হরমুজের নিয়ন্ত্রণ ও সাম্রাজ্যবাদের দ্বন্দ্ব: একটি অনিবার্য সংঘর্ষের বিশ্লেষণ

মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ২০২৬
  • ৭ বার
প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
২০২৬ সালের গ্রীষ্মকাল। একটি অস্থির যুদ্ধবিরতির মধ্যেই আবারও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার উত্তেজনা চরমে উঠেছে। সম্প্রতি ফেসবুক সোসিয়েল মিডিয়ায় সংগৃহীত একটি বিশ্লেষণে এই সংঘাতের নেপথ্য কারণ ও তাৎপর্য সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও আরো তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে সেই লিখাটিকেই আরো বিস্তৃত ও সম্পাদকীয় আঙ্গিকে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হলো।
মূল বক্তব্য হলো, এই যুদ্ধ কেবল সীমান্ত সংঘাত নয়, বরং এটি হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা একটি ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, যার শিকড় প্রোথিত ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক (MoU)-এর একটি ধারা নিয়ে দ্বিমতের মধ্যে। আর এই দ্বন্দ্বই ইরানকে ‘পারমাণবিক অস্ত্রের চেয়েও বেশি মূল্যবান’ একটি কৌশলগত সুবিধা রক্ষায় উদ্বুদ্ধ করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রকে এক নতুন ধরনের সাম্রাজ্যবাদী চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকেই মূল বিতর্কটি কেন্দ্রীভূত ছিল সমঝোতা স্মারকের প্যারাগ্রাফ ৫-এর ব্যাখ্যা নিয়ে। এই ধারায় বলা হয়েছিল, হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচলের ব্যবস্থা করবে ইরান। কিন্তু এই ‘ব্যবস্থা’ বলতে কী বোঝায়, তা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে ভিন্নতা ছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় আরব দেশগুলো ধারণা করেছিল যে প্রণালীটি ‘উন্মুক্ত’ থাকবে এবং জাহাজগুলো ইরানের অনুমোদন ছাড়াই নির্দিষ্ট একটি করিডোর ব্যবহার করতে পারবে, বিশেষ করে ওমানের উপকূলীয় একটি অংশ দিয়ে। অপরদিকে, ইরানের ব্যাখ্যা ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত। তারা মনে করেছিল এই ধারা তাদের হরমুজের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রদান করে এবং কোনো জাহাজ চলাচলের জন্যই তাদের সঙ্গে সমন্বয় করা আবশ্যক ।
এই মতবিরোধ থেকেই অগ্নিস্ফুলিঙ্গের সৃষ্টি হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় সহযোগীরা যখন ইরানের নিয়ন্ত্রণ এড়িয়ে ওমানের পাশ দিয়ে একটি পৃথক করিডোর চালু করার উদ্যোগ নেয়, ইরান তা তাদের কৌশলগত সুবিধার ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে দেখে। তাদের ধারণা ছিল, এই করিডোর প্রতিষ্ঠা করলে ভবিষ্যতে ইরানের ওপর নির্ভরশীল না হয়েই এই পথ ব্যবহার করা সম্ভব হবে, যা হরমুজের উপর ইরানের প্রভাবকে খর্ব করবে । এর প্রতিক্রিয়ায় ইরান ৬ ও ৭ জুলাই তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালায়, যা ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (IRGC) কর্তৃক পরিচালিত হয়
যুক্তরাষ্ট্র এই হামলাকে যুদ্ধবিরতির ‘স্পষ্ট লঙ্ঘন’ বলে অভিহিত করে এবং জবাবে ব্যাপক হামলা চালায়। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) জানায়, তারা ইরানের দক্ষিণ উপকূলে ১৭০টির বেশি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে, যার মধ্যে ছিল বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, উপকূলীয় নজরদারি স্থাপনা এবং ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সংরক্ষণাগার । এই হামলায় ইরানের পাঁচটি প্রদেশে ১৪ জন নিহত ও ৭৮ জন আহত হয়েছেন বলে দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে । তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মার্কিন হামলা ইরানের প্রণালী নিয়ন্ত্রণের সামর্থ্যের ওপর তেমন কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি, কারণ ইরানের বেশিরভাগ ক্ষমতাই মোবাইল ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের ওপর নির্ভরশীল ।
ইরান কেবল নিজেদের আত্মরক্ষায় থেমে থাকেনি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়াইরত আরব দেশগুলোর মাটিতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে তারা লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে। ইরানের গণমাধ্যম ও সামরিক বাহিনীর দাবি অনুযায়ী, তারা জর্ডানের প্রিন্স হাসান এয়ার বেসে অবস্থিত মার্কিন কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সেন্টার ও এমকিউ-৯ ড্রোন হ্যাঙ্গার ধ্বংস করেছে । একই সাথে কুয়েতের প্যাট্রিয়ট ব্যবস্থা, কাতারের আল-উদেইদ বিমান ঘাঁটি, বাহরাইনে মার্কিন নৌঘাঁটি এবং ওমানের দুকম বন্দরেও হামলা চালানো হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে । এসব হামলার মাধ্যমে ইরান স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে যে, সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে তাদের লড়াই কেবল নিজেদের সীমাবদ্ধ নয়, বরং তারা সমগ্র অঞ্চলে মার্কিন উপস্থিতিকে চ্যালেঞ্জ জানাতে প্রস্তুত। কুয়েত, জর্ডান, কাতারের মতো দেশগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র বিধ্বংসী শব্দ ও সাইরেনের ঘটনা এই আঞ্চলিক যুদ্ধের পরিধি আরও প্রশস্ত হওয়ার ইঙ্গিত দেয় ।
সংকট যখন চরমে, তখন আরেকটি মাত্রা যোগ হয় পারমাণবিক অস্ত্রের ইস্যু। সিএনএন-এর একান্ত স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, ইরান তাদের পারচিন সামরিক কমপ্লেক্সের তালেগান ২ নামক স্থাপনা এবং নাটানজ পারমাণবিক স্থাপনার আশেপাশে পুনর্নির্মাণ কাজ চালাচ্ছে, যা পরমাণু অস্ত্র তৈরির উপকরণ সংরক্ষণের জন্য ব্যবহৃত হতে পারে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে । যদিও ইরান এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করেনি, এই কার্যক্রম এবং ইরানি কর্মকর্তাদের কাছ থেকে হুমকি যে তারা তাদের পারমাণবিক মতবাদ পরিবর্তন করতে পারে, তা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইরান এই হুমকি ব্যবহার করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে আরও সামরিক পদক্ষেপ নিতে নিরুৎসাহিত করার জন্য ।
মূল প্রশ্ন হলো, এই যুদ্ধের সমাপ্তি কোথায়? কর্নেল ম্যাক গ্রেগর এবং অধ্যাপক মেইর শেইমারের মতো বিশ্লেষকরা মত দিয়েছেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই যুদ্ধে কৌশলগতভাবে হেরে যাচ্ছে। ইরান, যুগের পর যুগ নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও টিকে আছে; তাদের জনগণের মধ্যে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ঐক্য দৃঢ় । ইরান যদি হরমুজ বন্ধ রাখতে পারে, তাহলে বৈশ্বিক তেল সরবরাহে বিঘ্ন ঘটিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা তাদের পক্ষে সম্ভব । অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত পেট্রোলিয়াম মজুদ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে, ফলে প্রণালী দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের ধাক্কা আসতে পারে ।
ইরানের জন্য, হরমুজ প্রণালী একটি অনন্য কৌশলগত হাতিয়ার। এটি তাদের হাতে এমন একটি নিশ্চয়তা দেয় যা তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি বা অন্যান্য সুবিধার বিনিময়ে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা তোলার চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর। প্রণালী নিয়ন্ত্রণ করে তারা বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে ইরানের সমৃদ্ধি ও ওপর চাপ সৃষ্টির খরচকে সরাসরি যুক্ত করতে পারে । ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাগের গালিবাফ স্পষ্ট করেছেন যে, ‘হরমুজ প্রণালী কেবল ইরানি ব্যবস্থাপনায় পুনরায় খোলা হবে, মার্কিন হুমকির মাধ্যমে নয়’ ।
পরিশেষে, এই সংঘাত কেবল একটি জলপথের লড়াই নয়; এটি বিশ্বের দুই পরাশক্তির মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন যদি এই সংকট নিরসনে আলোচনায় ফিরে আসে, তাহলে তা ইরানের কাছে দ্বিতীয় বিজয় হিসেবে চিহ্নিত হবে, যা আবারও প্রমাণ করবে যে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধই শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র যদি সামরিক অভিযান চালিয়ে যায়, তাহলে তা একটি দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল সংঘাতের সূচনা হতে পারে, যার খেসারত দিতে হবে সমগ্র বিশ্বকে। আরব দেশগুলোর ভূমিকা এই সমীকরণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; তারা যে কূটনৈতিক ও সামরিকভাবে কোন পথ বেছে নেয়, তা এই যুদ্ধের ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণ করবে। বর্তমান মুহূর্তে, হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ কেবল একটি কৌশলগত বিষয় নয়, এটি সাম্রাজ্যবাদ ও প্রতিরোধের মধ্যে চলমান দ্বন্দ্বের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত