বজ্রপাতের আতঙ্কে নেত্রকোনা, ৭ মাসে প্রাণ গেল ১৩ জন

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ২০২৬
  • ৪ বার
বজ্রপাতের আতঙ্কে নেত্রকোনা, ৭ মাসে প্রাণ গেল ১৩ জন

প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বর্ষা মৌসুম শুরু হলেই নেত্রকোনার বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলে নেমে আসে বজ্রপাতের স্থায়ী আতঙ্ক। কালো মেঘ জমলেই কৃষক, জেলে এবং দিনমজুরদের মনে ভর করে অজানা শঙ্কা। জীবিকার তাগিদে প্রতিদিনই খোলা মাঠ, বিল ও হাওরে কাজ করতে হলেও প্রকৃতির এই ভয়াল রূপ থেকে নিজেদের রক্ষা করার মতো পর্যাপ্ত নিরাপদ আশ্রয় কিংবা অবকাঠামো এখনো গড়ে ওঠেনি। ফলে প্রায় প্রতি বছরই বজ্রপাত কেড়ে নিচ্ছে মূল্যবান প্রাণ। চলতি বছরের প্রথম সাত মাসেই নেত্রকোনায় বজ্রাঘাতে অন্তত ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে, যা স্থানীয়দের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে তুলেছে।

জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত সাড়ে পাঁচ বছরে জেলায় বজ্রপাতে অন্তত ৬০ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২১ সালে বজ্রাঘাতে মারা যান ১৫ জন, ২০২২ সালে ৩ জন, ২০২৩ সালে ১২ জন, ২০২৪ সালে ৫ জন, ২০২৫ সালে ১২ জন এবং ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১৩ জন। এই ধারাবাহিকতা স্পষ্ট করে যে, নেত্রকোনার হাওরাঞ্চলে বজ্রপাত একটি মৌসুমি দুর্যোগের চেয়েও বড় জননিরাপত্তার সংকটে পরিণত হয়েছে।

বজ্রাঘাতে নিহতদের অধিকাংশই কৃষক, জেলে এবং নিম্নআয়ের শ্রমজীবী মানুষ। জীবিকার প্রয়োজনে তাদের প্রতিদিনই খোলা আকাশের নিচে কাজ করতে হয়। হাওরের বিশাল জলরাশি, উন্মুক্ত মাঠ এবং নিরাপদ আশ্রয়ের অভাব তাদের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। আবহাওয়া খারাপ হওয়ার আগাম লক্ষণ অনেক সময় বুঝে ওঠার আগেই বজ্রপাত শুরু হয়। ফলে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার সুযোগও থাকে না।

সম্প্রতি মদন উপজেলার জয়পাশা গ্রামের ইটভাটা শ্রমিক রাজিব মিয়ার মৃত্যুর ঘটনা এই বাস্তবতার নির্মম উদাহরণ হয়ে উঠেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ভোরের বৃষ্টির পর তিনি বাড়ির পাশের জমিতে মাছ ধরতে গিয়েছিলেন। পরিবারের জন্য কিছু মাছ নিয়ে বাড়ি ফেরার আশা ছিল তার। কিন্তু হঠাৎ বজ্রপাতের আঘাতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারিয়ে অসহায় হয়ে পড়েছেন তার স্বজনরা।

একইভাবে গত ১৮ জুন একদিনেই জেলার বিভিন্ন স্থানে বজ্রপাতে তিনজনের মৃত্যু হয়। কেন্দুয়া উপজেলার মোড়াইল বিলে মাছ ধরতে গিয়ে প্রাণ হারান শামসুল হুদা (৫৫)। একই দিনে সান্দিকোনা এলাকায় বজ্রাঘাতে মারা যান আশরাফুল ইসলাম (২৫)। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে একাধিক মৃত্যুর ঘটনায় পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। স্থানীয়রা জানান, বর্ষাকালে এমন ঘটনা প্রায়ই ঘটলেও স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ এখনো দৃশ্যমান নয়।

হাওর এলাকার কৃষকদের জীবনযাত্রা প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল। খালিয়াজুরীর মেন্দিপুর গ্রামের কৃষক সামছুল হক বলেন, হাওরে কাজ করার সময় অনেক ক্ষেত্রেই আকাশের পরিবর্তন দ্রুত বোঝা যায় না। কিছুক্ষণের মধ্যেই কালো মেঘ জমে বজ্রপাত শুরু হয়। আশপাশে কোনো নিরাপদ ঘর বা আশ্রয়কেন্দ্র না থাকায় তখন জীবন হাতে নিয়েই কাজ চালিয়ে যেতে হয় অথবা খোলা জায়গায় আটকা পড়ে থাকতে হয়।

একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন স্থানীয় জেলেরাও। তাদের ভাষ্য, নদী কিংবা হাওরে মাছ ধরার সময় বজ্রপাত শুরু হলে নৌকাই হয়ে ওঠে একমাত্র আশ্রয়, যা নিরাপত্তার জন্য মোটেও যথেষ্ট নয়। অনেক সময় তীরে ফিরতে ফিরতেই বড় দুর্ঘটনা ঘটে যায়।

আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের কারণে বজ্রপাতের প্রকৃতি এবং তীব্রতা আগের তুলনায় বেড়েছে। নেত্রকোনা কৃষি আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের ইনচার্জ মো. মামুন জানান, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে বায়ুমণ্ডলে অস্থিতিশীলতা তৈরি হচ্ছে এবং কিউমুলোনিম্বাস বা সিবি মেঘের সৃষ্টি বাড়ছে। এসব মেঘ থেকেই অধিকাংশ বজ্রপাতের উৎপত্তি হয়। তিনি বলেন, নির্বিচারে গাছ কাটার কারণে প্রাকৃতিক সুরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে হাওরাঞ্চলে তালগাছসহ দেশীয় উঁচু গাছ রোপণের উদ্যোগ বাড়ানো গেলে বজ্রপাতের ঝুঁকি কিছুটা কমানো সম্ভব হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সচেতনতা বৃদ্ধি করলেই এই সমস্যা পুরোপুরি সমাধান হবে না। প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক অবকাঠামোগত উদ্যোগ। বজ্রপাতের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় আগাম সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়া, নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ, বজ্রনিরোধক ব্যবস্থা সম্প্রসারণ এবং কৃষক-জেলেদের জন্য প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করা জরুরি। পাশাপাশি স্কুল, কলেজ এবং স্থানীয় কমিউনিটি পর্যায়ে বজ্রপাতের সময় করণীয় সম্পর্কে নিয়মিত প্রচার-প্রচারণা চালানোর পরামর্শও দিচ্ছেন তারা।

জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান জানিয়েছেন, নেত্রকোনার বিশাল হাওর এলাকায় শুধু বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপন করে মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তাই খোলা মাঠে কর্মরত কৃষক ও জেলেদের জন্য বিশেষ শেল্টার জোন বা নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, আকস্মিক দুর্যোগের সময় যাতে মানুষ দ্রুত আশ্রয় নিতে পারে, সে লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে ইতোমধ্যে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।

জেলা প্রশাসকের ভাষ্য অনুযায়ী, পরিকল্পিত আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে বজ্রনিরোধক ব্যবস্থা ছাড়াও প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সরঞ্জাম এবং জরুরি সুবিধা রাখার চিন্তা করা হচ্ছে। তবে এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে স্থান নির্বাচন, কারিগরি সম্ভাব্যতা এবং অবকাঠামোগত বিষয়গুলো পর্যালোচনা করতে মন্ত্রণালয়ের বিশেষজ্ঞ দল সরেজমিন পরিদর্শন করবে।

নেত্রকোনার হাওরাঞ্চলে বজ্রপাত এখন শুধু একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং হাজারো মানুষের জীবিকা ও নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি বড় মানবিক সংকট। প্রতি বছর প্রাণহানির পুনরাবৃত্তি ইঙ্গিত দিচ্ছে, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, আধুনিক সতর্কীকরণ ব্যবস্থা এবং নিরাপদ অবকাঠামো নির্মাণ ছাড়া এই সংকট থেকে স্থায়ীভাবে উত্তরণ সম্ভব নয়। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, বর্ষা মৌসুম এলেই যেন আতঙ্ক নয়, নিরাপদ পরিবেশে জীবিকা নির্বাহের নিশ্চয়তা পান তারা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত