প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশীয় বস্ত্র ও তৈরি পোশাক শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানো, স্থানীয় কাঁচামালের ব্যবহার উৎসাহিত করা এবং রপ্তানি আয় আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন অর্থবছরের শুরুতেই রপ্তানিমুখী বস্ত্র খাতের জন্য নগদ সহায়তার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে ৫ শতাংশ নির্ধারণ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর ফলে এতদিন যে খাতে ১ দশমিক ৫০ শতাংশ হারে নগদ সহায়তা দেওয়া হতো, এখন সেই সুবিধা তিন গুণেরও বেশি বৃদ্ধি পাবে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই সিদ্ধান্ত দেশের টেক্সটাইল ও তৈরি পোশাক শিল্পে নতুন গতি সঞ্চার করবে এবং স্থানীয় সুতা ও কাপড় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও এর সুফল পাবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রানীতি বিভাগ (এফইপিডি) এ বিষয়ে একটি সংশোধিত প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। রবিবার জারি করা এই নির্দেশনার মাধ্যমে গত ৫ জুলাই প্রকাশিত সার্কুলারের সংশোধন আনা হয়েছে। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে রপ্তানিমুখী দেশীয় বস্ত্র খাতের জন্য নগদ সহায়তার হার ১ দশমিক ৫০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, এই সিদ্ধান্ত অবিলম্বে কার্যকর হবে এবং সংশ্লিষ্ট রপ্তানিকারকেরা নির্ধারিত শর্ত পূরণ সাপেক্ষে এই সুবিধা পাবেন।
বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তিগুলোর অন্যতম হলো তৈরি পোশাক খাত। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের বড় অংশই আসে এই শিল্প থেকে। বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা দিন দিন কঠিন হয়ে ওঠার পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয়, কাঁচামালের মূল্য এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে রপ্তানিকারকদের ওপর চাপও বেড়েছে। এমন বাস্তবতায় সরকারের এই নীতিগত সহায়তা শিল্প উদ্যোক্তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ স্বস্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, রপ্তানিমুখী দেশীয় বস্ত্র খাতে শুল্ক বন্ড এবং ডিউটি ড্র-ব্যাক সুবিধার বিকল্প হিসেবে যে নগদ সহায়তা দেওয়া হয়, সেটির হার বাড়ানো হয়েছে। এর ফলে বিশেষ করে তৈরি পোশাক (আরএমজি) শিল্পে দেশীয় কাঁচামালের ব্যবহার আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে স্থানীয় টেক্সটাইল শিল্পও নতুন বিনিয়োগ এবং উৎপাদন সম্প্রসারণে উৎসাহিত হবে।
নগদ সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে অবশ্য কিছু শর্তও নির্ধারণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ), বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ) অথবা সংশ্লিষ্ট অন্য কোনো স্বীকৃত রপ্তানিকারক সংগঠনের সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলো এই সুবিধার জন্য আবেদন করতে পারবে। তবে তাদের অবশ্যই প্রমাণ করতে হবে যে রপ্তানিকৃত পণ্য উৎপাদনে দেশীয় উৎস থেকে সুতা, কাপড় বা অন্যান্য কাঁচামাল সংগ্রহ করা হয়েছে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় সনদ ও কাগজপত্র সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক আরও জানিয়েছে, ২০০১ এবং ২০০৩ সালে জারি করা বৈদেশিক মুদ্রা সংক্রান্ত সার্কুলারের যেসব নির্দেশনা বর্তমানে কার্যকর রয়েছে, সেগুলোও আগের মতো বহাল থাকবে। অর্থাৎ নতুন নগদ সহায়তার হার কার্যকর হলেও পূর্বের যাচাই-বাছাই, নথিপত্র এবং আবেদন প্রক্রিয়ার মৌলিক কাঠামো অপরিবর্তিত থাকবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সরকার মূলত স্থানীয় মূল্য সংযোজন বাড়ানোর কৌশল নিয়েছে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পে দেশীয় সুতা ও কাপড়ের ব্যবহার যত বাড়বে, ততই বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে এবং দেশের টেক্সটাইল খাত আরও শক্তিশালী হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় শিল্পে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং নতুন বিনিয়োগের সুযোগও তৈরি হতে পারে।
রপ্তানিকারকদের একটি অংশ মনে করছেন, নগদ সহায়তা বাড়ানোর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক মূল্য ধরে রাখা সহজ হবে। বর্তমানে বিভিন্ন প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ তাদের রপ্তানিকারকদের নানাভাবে আর্থিক সহায়তা দিয়ে থাকে। ফলে বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা দীর্ঘদিন ধরেই প্রণোদনা বৃদ্ধির দাবি জানিয়ে আসছিলেন। নতুন এই সিদ্ধান্ত সেই দাবির আংশিক প্রতিফলন বলেই মনে করছেন তারা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু নগদ সহায়তা বৃদ্ধি করলেই হবে না; এর সঙ্গে দ্রুত রপ্তানি প্রণোদনা বিতরণ, ব্যাংকিং কার্যক্রম সহজ করা এবং কাঁচামাল সরবরাহ ব্যবস্থাও আরও কার্যকর করতে হবে। অন্যথায় শিল্প উদ্যোক্তারা কাঙ্ক্ষিত সুবিধা পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারবেন না।
বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বাজারে পোশাকের চাহিদায় ওঠানামা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যেও বাংলাদেশ তার রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার চেষ্টা করছে। এই প্রেক্ষাপটে নগদ সহায়তা বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে অনেকেই কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। এতে স্থানীয় শিল্পের ওপর নির্ভরতা বাড়বে এবং বিদেশি কাঁচামালের ওপর নির্ভরশীলতা কিছুটা হলেও কমবে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে এই নীতির সফলতা নির্ভর করবে স্থানীয় টেক্সটাইল শিল্পের উৎপাদন সক্ষমতা, মান নিয়ন্ত্রণ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখার ওপর। যদি দেশীয় উৎপাদকরা পর্যাপ্ত মানসম্পন্ন সুতা ও কাপড় সরবরাহ করতে পারেন, তাহলে তৈরি পোশাক শিল্পের পুরো সরবরাহ শৃঙ্খল আরও শক্তিশালী হবে এবং দেশের রপ্তানি আয়ও বাড়বে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ এই সিদ্ধান্ত দেশের বস্ত্র ও পোশাক শিল্পের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত বার্তা বহন করছে। সরকারের লক্ষ্য, স্থানীয় শিল্পকে আরও শক্তিশালী করে বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান সুদৃঢ় করা এবং একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান খাতকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তোলা। সংশ্লিষ্টদের আশা, নগদ সহায়তা বৃদ্ধির এই উদ্যোগ রপ্তানিকারকদের নতুন উদ্যমে উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রম সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।