প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
হবিগঞ্জের মাধবপুর ও চুনারুঘাট উপজেলায় পৃথক তিনটি বিশেষ অভিযানে প্রায় ১ কোটি ৭৮ লাখ ৫২ হাজার টাকা মূল্যের ভারতীয় বিভিন্ন পণ্য, মাদকদ্রব্য এবং সীমান্ত দিয়ে পাচারের উদ্দেশ্যে নেওয়া বাংলাদেশি পণ্য জব্দ করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। সীমান্ত এলাকায় চোরাচালান ও মাদক পাচার প্রতিরোধে পরিচালিত এসব অভিযানে বিপুল পরিমাণ ভারতীয় কসমেটিকস, শাড়ি, গাঁজা, বিয়ার এবং বাংলাদেশি মশার কয়েল উদ্ধার করা হয়েছে। বিজিবি জানিয়েছে, জব্দ করা পণ্য আইনানুগ প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তরের কার্যক্রম চলছে এবং ঘটনায় প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।
বিজিবির হবিগঞ্জ ব্যাটালিয়ন (৫৫ বিজিবি) জানায়, সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার এবং চোরাচালান রোধে গত ২৪ ঘণ্টায় পৃথক তিনটি স্থানে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হয়। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পরিচালিত এসব অভিযানে চোরাকারবারিরা অভিনব কৌশলে পাথরবোঝাই ট্রাকের ভেতরে ভারতীয় পণ্য লুকিয়ে পাচারের চেষ্টা করছিল বলে দাবি করেছে বাহিনীটি।
হবিগঞ্জ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল তানজিলুর রহমান জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বুধবার সকালে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের মাধবপুর উপজেলার মুক্তিযোদ্ধা চত্বর সংলগ্ন পানসি হোটেলের সামনে একটি অস্থায়ী চেকপোস্ট স্থাপন করা হয়। বিজিবির উপস্থিতি টের পেয়ে সন্দেহভাজন চোরাকারবারিরা একটি পাথরবোঝাই ট্রাক ফেলে দ্রুত পালিয়ে যায়। পরে ট্রাকটিতে তল্লাশি চালিয়ে পাথরের নিচে বিশেষভাবে লুকিয়ে রাখা বিপুল পরিমাণ ভারতীয় কসমেটিকস, শাড়ি, গাঁজা, বিয়ার এবং মশার কয়েল উদ্ধার করা হয়।
বিজিবির ভাষ্য অনুযায়ী, উদ্ধার করা এসব পণ্যের বাজারমূল্য প্রায় ১ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। উদ্ধার হওয়া পণ্যের মধ্যে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ভারতীয় প্রসাধনী, শাড়ি এবং অন্যান্য ভোগ্যপণ্যের পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মাদকদ্রব্যও ছিল। ট্রাকটি জব্দ করা হলেও চালক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যাওয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি।
একই দিনে পৃথক আরেকটি অভিযানে চুনারুঘাট উপজেলার সাতছড়ি সীমান্ত এলাকার বনশোটি এলাকায় মালিকবিহীন অবস্থায় লুকিয়ে রাখা ১৮ দশমিক ৫ কেজি ভারতীয় গাঁজা উদ্ধার করা হয়। এ সময় দুটি ভারতীয় বিয়ারের বোতলও জব্দ করা হয়। বিজিবি জানিয়েছে, সীমান্তবর্তী এলাকায় নিয়মিত টহল এবং গোয়েন্দা নজরদারির অংশ হিসেবে এ অভিযান পরিচালিত হয়।
এ ছাড়া চুনারুঘাটের দুধপাতিল বিওপির টিলাবাড়ি এলাকায় আরেকটি অভিযানে ভারতে পাচারের সময় ৫৪ প্যাকেট বাংলাদেশি মশার কয়েল জব্দ করা হয়। বিজিবির তথ্য অনুযায়ী, জব্দ হওয়া মশার কয়েলের আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৭০ হাজার টাকা। এসব পণ্য সীমান্ত অতিক্রমের আগেই উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে বলে জানিয়েছে বাহিনীটি।
বিজিবি সূত্রে জানা গেছে, উদ্ধার হওয়া ভারতীয় কসমেটিকস, শাড়ি এবং অন্যান্য পণ্য সংশ্লিষ্ট কাস্টমস কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হবে। অন্যদিকে উদ্ধার হওয়া গাঁজা ও বিয়ার আইনানুগ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে হবিগঞ্জ জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কাছে হস্তান্তরের কার্যক্রম চলছে। জব্দ হওয়া পণ্য ও মাদকদ্রব্যের বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।
সীমান্ত এলাকায় চোরাচালান দীর্ঘদিন ধরেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষ করে ভারতীয় কসমেটিকস, পোশাক, মাদকদ্রব্য, খাদ্যপণ্য এবং অন্যান্য ভোগ্যপণ্য বিভিন্ন সময়ে অবৈধভাবে সীমান্ত পেরিয়ে দেশে প্রবেশের চেষ্টা করে। একইভাবে বাংলাদেশ থেকেও বিভিন্ন পণ্য অবৈধভাবে প্রতিবেশী দেশে পাচারের চেষ্টা চালানো হয়। এসব কার্যক্রম প্রতিরোধে বিজিবি নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, সীমান্ত এলাকায় গোয়েন্দা নজরদারি, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং স্থানীয় জনগণের সহযোগিতা বৃদ্ধি করা গেলে চোরাচালান আরও কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে আন্তঃসংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ এবং আইনের কঠোর প্রয়োগ সীমান্ত অপরাধ কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বিজিবি জানিয়েছে, দেশের সীমান্তকে নিরাপদ রাখা, অবৈধ পণ্য আমদানি-রপ্তানি প্রতিরোধ, মাদক পাচার বন্ধ এবং রাষ্ট্রীয় রাজস্ব সুরক্ষায় তাদের অভিযান ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে। সীমান্তে যেকোনো ধরনের চোরাচালান ও মাদক পাচারের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে কাজ করছে বাহিনীটি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, সীমান্তবর্তী এলাকায় নিয়মিত অভিযান পরিচালনার ফলে চোরাচালানকারীরা নতুন নতুন কৌশল অবলম্বন করছে। তবে বিজিবির তৎপরতা বাড়ায় অনেক ক্ষেত্রেই এসব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হচ্ছে। তারা আশা করছেন, সীমান্ত এলাকায় নজরদারি আরও জোরদার হলে চোরাচালান ও মাদক পাচারের ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।
সাম্প্রতিক এই তিনটি অভিযানে বিপুল পরিমাণ চোরাই পণ্য ও মাদক জব্দ হওয়ায় সীমান্ত এলাকায় অবৈধ বাণিজ্যের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চলমান অভিযানে নতুন সাফল্য যুক্ত হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ধারাবাহিক অভিযান এবং কঠোর নজরদারি বজায় থাকলে সীমান্ত দিয়ে অবৈধ পণ্য পরিবহন ও মাদক পাচার নিয়ন্ত্রণে আরও ইতিবাচক ফল পাওয়া সম্ভব হবে।