শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবিতে দেশজুড়ে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ২০২৬
  • ৮ বার
শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবিতে দেশজুড়ে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ

প্রকাশ: ১৪ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বৈরী আবহাওয়ার মধ্যেও এইচএসসি পরীক্ষা আয়োজন, পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ের প্রশ্নপত্রে ভুল ও অতিরিক্ত কঠিন প্রশ্নের অভিযোগ এবং শিক্ষাব্যবস্থাপনা নিয়ে ক্ষোভকে কেন্দ্র করে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভে নেমেছেন শিক্ষার্থীরা। মঙ্গলবার রাজধানীর সায়েন্স ল্যাব মোড়, ঢাকা শিক্ষা বোর্ড এলাকা, উত্তরা, কুমিল্লা, বগুড়া, বরিশাল ও ময়মনসিংহে শিক্ষার্থীরা সড়ক অবরোধ, মানববন্ধন, বিক্ষোভ ও সমাবেশ করেন। আন্দোলনকারীরা শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের পদত্যাগের দাবি জানিয়ে বিভিন্ন স্লোগান দেন এবং দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, টানা বৃষ্টি, জলাবদ্ধতা ও দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যেও এইচএসসি পরীক্ষা গ্রহণের সিদ্ধান্ত হাজারো পরীক্ষার্থীকে চরম ভোগান্তির মুখে ফেলেছে। অনেক শিক্ষার্থী নির্ধারিত সময়ে পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছাতে পারেননি, কেউ কেউ দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন, আবার অনেকের প্রবেশপত্র ও শিক্ষাসামগ্রী বৃষ্টিতে নষ্ট হয়েছে। একই সঙ্গে পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ের প্রশ্নপত্রে একাধিক ভুল এবং প্রশ্নের মান নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন পরীক্ষার্থীরা। তাদের দাবি, প্রশ্নপত্রে এমন কিছু প্রশ্ন ছিল, যা এইচএসসি পাঠ্যক্রমের তুলনায় অনেক বেশি জটিল এবং বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

সকালে রাজধানীর সায়েন্স ল্যাব মোড়ে বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীরা সড়ক অবরোধের মাধ্যমে আন্দোলন শুরু করেন। প্রায় এক ঘণ্টা মিরপুর সড়কে যান চলাচল বন্ধ থাকায় ওই এলাকায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। পরে শিক্ষার্থীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অভিমুখে রওনা দিলে ভিসি চত্বর এলাকায় পুলিশ তাদের অগ্রযাত্রায় বাধা দেয়। এরপর তারা পলাশী হয়ে ঢাকার মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের সামনে গিয়ে অবস্থান নেন এবং শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে স্লোগান দেন।

দুপুরের পর আবারও শিক্ষার্থীরা সায়েন্স ল্যাব মোড়ে ফিরে এসে দ্বিতীয় দফায় অবরোধ কর্মসূচি পালন করেন। এতে রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ত এই সড়কে যান চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা জানান, তারা শান্তিপূর্ণভাবে দাবি জানাতে চাইলেও বিভিন্ন স্থানে বাধার মুখে পড়েছেন। তাদের অভিযোগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় যাওয়ার সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের বাধা দেয় এবং ধাক্কাধাক্কির ঘটনাও ঘটে।

বিক্ষোভে অংশ নেওয়া বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীরা বলেন, পদার্থবিজ্ঞান পরীক্ষায় একাধিক প্রশ্নে ভুল ছিল এবং অধিকাংশ প্রশ্নই অত্যন্ত কঠিন হওয়ায় অনেক পরীক্ষার্থী মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। তাদের মতে, এমন প্রশ্নের কারণে ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। পাশাপাশি দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যে পরীক্ষা আয়োজনের সিদ্ধান্তকে তারা শিক্ষার্থীবান্ধব নয় বলে দাবি করেন।

রাজধানীর পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জেলাতেও একই ধরনের কর্মসূচি পালিত হয়েছে। উত্তরার বিএনএস সেন্টারের সামনে শিক্ষার্থীরা ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করলে গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ট্রাফিক পুলিশ জানায়, আন্দোলনের কারণে কয়েক ঘণ্টা যানবাহন চলাচলে বিঘ্ন ঘটে এবং বিকল্প সড়ক ব্যবহার করতে হয়।

বরিশালে শিক্ষা বোর্ডের সামনে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়ক অবরোধ করেন বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীরা। এতে মহাসড়কের দুই পাশে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয় এবং সাধারণ যাত্রীরা দুর্ভোগে পড়েন। আন্দোলনকারীরা বলেন, তাদের দাবির প্রতি কর্তৃপক্ষ দ্রুত ইতিবাচক সাড়া না দিলে আরও কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে।

কুমিল্লায় ‘কুমিল্লার সচেতন শিক্ষার্থী সমাজ’ ব্যানারে শিক্ষার্থীরা নগরের কান্দিরপাড় এলাকায় সমাবেশ করেন। পরে তারা মিছিল নিয়ে শিক্ষা বোর্ড প্রাঙ্গণে গিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। সেখানে শিক্ষার্থীরা তিন দফা দাবি তুলে ধরে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ, পরীক্ষা-সংক্রান্ত অনিয়মের তদন্ত এবং ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানান।

বগুড়ায় বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীরা সাতমাথা এলাকা থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে সমাবেশ করেন। সেখানে বক্তারা অভিযোগ করেন, শিক্ষা প্রশাসনের অব্যবস্থাপনার কারণে পরীক্ষার্থীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। তারা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে আরও কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি দেন।

ময়মনসিংহেও শিক্ষার্থীরা টাউন হল এলাকায় ময়মনসিংহ-টাঙ্গাইল মহাসড়কে ব্যারিকেড দিয়ে বিক্ষোভ করেন। এতে ওই সড়কে যান চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। পুলিশ জানায়, শিক্ষার্থীরা শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচি পালন করেছেন এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

আন্দোলনে অংশ নেওয়া কয়েকজন শিক্ষার্থী জানান, তারা শুধু পরীক্ষা পেছানোর দাবি করছেন না; ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের বাস্তব সমস্যাকে গুরুত্ব দিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণেরও আহ্বান জানাচ্ছেন। তাদের মতে, প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে পরীক্ষা আয়োজন এবং প্রশ্নপত্র প্রণয়নে অসঙ্গতি শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি শিক্ষার্থীদের আস্থা নষ্ট করছে।

এদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিভিন্ন স্থানে শিক্ষার্থীরা শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থান নিলেও গুরুত্বপূর্ণ সড়ক অবরোধের কারণে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বেড়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।

শিক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক এই আন্দোলন শুধু একটি পরীক্ষা বা প্রশ্নপত্রকে ঘিরে নয়; বরং শিক্ষার্থীদের মধ্যে জমে থাকা দীর্ঘদিনের অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ। তারা মনে করেন, পরীক্ষা ব্যবস্থাপনা, প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, দুর্যোগকালীন বিকল্প পরিকল্পনা এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব হবে।

দিনভর আন্দোলনের পরও শিক্ষার্থীরা তাদের কর্মসূচি প্রত্যাহার করেননি। আন্দোলনকারীদের ঘোষণা অনুযায়ী, দাবি পূরণ না হলে আগামী দিনগুলোতেও রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ ও অবস্থান কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে। ফলে শিক্ষা খাতের এই সংকট কীভাবে সমাধান হয়, সেদিকে এখন শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং সংশ্লিষ্ট সবার নজর।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত