প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলায় প্রায় তিন দশক প্রবাসজীবন কাটানো আব্দুল মান্নান নামে এক ব্যক্তিকে সম্পদের বিরোধকে কেন্দ্র করে মারধর, পাঁচ দিন ধরে ঘরে আটকে রাখা এবং চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করার অভিযোগে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধেই এ অভিযোগ উঠেছে। আহত অবস্থায় তাকে বাড়িতে আটকে রাখা হয়েছিল বলে দাবি করেছেন স্বজনরা। পরে ছোট ভাইয়ের উদ্যোগে স্থানীয় বাসিন্দাদের সহায়তায় তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর এলাকায় ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে এবং ভুক্তভোগীর পরিবার ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি করেছে।
এ ঘটনায় বুধবার (১৫ জুলাই) রাতে ভুক্তভোগীর ছোট ভাই মো. সেলিম রায়পুর থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। অভিযোগে তিনি দাবি করেন, পারিবারিক সম্পদ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলমান বিরোধের জেরে পরিকল্পিতভাবে তার বড় ভাইকে নির্যাতন করা হয়েছে। অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন ভুক্তভোগীর স্ত্রী পারভীন বেগম, দুই ছেলে পারভেজ ও মাহাজ এবং শ্যালক ফয়েজ। তারা সবাই রায়পুর উপজেলার কেরোয়া ইউনিয়নের উত্তর কেরোয়া গ্রামের বাসিন্দা।
অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন বিদেশে কর্মরত ছিলেন আব্দুল মান্নান। প্রায় ৩০ বছর প্রবাসে থেকে উপার্জিত অর্থ দিয়ে তিনি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সম্পদ গড়ে তুলেছেন। পরিবারের দাবি, সেই সম্পদকে কেন্দ্র করেই বেশ কিছুদিন ধরে তার সঙ্গে স্ত্রী ও অন্যান্য স্বজনদের বিরোধ চলছিল। বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন সময় তাকে ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ১০ জুলাই রাতে বিরোধ চরম আকার ধারণ করে। অভিযোগ করা হয়েছে, ওই রাতে আব্দুল মান্নানকে জিআই পাইপ দিয়ে মারধর করা হয়। এতে তার মাথার বাম পাশে গুরুতর আঘাত লাগে এবং নাক ফেটে যায়। তবে আহত অবস্থায় তাকে হাসপাতালে না নিয়ে চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত রেখে বাড়ির একটি কক্ষে আটকে রাখা হয়। অভিযোগে বলা হয়েছে, টানা পাঁচ দিন তিনি কার্যত গৃহবন্দি অবস্থায় ছিলেন এবং বাইরের কারও সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ পাননি।
ঘটনার বিষয়ে জানতে পেরে ভুক্তভোগীর ছোট ভাই মো. সেলিম তাকে দেখতে বাড়িতে যান। তিনি অভিযোগ করেন, প্রথমে অভিযুক্তরা তাকে জানান যে আব্দুল মান্নান ঢাকায় অবস্থান করছেন। কিন্তু স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার কাছ থেকে তিনি জানতে পারেন, তার ভাই আসলে বাড়িতেই রয়েছেন। এরপর স্থানীয়দের নিয়ে বাড়িতে প্রবেশ করে গুরুতর আহত অবস্থায় আব্দুল মান্নানকে উদ্ধার করা হয়।
উদ্ধারের পর তাকে দ্রুত রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, চিকিৎসকেরা তার মাথার বাম পাশে চারটি এবং নাকে তিনটি সেলাই দেন। বর্তমানে তিনি চিকিৎসাধীন রয়েছেন। চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে তার শারীরিক অবস্থার উন্নতির চেষ্টা চলছে।
ভুক্তভোগীর ভাই মো. সেলিম বলেন, তার বড় ভাই দীর্ঘ ৩০ বছর বিদেশে কঠোর পরিশ্রম করে পরিবার ও ভবিষ্যতের জন্য সম্পদ গড়ে তুলেছেন। কিন্তু সেই সম্পদের লোভেই তার স্ত্রী, দুই ছেলে এবং শ্যালক তার ওপর নির্যাতন চালিয়েছেন বলে তিনি অভিযোগ করেন। তিনি আরও বলেন, যদি সময়মতো তাকে উদ্ধার করা না হতো, তাহলে তার ভাইয়ের জীবনহানির আশঙ্কা ছিল। তিনি এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দাও জানিয়েছেন, ঘটনার পর এলাকায় নানা ধরনের আলোচনা শুরু হয়। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বাড়ির ভেতরে কী ঘটেছে, তা নিয়ে বিভিন্ন তথ্য শোনা গেলেও তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রকৃত ঘটনা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়। তারা চান, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদঘাটন করুক এবং কেউ অপরাধ করে থাকলে তার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
রায়পুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নিজাম উদ্দিন ভূঁইয়া জানিয়েছেন, এ ঘটনায় একটি লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগের বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। তিনি বলেন, তদন্তে যেসব তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যাবে, সেগুলোর ভিত্তিতেই প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তিনি আরও জানান, ভুক্তভোগী, অভিযুক্ত এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য সংগ্রহসহ সংশ্লিষ্ট সব তথ্য যাচাই করে ঘটনাটির প্রকৃত কারণ উদঘাটনের চেষ্টা চলছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, পারিবারিক সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ অনেক সময় সহিংসতায় রূপ নেয়, যা শুধু আইনি নয়, সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকেও উদ্বেগজনক। যদি কোনো ব্যক্তিকে অবৈধভাবে আটকে রাখা, শারীরিক নির্যাতন করা বা চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করার অভিযোগ তদন্তে সত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে তা দেশের প্রচলিত আইনে গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তাই এ ধরনের অভিযোগে দ্রুত তদন্ত ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, দীর্ঘদিন প্রবাসে থাকা ব্যক্তিদের উপার্জিত সম্পদকে কেন্দ্র করে অনেক পরিবারে বিরোধের সৃষ্টি হয়। এসব বিরোধ সময়মতো আলোচনার মাধ্যমে সমাধান না হলে তা কখনও কখনও সহিংসতার দিকে গড়ায়। ফলে পারিবারিক সম্পর্কের অবনতি ঘটে এবং সামাজিক অস্থিরতাও বাড়ে। তাই পারিবারিক বিরোধে আইনের শরণাপন্ন হওয়ার পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিরও প্রয়োজন রয়েছে।
লক্ষ্মীপুরের এ ঘটনাটি এখন স্থানীয় মানুষের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ভুক্তভোগীর পরিবার ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা করছে, অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের আশ্বাস দিয়েছে। তদন্তের ফলাফলের ওপরই নির্ভর করবে অভিযোগের সত্যতা এবং এ ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ।