প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ এখন শেষ অধ্যায়ের দোরগোড়ায়। দীর্ঘ এক মাসের উত্তেজনা, নাটকীয়তা, অঘটন এবং অসাধারণ ফুটবল নৈপুণ্যের পর টুর্নামেন্ট এসে দাঁড়িয়েছে সেমিফাইনালে। বিশ্ব ফুটবলের চার পরাশক্তি—ফ্রান্স, স্পেন, আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড—এখন আর মাত্র একটি জয়ের দূরত্বে স্বপ্নের ফাইনাল থেকে। কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর দৃষ্টি এখন আটকে আছে এই চার দলের দিকে। কে উঠবে বিশ্বকাপের ফাইনালে, আর কার স্বপ্ন থেমে যাবে শেষ চারের মঞ্চেই—এই প্রশ্নের উত্তর মিলবে দুই হাইভোল্টেজ সেমিফাইনালের পর।
আগামীকাল আটলান্টায় বিশ্ব ফুটবলের দুই ঐতিহাসিক প্রতিদ্বন্দ্বী ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনা মুখোমুখি হবে ফাইনালের টিকিটের লড়াইয়ে। অন্যদিকে আজকের আরেক সেমিফাইনালে বর্তমান ইউরোপীয় দুই শক্তিধর দল ফ্রান্স ও স্পেন নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণে মাঠে নামবে। ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, এবারের সেমিফাইনাল শুধু চারটি দলের লড়াই নয়; এটি চারটি ভিন্ন ফুটবল দর্শন, চারটি আলাদা কৌশল এবং চারটি মানসিক শক্তির মুখোমুখি সংঘর্ষ।
ইংল্যান্ড এবারের বিশ্বকাপে খুব বেশি দৃষ্টিনন্দন ফুটবল খেলতে না পারলেও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি তারা ঠিকই করেছে—ম্যাচ জেতা। জার্মান কোচ টমাস টুখেলের অধীনে দলটি বাস্তববাদী ফুটবল খেলছে। প্রয়োজনের সময় আক্রমণ, আবার প্রয়োজনে রক্ষণে নেমে প্রতিপক্ষকে আটকে রাখার কৌশল ইংল্যান্ডকে ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে নিয়েছে।
বিশেষ করে জুড বেলিংহাম আবারও নিজেকে বড় ম্যাচের বড় খেলোয়াড় হিসেবে প্রমাণ করেছেন। কোয়ার্টার ফাইনালে নরওয়ের বিপক্ষে তার জোড়া গোল ইংল্যান্ডকে সেমিফাইনালে তুলেছে। অধিনায়ক হ্যারি কেইনের অভিজ্ঞতা এবং বেলিংহামের সৃজনশীলতা দলের সবচেয়ে বড় শক্তি। তবে পুরো দলের পারফরম্যান্স এখনো ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। ফ্রান্স বা স্পেনের মতো ভারসাম্যপূর্ণ দলের বিপক্ষে সেটি ইংল্যান্ডের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
অন্যদিকে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার যাত্রা মোটেও সহজ ছিল না। শিরোপা ধরে রাখার কঠিন বাস্তবতা এবারের টুর্নামেন্টে ভালোভাবেই উপলব্ধি করেছে লিওনেল মেসির দল। নকআউট পর্বের প্রতিটি ম্যাচেই তাদের লড়তে হয়েছে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত। কখনো অতিরিক্ত সময়, কখনো অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন, আবার কখনো সংখ্যাগত সুবিধা কাজে লাগিয়ে জয় নিশ্চিত করতে হয়েছে।
তবে কঠিন পরিস্থিতিতে নিজেদের সেরাটা বের করে আনার অসাধারণ মানসিক শক্তিই আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় সম্পদ। আগের মতো এখন পুরো দল শুধু মেসির ওপর নির্ভরশীল নয়। মাঝমাঠ, রক্ষণ এবং আক্রমণ—সব বিভাগেই একাধিক ফুটবলার দায়িত্ব ভাগ করে নিচ্ছেন। যদিও অতিরিক্ত সময় খেলার কারণে শারীরিক ক্লান্তি কিছুটা প্রভাব ফেলতে পারে, তারপরও বড় ম্যাচে অভিজ্ঞতা ও মানসিক দৃঢ়তার কারণে আর্জেন্টিনা এখনো অন্যতম শক্তিশালী দাবিদার।
স্পেন এবারের বিশ্বকাপে সবচেয়ে পরিপূর্ণ দলগুলোর একটি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তাদের রক্ষণভাগ পুরো টুর্নামেন্টে প্রায় দুর্ভেদ্য হয়ে উঠেছে। এখন পর্যন্ত মাত্র একটি গোল হজম করা স্পেনের শৃঙ্খলাবদ্ধ রক্ষণ প্রতিপক্ষের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বেলজিয়ামের বিপক্ষে নাটকীয় জয়েও স্পেনের ধৈর্য এবং ম্যাচের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করার মানসিকতা স্পষ্ট হয়েছে। তরুণ তারকা লামিনে ইয়ামাল এখনও প্রত্যাশিত গোল বা অ্যাসিস্ট করতে না পারলেও তার উপস্থিতি প্রতিপক্ষের রক্ষণকে ব্যস্ত রেখেছে। স্পেনের সবচেয়ে বড় শক্তি কোনো একক তারকা নয়; বরং দলীয় সমন্বয়, বল দখলের দক্ষতা এবং কৌশলগত শৃঙ্খলা। এই কারণেই অনেক বিশ্লেষক তাদের এবারের অন্যতম ফেভারিট হিসেবে বিবেচনা করছেন।
অন্যদিকে ফ্রান্সকে অনেকেই টুর্নামেন্টের সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ দল হিসেবে দেখছেন। ছয় ম্যাচে শতভাগ জয়, ১৬ গোল এবং মাত্র দুটি গোল হজম—পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে দিদিয়ের দেশমের দল কতটা ভয়ংকর ছন্দে রয়েছে।
কিলিয়ান এমবাপ্পে এবারের বিশ্বকাপে দুর্দান্ত ফর্মে রয়েছেন। ইতোমধ্যে আটটি গোল করে তিনি গোলদাতার তালিকার শীর্ষে অবস্থান করছেন। উসমান দেম্বেলের গতি ও সৃজনশীলতা ফরাসি আক্রমণকে আরও ভয়ংকর করে তুলেছে। মাঝমাঠে মাইকেল ওলিসে ধারাবাহিকভাবে সুযোগ তৈরি করছেন এবং অ্যাসিস্ট তালিকায়ও শীর্ষে রয়েছেন। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, নকআউট পর্বে এখন পর্যন্ত একটি গোলও হজম করেনি ফ্রান্স। আক্রমণ ও রক্ষণের এই ভারসাম্য তাদের শিরোপার সবচেয়ে শক্তিশালী দাবিদার করে তুলেছে।
বিশ্বকাপের শেষ চারে এসে পরিসংখ্যান যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ মানসিক দৃঢ়তা। ইতিহাস বলছে, নকআউট পর্বে অনেক সময় সেরা ফুটবল খেলেও দল বিদায় নিয়েছে, আবার প্রত্যাশার চেয়ে কম খেলেও ট্রফি জিতেছে অন্য দল। সেই দিক থেকে ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনার লড়াকু মানসিকতা তাদের বড় শক্তি। অন্যদিকে স্পেন ও ফ্রান্সের কৌশলগত শৃঙ্খলা এবং ধারাবাহিক পারফরম্যান্স তাদের এগিয়ে রাখছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ফ্রান্স ও স্পেনের সেমিফাইনাল হবে আধুনিক ফুটবলের কৌশল, গতি ও দলীয় সমন্বয়ের এক অনন্য লড়াই। অন্যদিকে ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনার ম্যাচে থাকবে আবেগ, ইতিহাস, প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং টিকে থাকার মরিয়া সংগ্রাম। দুটি সেমিফাইনালের চরিত্র ভিন্ন হলেও লক্ষ্য একটাই—বিশ্বকাপের ফাইনালে জায়গা করে নেওয়া।
বিশ্বকাপের মঞ্চে শেষ পর্যন্ত চ্যাম্পিয়ন হয় সেই দল, যারা শুধু ভালো ফুটবল খেলতে পারে না, বরং কঠিন মুহূর্তে নিজেদের মানসিক দৃঢ়তা ধরে রাখতে পারে। সেই দিক থেকে চারটি দলই ফাইনালে ওঠার যোগ্যতা রাখে। তবে বর্তমান পারফরম্যান্স, দলীয় ভারসাম্য এবং ধারাবাহিকতার বিচারে ফ্রান্স ও স্পেন কিছুটা এগিয়ে থাকলেও, নকআউট ফুটবলে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের মতো অভিজ্ঞ দলকে কখনোই খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। তাই বিশ্বকাপের শেষ চারটি ম্যাচই এখন ফুটবলপ্রেমীদের জন্য হতে যাচ্ছে রোমাঞ্চ, উত্তেজনা এবং অনিশ্চয়তায় ভরপুর এক মহারণ।