ব্যাংককের বারে আগুনে নিহত ৩০, তদন্তে নতুন তথ্য

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ২০২৬
  • ১ বার
ব্যাংককের বারে আগুনে নিহত ৩০, তদন্তে নতুন তথ্য

প্রকাশ: ১৪ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককের একটি জনপ্রিয় মিউজিক বারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৩০ জনে পৌঁছেছে। আহত হয়েছেন ৭০ জনেরও বেশি মানুষ, যাদের মধ্যে অন্তত ২৪ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। দেশটির সাম্প্রতিক ইতিহাসে এটি সবচেয়ে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। দুর্ঘটনার পর পুরো থাইল্যান্ডজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। একই সঙ্গে ভবন নিরাপত্তা, জরুরি নির্গমন ব্যবস্থা এবং অগ্নি প্রতিরোধে বিদ্যমান ত্রুটিগুলো নতুন করে সামনে এসেছে।

রবিবার গভীর রাতে রাজধানীর উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত ‘রং বিয়ার না লাডপ্রাও’ নামের মিউজিক বারে আগুনের সূত্রপাত হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই আগুন ও ঘন কালো ধোঁয়া পুরো ভবনে ছড়িয়ে পড়ে। আতঙ্কিত দর্শনার্থীরা প্রাণ বাঁচাতে ছুটতে শুরু করলে সৃষ্টি হয় ভয়াবহ বিশৃঙ্খলা। অনেকেই নির্গমন পথ খুঁজে না পেয়ে ভবনের ভেতরেই আটকা পড়েন।

ব্যাংকক মেট্রোপলিটন প্রশাসনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দুর্ঘটনায় ৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং অন্তত ৭৩ জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। চিকিৎসকদের মতে, গুরুতর দগ্ধ হওয়ার পাশাপাশি অনেকের শরীরে বিষাক্ত ধোঁয়ার প্রভাব পড়েছে। ফলে আহতদের একটি বড় অংশকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে রাখা হয়েছে।

অগ্নিকাণ্ডের পরপরই দমকল বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রায় আধা ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। তবে ততক্ষণে বারটির বড় অংশ পুড়ে যায়। আগুন নেভানোর পর উদ্ধারকারীরা ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে একের পর এক মরদেহ উদ্ধার করেন। তদন্তকারীদের মতে, অধিকাংশ নিহত ব্যক্তি আগুনের তাপের চেয়ে ধোঁয়ায় শ্বাসরুদ্ধ হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন।

ব্যাংককের গভর্নর চাদচার্ট সিট্টিপুন্ট জানিয়েছেন, ঘটনাটি গত ১৭ বছরের মধ্যে রাজধানীর সবচেয়ে প্রাণঘাতী অগ্নিকাণ্ড। তিনি বলেন, দুর্ঘটনার কারণ উদঘাটনে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত পরিচালনা করা হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঠেকাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জাতীয় পুলিশ প্রধান কিথারাথ পুনপেচ জানিয়েছেন, নিহতদের অধিকাংশের মরদেহ একটি জানালাবিহীন বাথরুমের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, আগুনের হাত থেকে বাঁচতে অনেকে সেখানে আশ্রয় নিয়েছিলেন। কিন্তু ধোঁয়া, অন্ধকার এবং বিকল্প পথের অভাবে তারা আর বের হতে পারেননি।

তদন্তে আরও উদ্বেগজনক কিছু তথ্য সামনে এসেছে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ভবনের কয়েকটি জরুরি নির্গমন পথ বিভিন্ন আসবাবপত্র, টেবিল, তাক ও লকার দিয়ে আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে বাধাগ্রস্ত ছিল। এমনও প্রমাণ মিলেছে যে, কয়েকটি জরুরি দরজা সম্ভবত তালাবদ্ধ ছিল। ফলে বিপদের মুহূর্তে দর্শনার্থীরা নিরাপদে বের হওয়ার সুযোগ পাননি।

ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা আগুনের উৎপত্তিস্থল হিসেবে মঞ্চসংলগ্ন ছাদের অংশকে গুরুত্ব দিয়ে পরীক্ষা করছেন। সেখানে দাহ্য সাজসজ্জার উপকরণ ব্যবহারের সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি বৈদ্যুতিক সংযোগ, তারের স্থাপন পদ্ধতি এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী আনুতিন চার্নভিরাকুল জানিয়েছেন, ঘটনার সময় বারে পারফর্ম করা এক সংগীতশিল্পী তাকে জানিয়েছেন, বিদ্যুৎ বিভ্রাটের আগে মঞ্চের পাশে একটি সার্কিট ব্রেকার থেকে ধোঁয়া বের হতে দেখা যায়। কিছুক্ষণের মধ্যেই একটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায় এবং দ্রুত পুরো ভবন ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। এই তথ্যকে গুরুত্ব দিয়েই তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, একতলা ভবনটির ছাদ ভেদ করে আগুনের বিশাল শিখা বের হচ্ছে। চারদিকে ঘন কালো ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ায় মুহূর্তের মধ্যে পুরো এলাকা আতঙ্কে ভরে ওঠে। অনেকেই প্রাণ বাঁচাতে দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে আসেন, আবার কেউ কেউ জানালা ভেঙে বের হওয়ার চেষ্টা করেন।

অগ্নিকাণ্ডের পর সোমবার ঘটনাস্থলে বৌদ্ধ ভিক্ষুরা নিহতদের আত্মার শান্তি কামনায় প্রার্থনা করেন। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যকর্মীরা আশপাশের মানুষকে ধোঁয়া ও বিষাক্ত গ্যাসের প্রভাব থেকে রক্ষা করতে মাস্ক বিতরণ করেন। নিখোঁজ ও আহতদের স্বজনদের সহায়তায় ঘটনাস্থলে একটি নিবন্ধন কেন্দ্রও খোলা হয়।

এই দুর্ঘটনায় বহু পরিবার তাদের প্রিয়জনকে হারিয়েছে। গায়িকা সুকন্যা ওংওংওয়াই জানান, তার ব্যান্ডের এক সদস্য মারা গেছেন এবং আরও কয়েকজন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তিনি বলেন, হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর সবাই চারদিকে ছুটতে শুরু করেন। কিন্তু ঘন ধোঁয়ার কারণে কেউ কাউকে দেখতে বা নিরাপদ পথ খুঁজে পেতে পারেননি।

হৃদয়বিদারক অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন লাওস থেকে আসা অভিবাসী শ্রমিক কেও উদোন পাউংপানিও। তিনি বলেন, আগুন লাগার সময় তিনি ভবনের বাইরে ছিলেন। ফিরে এসে ছোট ভাইকে ডাকলেও তীব্র আগুন ও উত্তাপের কারণে ভেতরে প্রবেশ করতে পারেননি। পরে জানতে পারেন, তার ভাই আর বেঁচে নেই। শোকাহত এই যুবক বলেন, বাবা-মায়ের কাছে দুই ভাই একসঙ্গে ফেরার কথা ছিল, কিন্তু এখন তিনি ফিরবেন একাই।

বার কর্তৃপক্ষ এক বিবৃতিতে নিহতদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছে এবং ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছে। তারা জানিয়েছে, তদন্তে সব ধরনের সহযোগিতা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে বারের মালিক গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

থাইল্যান্ডে অতীতেও বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। ২০২২ সালে দেশটির একটি মিউজিক বারে আগুনে ১৪ জন নিহত হয়েছিলেন। এরও আগে ২০০৯ সালের নববর্ষ উদযাপনের সময় ব্যাংককের সান্তিকা নাইটক্লাবে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ৬৭ জন প্রাণ হারান এবং আহত হন দুই শতাধিক মানুষ। সেই ঘটনার পরও ভবন নিরাপত্তা নিয়ে নানা সুপারিশ করা হলেও সাম্প্রতিক এই দুর্ঘটনা আবারও দেখিয়ে দিল, জনসমাগমস্থলে অগ্নি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কতটা জরুরি।

থাই কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তদন্ত শেষে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে দেশজুড়ে বিনোদনকেন্দ্র, বার ও নাইটক্লাবগুলোর অগ্নি নিরাপত্তা এবং জরুরি নির্গমন ব্যবস্থার ওপর বিশেষ অভিযান পরিচালনারও পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত