প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদকে ঘিরে নতুন এক বিস্ফোরক দাবি সামনে এসেছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি এবং গোয়েন্দা কর্মকাণ্ড নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। মার্কিন প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক টাইমস-এর এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ দীর্ঘদিন ধরে ইরানের বর্তমান ক্ষমতার কাঠামো পরিবর্তনের একটি গোপন পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করেছে। সেই পরিকল্পনার অন্যতম লক্ষ্য ছিল সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদকে আবারও ইরানের ক্ষমতার কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনা।
প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। যদিও এই দাবির বিষয়ে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি এবং আহমাদিনেজাদের দপ্তর পুরো বিষয়টিকে ‘ভুয়া’ ও ‘হলিউডি গল্প’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে। ফলে ঘটনাটি নিয়ে নানা প্রশ্ন ও বিতর্ক তৈরি হলেও বিষয়টি এখনও স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৩ সালে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব ছাড়ার পর ধীরে ধীরে ইরানের ক্ষমতাকেন্দ্রের সঙ্গে মাহমুদ আহমাদিনেজাদের দূরত্ব বাড়তে থাকে। পরবর্তী সময়ে দেশটির গার্ডিয়ান কাউন্সিল তাকে একাধিকবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অনুমতি দেয়নি। রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়া এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করে মোসাদ।
মার্কিন ও ইরানের সাবেক কয়েকজন গোয়েন্দা কর্মকর্তার বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, আহমাদিনেজাদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন এবং তাকে ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পরিকল্পনায় যুক্ত করার জন্য দীর্ঘমেয়াদি একটি কৌশল গ্রহণ করা হয়েছিল। ইসরায়েলের এই কথিত পরিকল্পনার কোডনেম ছিল ‘অপারেশন পুস ইন বুটস’।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগ দিতে হাঙ্গেরির রাজধানী বুদাপেস্ট সফর করেন আহমাদিনেজাদ। সেই সফরের সময় তার সঙ্গে মোসাদের প্রতিনিধিদের একটি গোপন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় বলে দাবি করা হয়েছে। পরবর্তী বছর একই শহরে দ্বিতীয় দফা বৈঠকেও তিনি অংশ নেন এবং সেখানে মোসাদের তৎকালীন প্রধান ডেভিড বার্নিয়াও উপস্থিত ছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়, এসব বৈঠকের সব ধরনের ব্যয় বহন করেছিল ইসরায়েল। তবে আহমাদিনেজাদের সাবেক ঘনিষ্ঠ সহযোগী আবদোলরেজা দাভারি দাবি করেছেন, অর্থ নয়, বরং রাজনৈতিক ক্ষমতায় ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষাই যদি কোনো সিদ্ধান্তের পেছনে কাজ করে থাকে, সেটিই হতে পারে প্রধান কারণ।
দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, চলতি বছরে ইরানকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনা বাড়ার সময় মোসাদ তাদের পুরোনো পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা করে। যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে আহমাদিনেজাদের বাসভবনের কাছে একটি বিমান হামলাকে আড়াল হিসেবে ব্যবহার করে তাকে একটি গোপন নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে।
তবে ওই পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। বলা হয়েছে, ইসরায়েলের পক্ষ থেকে তাকে পুনরায় ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনার বাস্তবসম্মত কোনো অগ্রগতি না দেখে আহমাদিনেজাদ নিজেই সেই পরিকল্পনার প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলেন এবং নিরাপদ আশ্রয় ছেড়ে বেরিয়ে আসেন।
এরপর ইরানের নিরাপত্তা সংস্থাগুলো কথিত ওই যোগাযোগ সম্পর্কে জানতে পারে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। এরপর থেকেই আহমাদিনেজাদ কার্যত গৃহবন্দি অবস্থায় রয়েছেন এবং ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের গোয়েন্দা ইউনিট তার ওপর কড়া নজরদারি চালাচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
দীর্ঘ সময় জনসম্মুখে অনুপস্থিত থাকার পর সম্প্রতি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজা উপলক্ষে আয়োজিত এক শোক মিছিলে অল্প সময়ের জন্য আহমাদিনেজাদকে দেখা যায়। এরপর থেকেই তাকে ঘিরে নতুন করে নানা জল্পনা শুরু হয়।
ইসরায়েলের সঙ্গে আহমাদিনেজাদের কথিত যোগাযোগের অভিযোগ সামনে আসার পরও তেল আবিবের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি। একইভাবে মোসাদও এ বিষয়ে নীরব রয়েছে। অন্যদিকে আহমাদিনেজাদের কার্যালয় এক বিবৃতিতে পুরো প্রতিবেদনকে ‘সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন’ এবং ‘কাল্পনিক গল্প’ বলে উল্লেখ করেছে। তাদের দাবি, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সাবেক প্রেসিডেন্টকে বিতর্কিত করার জন্য এ ধরনের সংবাদ প্রকাশ করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরেই গোপন কূটনীতি, গোয়েন্দা তৎপরতা এবং প্রভাব বিস্তারের নানা অভিযোগে আলোচিত। ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে দীর্ঘদিনের বৈরিতার প্রেক্ষাপটে এ ধরনের দাবি সামনে এলে তা স্বাভাবিকভাবেই ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। তবে নিরপেক্ষ তদন্ত বা একাধিক নির্ভরযোগ্য উৎসের মাধ্যমে এসব অভিযোগ নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত বিষয়টিকে সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।
বিশ্লেষকদের ভাষ্য, বর্তমান বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় তথ্যযুদ্ধও একটি বড় অস্ত্রে পরিণত হয়েছে। তাই আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত যেকোনো চাঞ্চল্যকর দাবির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য, স্বাধীন অনুসন্ধান এবং প্রমাণ যাচাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার মধ্যে এই প্রতিবেদন নতুন বিতর্কের জন্ম দিলেও অভিযোগগুলোর সত্যতা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ফলে বিষয়টি নিয়ে ভবিষ্যতে নতুন তথ্য বা তদন্ত সামনে এলে তবেই প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হতে পারে।