ব না এলে সরকারকে ঋণনির্ভরতা বাড়ানো কিংবা ব্যয় সংকোচনের মতো বিকল্প পথ বিবেচনা করতে হতে পারে।

অর্থমন্ত্রীর দেওয়া খাতভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনটি প্রধান রাজস্ব খাতেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রয়েছে। আয়কর খাতে ১ লাখ ৮৬ হাজার ১১০ কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য থাকলেও আদায় হয়েছে ১ লাখ ৪২ হাজার ৮২৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৭৬ দশমিক ৭ শতাংশ অর্জিত হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আয়কর খাতে করজালের সীমাবদ্ধতা, কর ফাঁকি এবং অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির বিস্তার এই ঘাটতির অন্যতম কারণ হতে পারে।

মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট খাতেও প্রত্যাশিত সাফল্য আসেনি। একই পরিমাণ অর্থাৎ ১ লাখ ৮৬ হাজার ১১০ কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্য থাকলেও আদায় হয়েছে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৯৪০ কোটি টাকা। এটি লক্ষ্যমাত্রার ৮৩ দশমিক ৭ শতাংশ। ব্যবসা-বাণিজ্যে ধীরগতি, ভোক্তা ব্যয়ের পরিবর্তন এবং ভ্যাট ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন বাস্তব সমস্যার কারণে এই ঘাটতি তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা।

অন্যদিকে শুল্ক খাতে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৩০ হাজার ৭৮০ কোটি টাকা। এর বিপরীতে আদায় হয়েছে ১ লাখ ১১ হাজার ৬২৩ কোটি টাকা, যা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার ৮৫ দশমিক ৩ শতাংশ। আমদানি ব্যয়ের পরিবর্তন, বৈদেশিক বাণিজ্যের গতি এবং বিভিন্ন শুল্ক নীতির প্রভাব এই খাতের আদায়ে প্রতিফলিত হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মূল বাজেটে এনবিআরের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকা। পরে সংশোধিত বাজেটে তা বাড়িয়ে ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা করা হয়। অন্যদিকে এনবিআর-বহির্ভূত বিভিন্ন উৎস থেকে অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে প্রায় ৪৯ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে। সব মিলিয়ে সংশোধিত বাজেটে সরকারের মোট রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা।

রাজস্ব আদায়ে এই বড় ঘাটতির মধ্যেই চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য এনবিআরকে আরও উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য দেওয়া হয়েছে। নতুন অর্থবছরে সংস্থাটিকে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব সংগ্রহ করতে হবে। ফলে আগের অর্থবছরের বাস্তব অর্জন ও নতুন লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে ব্যবধান উল্লেখযোগ্য হওয়ায় এই লক্ষ্য অর্জন কতটা বাস্তবসম্মত হবে, তা নিয়ে ইতোমধ্যেই আলোচনা শুরু হয়েছে।

সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে রাজস্ব আদায়ের পাশাপাশি ভ্যাট ব্যবস্থাপনা আধুনিকীকরণ এবং ব্যবসায়ীদের হয়রানি কমাতে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী। তিনি জানান, বিশেষ করে প্রান্তিক ও মধ্যবিত্ত ব্যবসায়ীদের জন্য ভ্যাট নিবন্ধন ও কর পরিশোধ প্রক্রিয়া সহজ করতে আইনগত ও প্রযুক্তিগত বিভিন্ন সংস্কার বাস্তবায়ন করা হয়েছে।

অর্থমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, ‘ইনস্ট্যান্ট ভ্যাট রেজিস্ট্রেশন’ চালুর জন্য প্রয়োজনীয় আইন সংশোধন করা হয়েছে, যাতে ব্যবসায়ীরা দ্রুত নিবন্ধন নিতে পারেন। একই সঙ্গে শতভাগ অনলাইন রিটার্ন দাখিল নিশ্চিত করতে আইনি কাঠামো শক্তিশালী করা হয়েছে। ব্যবসায়ীরা ঘরে বসেই ই-চালান ও এ-চালানের মাধ্যমে ভ্যাট পরিশোধ করতে পারেন—এমন ব্যবস্থা ইতোমধ্যে কার্যকর হয়েছে।

ডিজিটাল রূপান্তরের অংশ হিসেবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড নির্ধারিত ইআরপি (এন্টারপ্রাইজ রিসোর্স প্ল্যানিং) সফটওয়্যারের মাধ্যমে ব্যবসায়িক নথি ইলেকট্রনিকভাবে সংরক্ষণের বিধান চালু করা হয়েছে। ভবিষ্যতে স্বয়ংক্রিয় ই-ইনভয়েসিং ব্যবস্থা, এপিআইভিত্তিক ডেটা সংগ্রহ এবং কাস্টমস, ভ্যাট ও আয়কর বিভাগের মধ্যে সমন্বিত ইলেকট্রনিক ডেটা এক্সচেঞ্জ চালুর পরিকল্পনাও সরকারের রয়েছে। পাশাপাশি অন্যান্য সরকারি সংস্থার সঙ্গে আন্তঃসংযোগ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সহজ করতে ইলেকট্রনিক ইন্টারন্যাশনাল ডেটা এক্সচেঞ্জ ব্যবস্থা গড়ে তোলার কাজও এগিয়ে চলছে।

স্থানীয় তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পের বিকাশে সরকারের কর অব্যাহতি নীতির কথাও সংসদে উল্লেখ করেন অর্থমন্ত্রী। তিনি জানান, কম্পিউটার, ল্যাপটপ, প্রিন্টার, মাউস, র‍্যাম, মাদারবোর্ডসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিপণ্যের স্থানীয় উৎপাদনে মূল্য সংযোজন কর অব্যাহতি বহাল রাখা হয়েছে, যাতে দেশীয় শিল্প আরও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠতে পারে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, রাজস্ব আদায়ে টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে শুধু করের হার বাড়ানো নয়, বরং করজাল সম্প্রসারণ, কর প্রশাসনের স্বচ্ছতা বৃদ্ধি, ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ এবং করদাতাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলাই হবে সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ। একই সঙ্গে কর ফাঁকি রোধ এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো গেলে আগামী বছরগুলোর উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের সম্ভাবনাও বাড়বে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত