দুর্নীতি মামলায় দক্ষিণ কোরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্টের কারাদণ্ড

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৩ জুলাই, ২০২৬
  • ৪৮ বার
দুর্নীতি মামলায় দক্ষিণ কোরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্টের কারাদণ্ড

প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দক্ষিণ কোরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট ইউন সুক ইয়োলকে দুর্নীতির একটি মামলায় দুই বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন দেশটির একটি আদালত। প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে নিজের জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের উদ্দেশ্যে একটি বেসরকারি জনমত জরিপ সংস্থাকে দিয়ে একাধিক জরিপ পরিচালনা করিয়ে পারিশ্রমিক পরিশোধ না করা এবং পরে আইনজীবীর মাধ্যমে সংস্থাটিকে ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগে তাকে এই সাজা দেওয়া হয়েছে। সোমবার রাজধানী সিউলের কেন্দ্রীয় জেলা আদালত এ রায় ঘোষণা করেন। তবে আদালতের এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করার সুযোগ রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা।

আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মামলার অভিযোগপত্র অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট থাকাকালে ইউন সুক ইয়োল নিজের জনপ্রিয়তা ও রাজনৈতিক অবস্থান মূল্যায়নের জন্য একটি জনমত জরিপ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে দেশব্যাপী মোট ১৪টি জরিপ করান। এসব জরিপের জন্য প্রতিষ্ঠানটির পাওনা ছিল প্রায় ২৭ কোটি দক্ষিণ কোরীয় ওন, যা মার্কিন মুদ্রায় প্রায় ১ লাখ ৭৯ হাজার ৮০০ ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় দুই কোটি ২২ লাখ টাকার বেশি।

মামলার তদন্তে উঠে আসে, জরিপগুলো সম্পন্ন হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান একাধিকবার তাদের প্রাপ্য অর্থ দাবি করলেও তা পরিশোধ করা হয়নি। বরং অভিযোগ রয়েছে, সাবেক প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে আইনজীবীর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটিকে মামলা করার হুমকি দেওয়া হয় এবং পাওনা আদায়ের বিষয়ে চাপ প্রয়োগ না করতে সতর্ক করা হয়। আদালত এসব অভিযোগের বিভিন্ন সাক্ষ্য-প্রমাণ ও নথিপত্র পর্যালোচনা করে ইউন সুক ইয়োলকে দোষী সাব্যস্ত করেন এবং দুই বছরের কারাদণ্ড প্রদান করেন।

তবে ইউন সুক ইয়োল শুরু থেকেই নিজের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন। আদালতে দেওয়া বক্তব্যে তিনি দাবি করেন, রাষ্ট্রপতি থাকাকালে কিংবা দায়িত্ব ছাড়ার পর কোনো সময়ই তিনি ব্যক্তিগতভাবে কোনো প্রতিষ্ঠানকে জরিপ পরিচালনার নির্দেশ দেননি। অভিযোগে উল্লিখিত কর্মকাণ্ডের সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততার বিষয়টিও তিনি সম্পূর্ণভাবে নাকচ করেন। তার আইনজীবী জানিয়েছেন, আদালতের রায়ে তারা সন্তুষ্ট নন এবং উচ্চ আদালতে আপিল করবেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই রায় দক্ষিণ কোরিয়ার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হবে। কারণ ইউন সুক ইয়োল বর্তমানে দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে বিতর্কিত সাবেক প্রেসিডেন্টদের একজন। প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে নেওয়া একাধিক সিদ্ধান্ত তাকে ব্যাপক সমালোচনার মুখে ফেলে এবং শেষ পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দায়ের হয়।

বিশেষ করে ২০২৫ সালের ৩ ডিসেম্বর গভীর রাতে জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে ইউন সুক ইয়োল আকস্মিকভাবে দেশে সামরিক আইন জারির ঘোষণা দেন। ভাষণে তিনি দাবি করেছিলেন, রাষ্ট্রবিরোধী শক্তিকে দমন এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য এই পদক্ষেপ প্রয়োজন। কিন্তু তার এই ঘোষণার পরপরই দেশজুড়ে ব্যাপক রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। বিরোধী দল, নাগরিক সমাজ এবং আন্তর্জাতিক মহলের কঠোর সমালোচনার মুখে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সামরিক আইন প্রত্যাহার করতে বাধ্য হন তিনি।

সামরিক আইন জারির সেই সিদ্ধান্তকে দক্ষিণ কোরিয়ার গণতান্ত্রিক ইতিহাসের অন্যতম বড় রাজনৈতিক সংকট হিসেবে বিবেচনা করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে গণতন্ত্র ও সাংবিধানিক শাসনব্যবস্থার জন্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যে সুনাম দক্ষিণ কোরিয়া অর্জন করেছিল, সেই ভাবমূর্তি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। এরপর বিরোধী দল তার বিরুদ্ধে অভিশংসনের প্রস্তাব উত্থাপন করে। প্রথম দফার রাজনৈতিক প্রক্রিয়া শেষে গত ১৪ ডিসেম্বর দেশটির সাংবিধানিক আদালত তাকে প্রেসিডেন্টের পদ থেকে অপসারণের সিদ্ধান্ত বহাল রাখে।

ইউন সুক ইয়োলের বিরুদ্ধে বর্তমানে বিভিন্ন আদালতে মোট আটটি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত মামলাটি সামরিক আইন জারি সংক্রান্ত। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ওই মামলায় সিউল কেন্দ্রীয় জেলা আদালত তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। সেই রায়ের বিরুদ্ধেও তিনি ইতোমধ্যে উচ্চ আদালতে আপিল করেছেন। ফলে সাবেক এই প্রেসিডেন্টকে ঘিরে বিচারিক প্রক্রিয়া এখনো অব্যাহত রয়েছে।

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দক্ষিণ কোরিয়ার বিচারব্যবস্থা রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে সাবেক রাষ্ট্রপ্রধানদের বিরুদ্ধেও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে অতীতেও কঠোর অবস্থান দেখিয়েছে। দেশটির ইতিহাসে একাধিক সাবেক প্রেসিডেন্ট দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অন্যান্য অপরাধের অভিযোগে বিচার ও কারাদণ্ডের মুখোমুখি হয়েছেন। ইউন সুক ইয়োলের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক এই রায় সেই ধারাবাহিকতারই অংশ বলে মনে করা হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই রায় দক্ষিণ কোরিয়ার রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে জবাবদিহিতা ও আইনের শাসনের গুরুত্ব আরও একবার সামনে নিয়ে এসেছে। একই সঙ্গে এটি ভবিষ্যতে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক নেতৃত্বের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে যে, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা অনিয়মের অভিযোগে সাবেক বা বর্তমান—কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নন।

এদিকে আদালতের সর্বশেষ রায়ের পর দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। একদিকে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে এই রায়কে কেন্দ্র করে তর্ক-বিতর্ক চলছে, অন্যদিকে সাধারণ জনগণের মধ্যেও বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ দেখা গেছে। তবে মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি এখন নির্ভর করবে উচ্চ আদালতের আপিল শুনানি এবং পরবর্তী বিচারিক সিদ্ধান্তের ওপর।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com