বিকাশে দিনে এক লাখ গ্রাহকের ন্যানো ঋণ, ছাড়াল ১০ হাজার কোটি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ২০২৬
  • ৪ বার
বিকাশে দিনে এক লাখ গ্রাহকের ন্যানো ঋণ, ছাড়াল ১০ হাজার কোটি

প্রকাশ: ১৪ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশে ডিজিটাল আর্থিক সেবার বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে ক্ষুদ্রঋণ ব্যবস্থায়ও দ্রুত পরিবর্তন আসছে। প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার দীর্ঘ প্রক্রিয়া এড়িয়ে এখন মোবাইল ফোনের মাধ্যমেই কয়েক মিনিটের মধ্যে জামানত ছাড়াই ঋণ গ্রহণের সুযোগ পাচ্ছেন লাখো মানুষ। বিশেষ করে জরুরি ব্যক্তিগত প্রয়োজন, ছোট ব্যবসার মূলধন, দৈনন্দিন খরচ কিংবা স্বল্পমেয়াদি আর্থিক সংকট মোকাবিলায় ডিজিটাল ক্ষুদ্রঋণ বা ‘ন্যানো লোন’ সাধারণ মানুষের কাছে ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। এই পরিবর্তনের অন্যতম উদাহরণ হয়ে উঠেছে সিটি ব্যাংক ও বিকাশের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত ডিজিটাল ন্যানো ঋণসেবা।

প্রতিষ্ঠান দুটির সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বিকাশ অ্যাপের মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় এক লাখ গ্রাহক সিটি ব্যাংকের ন্যানো ঋণ গ্রহণ করছেন। গত সাড়ে চার বছরে এই সেবার মাধ্যমে প্রায় ৩৫ লাখ গ্রাহকের কাছে ১০ হাজার কোটি টাকারও বেশি ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। ডিজিটাল আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে এটি দেশের অন্যতম বড় মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

২০২১ সালের ডিসেম্বরে পরীক্ষামূলকভাবে এই ডিজিটাল ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম শুরু হয়। শুরুতে সীমিত পরিসরে চালু হলেও দ্রুত গ্রাহকদের আস্থা অর্জন করে এটি বিস্তৃত হয়। প্রথম বছরে মোট ১০১ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করা হয়েছিল। পরের বছরেই সেই পরিমাণ প্রায় পাঁচ গুণ বেড়ে ৪৯৪ কোটি টাকায় পৌঁছে। ২০২৪ সালে বিতরণ হয় ৮৫৫ কোটি টাকা। এরপর সেবাটির চাহিদা আরও দ্রুত বাড়তে থাকে। ২০২৫ সালে বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ৩ হাজার ৯৫৭ কোটি টাকা। চলতি বছরের ৯ জুলাই পর্যন্ত আরও ৪ হাজার ৫৯১ কোটি টাকার ন্যানো ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে সাড়ে চার বছরে এই ডিজিটাল ঋণসেবার মাধ্যমে বিতরণকৃত অর্থের পরিমাণ ১০ হাজার কোটি টাকার গণ্ডি অতিক্রম করেছে।

সিটি ব্যাংক জানিয়েছে, এ পর্যন্ত মোট ৩ কোটি ১৯ লাখ ঋণ হিসাবের মাধ্যমে এই অর্থ বিতরণ করা হয়েছে। অর্থাৎ একজন গ্রাহক গড়ে নয়বারেরও বেশি এই ঋণ সুবিধা গ্রহণ করেছেন। বর্তমানে বিকাশের ১ কোটি ২০ লাখের বেশি গ্রাহক এই ঋণসেবা গ্রহণের জন্য যোগ্য বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

প্রতিদিনের ঋণ বিতরণের চিত্রও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় এক লাখ গ্রাহক বিকাশ অ্যাপ ব্যবহার করে সিটি ব্যাংকের ন্যানো ঋণ নিচ্ছেন। প্রতিটি ঋণের গড় পরিমাণ প্রায় ৩ হাজার টাকা। মাসিক হিসেবে গড়ে প্রায় ৯০০ কোটি টাকার ডিজিটাল ঋণ বিতরণ করা হচ্ছে। এটি দেশের ক্ষুদ্রঋণ ও ডিজিটাল ব্যাংকিং ব্যবস্থার দ্রুত সম্প্রসারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিকাশ অ্যাপের মাধ্যমে বর্তমানে তিন ধরনের ডিজিটাল ঋণ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে নগদ ঋণ, ‘বাই নাও পে লেটার’ সুবিধার মাধ্যমে পণ্য কেনার ঋণ এবং মোবাইল রিচার্জের জন্য ‘পে লেটার’ সেবা। তবে মোট বিতরণকৃত ঋণের প্রায় ৯৯ শতাংশই নগদ ঋণ হিসেবে দেওয়া হয়েছে, যা থেকে বোঝা যায় জরুরি নগদ অর্থের চাহিদা পূরণেই গ্রাহকেরা এই সেবাকে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করছেন।

গ্রাহকদের ভৌগোলিক ও সামাজিক চিত্রেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে। সিটি ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ন্যানো ঋণ গ্রহণকারীদের ৬৩ শতাংশ শহরাঞ্চলের বাসিন্দা। অন্যদিকে গ্রামীণ এলাকার গ্রাহকের সংখ্যা প্রায় ৩৩ শতাংশ। বাকি অংশ অন্যান্য অঞ্চলের গ্রাহক। লিঙ্গভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ঋণগ্রহীতাদের ৭৮ শতাংশ পুরুষ এবং ২২ শতাংশ নারী। বিশেষজ্ঞদের মতে, নারীদের অংশগ্রহণ আরও বাড়ানো গেলে এই ডিজিটাল ঋণসেবা আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকে আরও শক্তিশালী করবে।

ডিজিটাল ঋণ ব্যবস্থার সবচেয়ে ইতিবাচক দিকগুলোর একটি হলো এর অত্যন্ত কম খেলাপি ঋণের হার। প্রচলিত ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ দীর্ঘদিন ধরেই একটি বড় উদ্বেগের বিষয় হলেও এই ন্যানো ঋণ কার্যক্রমে পরিস্থিতি ভিন্ন। সিটি ব্যাংকের তথ্যমতে, বিতরণ করা ১০ হাজার কোটি টাকার মধ্যে খেলাপি ও অবলোপন করা ঋণের পরিমাণ মাত্র ৫৩ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের মাত্র শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ। অর্থাৎ প্রায় ৯৯ দশমিক ৫ শতাংশ ঋণই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পরিশোধ করা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাসরুর আরেফিন বলেন, দেশের ব্যাংকিং খাতে যখন খেলাপি ঋণ বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে, তখন ডিজিটাল ক্ষুদ্রঋণের এই সাফল্য অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। তাঁর মতে, ছোট অঙ্কের ঋণ, প্রযুক্তিনির্ভর মূল্যায়ন এবং দ্রুত বিতরণ ব্যবস্থা ব্যাংকিং খাতের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। এই অভিজ্ঞতা থেকে দেশের সামগ্রিক ব্যাংকিং খাত শিক্ষা নিতে পারে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

বিকাশের চিফ কমার্শিয়াল অফিসার আলী আহম্মেদ বলেন, অত্যাধুনিক প্রযুক্তি, বিকল্প তথ্যভিত্তিক ঋণ মূল্যায়ন, দায়িত্বশীল ব্যাংকিং এবং কার্যকর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার সমন্বয়ে একটি সফল ডিজিটাল ঋণ বিতরণ মডেল গড়ে তোলা সম্ভব হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ১০ হাজার কোটি টাকার ঋণ বিতরণের মাইলফলক কেবল একটি আর্থিক অর্জন নয়; এটি লাখো মানুষের কাছে স্বচ্ছ, সহজ এবং দ্রুত আর্থিক সেবা পৌঁছে দেওয়ার একটি সফল উদাহরণ।

ব্যাংকিং বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে ডিজিটাল আর্থিক সেবার বিস্তার, স্মার্টফোনের ব্যবহার বৃদ্ধি এবং মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের জনপ্রিয়তা ভবিষ্যতে এ ধরনের ক্ষুদ্রঋণের বাজারকে আরও সম্প্রসারিত করবে। তবে একই সঙ্গে দায়িত্বশীল ঋণ বিতরণ, গ্রাহক সচেতনতা এবং তথ্য সুরক্ষার বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে, যাতে এই সেবা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই থাকে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে ডিজিটাল ব্যাংকিং এবং মোবাইল আর্থিক সেবার ব্যবহার দ্রুত বেড়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় সিটি ব্যাংক ও বিকাশের ন্যানো ঋণ কার্যক্রম প্রমাণ করেছে, প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়ানোর পাশাপাশি ক্ষুদ্রঋণ ব্যবস্থাকেও আরও সহজ, দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য করে তুলতে পারে। বিশেষ করে যেসব মানুষ প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে ছিলেন, তাদের জন্য এই ধরনের ডিজিটাল ঋণ ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের নতুন সুযোগ তৈরি করবে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত