হোয়াটসঅ্যাপে প্রতারণা, হারালেন প্রায় ২৮ কোটি টাকা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ২০২৬
  • ৮ বার
হোয়াটসঅ্যাপে প্রতারণা, হারালেন প্রায় ২৮ কোটি টাকা

প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ভারতে অনলাইন আর্থিক প্রতারণার নতুন এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা সামনে এসেছে। মধ্যপ্রদেশের গোয়ালিয়রের ৭০ বছর বয়সী জ্যেষ্ঠ চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট অশোক বিজয়বর্গীয় একটি অপরিচিত নারীর হোয়াটসঅ্যাপ বার্তার মাধ্যমে পরিচয়ের সূত্র ধরে কথিত ক্রিপ্টোকারেন্সি বিনিয়োগে প্রায় ২১ কোটি ৬ লাখ ভারতীয় রুপি হারিয়েছেন। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ২৭ কোটি ৮০ লাখ টাকা। তদন্তকারী কর্মকর্তাদের ভাষ্য, এটি ভারতের সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বড় অনলাইন বিনিয়োগ প্রতারণার ঘটনা, যেখানে সুপরিকল্পিত ডিজিটাল প্রতারণা চক্র ধাপে ধাপে একজন অভিজ্ঞ আর্থিক পেশাজীবীকেও ফাঁদে ফেলতে সক্ষম হয়েছে।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অশোক বিজয়বর্গীয় গোয়ালিয়রের সুপরিচিত চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট এবং মধ্যপ্রদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের প্রধান রিটার্নিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও হিসাববিজ্ঞানে অভিজ্ঞতা অর্জন করলেও অত্যাধুনিক অনলাইন প্রতারণার কৌশলের কাছে শেষ পর্যন্ত তিনি প্রতারিত হয়েছেন।

তদন্তে জানা গেছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে তার হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে ‘দিব্যা’ পরিচয়ে এক নারী যোগাযোগ করেন। প্রথমদিকে সাধারণ বিনিয়োগ-পরামর্শের মাধ্যমে কথোপকথন শুরু হয়। যোগাযোগের শুরুতে ভারতীয় একটি মোবাইল নম্বর ব্যবহার করা হলেও পরে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি ভার্চুয়াল নম্বর থেকে নিয়মিত যোগাযোগ চালিয়ে যাওয়া হয়। ধীরে ধীরে ব্যক্তিগত আস্থা তৈরি করে ওই নারী নিজেকে অভিজ্ঞ বিনিয়োগ উপদেষ্টা হিসেবে পরিচয় দেন এবং আন্তর্জাতিক ক্রিপ্টোকারেন্সি বাজারে উচ্চ মুনাফার বিভিন্ন সুযোগের কথা তুলে ধরেন।

এরপর প্রতারক চক্র অশোক বিজয়বর্গীয়কে একটি অনলাইন ট্রেডিং প্ল্যাটফর্মে নিবন্ধন করায়। সেখানে ইউএসডিটি (USDT) এবং বিটকয়েনে বিনিয়োগ করলে অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল লাভের আশ্বাস দেওয়া হয়। শুরুতেই খুব অল্প পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগের বিপরীতে প্রায় ১ লাখ ৮৮ হাজার রুপি তার ব্যাংক হিসাবে ফেরত পাঠানো হয়। এই অর্থ ফেরত পাওয়ার ঘটনাকে তিনি প্ল্যাটফর্মটির বিশ্বাসযোগ্যতার প্রমাণ হিসেবে ধরে নেন। মূলত এটিই ছিল প্রতারকদের কৌশল, যা ভুক্তভোগীর আস্থা অর্জনের জন্য পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করা হয়।

পরবর্তী সময়ে তিনি ধাপে ধাপে কোটি কোটি রুপি বিনিয়োগ করতে থাকেন। শুধু নিজেই নয়, তার আর্থিক বিচক্ষণতার ওপর আস্থা রেখে প্রায় ৩৫ জন ব্যবসায়িক অংশীদার ও পরিচিতজনও একই প্ল্যাটফর্মে অর্থ বিনিয়োগ করেন। তদন্তকারীরা বলছেন, এই ধরনের প্রতারণায় প্রথমে ছোট অঙ্কের মুনাফা দেখিয়ে বিনিয়োগকারীর বিশ্বাস অর্জন করা হয়, এরপর বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগে উৎসাহিত করা হয়।

ভুয়া ট্রেডিং প্ল্যাটফর্মে একসময় অশোক বিজয়বর্গীয়র হিসাবে ৩৩ কোটি ২৫ লাখ রুপি লাভ দেখানো হয়। অনলাইনে তার অ্যাকাউন্টে বিপুল মুনাফার হিসাব দেখে তিনি আরও আশ্বস্ত হন। কিন্তু প্রকৃত সমস্যার শুরু হয় যখন তিনি সেই অর্থ উত্তোলনের চেষ্টা করেন। প্রতারকরা প্রথমে আয়কর বাবদ ১০ কোটি ৮৪ লাখ রুপি পরিশোধের দাবি জানায়। পরে আরও ১ কোটি রুপি ‘রিস্ক মার্জিন’ নামে অতিরিক্ত অর্থ চাওয়া হয়। ধারাবাহিকভাবে নতুন নতুন অর্থ দাবি করায় তার সন্দেহের সৃষ্টি হয় এবং তখনই তিনি বুঝতে পারেন যে পুরো বিষয়টি একটি সুপরিকল্পিত প্রতারণা।

গোয়ালিয়র স্টেট সাইবার সেলের তদন্তে উঠে এসেছে আরও বিস্ময়কর তথ্য। তদন্তকারীদের মতে, ভুক্তভোগীর অর্থ অত্যন্ত জটিল একটি আর্থিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে চার ধাপে বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রথমে ৭৭টি ব্যাংক হিসাবে অর্থ স্থানান্তর করা হয়। এরপর সেই অর্থ ৪৯৩টি হিসাবে ভাগ করে পাঠানো হয়। তৃতীয় ধাপে প্রায় ১২ হাজার ৭০০টি লেনদেনের মাধ্যমে অর্থ ছড়িয়ে দেওয়া হয় এবং সর্বশেষ প্রায় ৭ হাজার ৫০০টি পৃথক লেনদেনের মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের হিসাবে স্থানান্তর, নগদ উত্তোলন অথবা ক্রিপ্টোকারেন্সিতে রূপান্তর করা হয়। তদন্তকারী কর্মকর্তারা বলছেন, এই ধরনের বহুস্তরবিশিষ্ট লেনদেনের উদ্দেশ্য হলো অর্থের উৎস গোপন করা এবং তদন্তকে জটিল করে তোলা।

এ পর্যন্ত পুলিশ প্রায় ২ কোটি রুপি জব্দ করতে সক্ষম হয়েছে। তবে বাকি অর্থের বড় অংশ ইতোমধ্যে বিভিন্ন অ্যাকাউন্টে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে অথবা ডিজিটাল সম্পদে রূপান্তর করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তদন্তকারীরা আশঙ্কা করছেন, প্রতারণার সঙ্গে একটি আন্তর্জাতিক সাইবার অপরাধ চক্র জড়িত থাকতে পারে।

ঘটনার তদন্তে ভারতের একাধিক রাজ্যের ব্যাংক হিসাব খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কর্ণাটক, তামিলনাড়ু, অন্ধ্র প্রদেশ, কেরালা, হরিয়ানা, উত্তর প্রদেশ, গুজরাট, রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, ঝাড়খন্ড, পশ্চিমবঙ্গ ও ছত্তিশগড়সহ বিভিন্ন অঞ্চলে অর্থ স্থানান্তরের তথ্য যাচাই করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। একই সঙ্গে প্রতারণায় ব্যবহৃত হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর, আইপি ঠিকানা, ভার্চুয়াল সার্ভার, ভুয়া ট্রেডিং ওয়েবসাইট এবং ডিজিটাল ওয়ালেটের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।

পুলিশ জানিয়েছে, এ ঘটনায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ভারতের নতুন ফৌজদারি আইন এবং তথ্যপ্রযুক্তি আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। অপরাধীদের শনাক্ত করে দ্রুত গ্রেপ্তারের লক্ষ্যে সাইবার বিশেষজ্ঞ, আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা এবং বিভিন্ন ব্যাংকের সহায়তায় সমন্বিত তদন্ত পরিচালনা করা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানে অনলাইন বিনিয়োগ প্রতারণা বিশ্বজুড়েই দ্রুত বাড়ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রাম বা অন্যান্য মেসেজিং প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে প্রতারকরা প্রথমে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলে, এরপর উচ্চ মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে বিনিয়োগে উৎসাহিত করে। শুরুতে সামান্য লাভ দেখিয়ে আস্থা অর্জনের পর বড় অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেওয়াই তাদের প্রধান কৌশল। তাই অপরিচিত ব্যক্তির দেওয়া বিনিয়োগের প্রস্তাব গ্রহণের আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বৈধতা যাচাই, নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন নিশ্চিত করা এবং অতিরিক্ত মুনাফার প্রতিশ্রুতির বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা।

এই ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে, প্রযুক্তির সুবিধা যত বাড়ছে, ততই নতুন ধরনের সাইবার প্রতারণার ঝুঁকিও বাড়ছে। তাই ব্যক্তিগত তথ্য, আর্থিক লেনদেন এবং অনলাইন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সচেতনতা ও সতর্কতার কোনো বিকল্প নেই।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত