প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
টানা ভারী বর্ষণ, বন্যা এবং পাহাড়ধসের ঝুঁকির কারণে দীর্ঘ নয় দিন বন্ধ থাকার পর আবারও পর্যটকদের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে পার্বত্য জেলা বান্দরবানের অধিকাংশ পর্যটনকেন্দ্র। বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) থেকে পর্যটকেরা জেলার বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে ভ্রমণের সুযোগ পাচ্ছেন। তবে রোয়াংছড়ি উপজেলার জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র দেবতাখুমে এখনই প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি। সেখানে অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি এবং নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি থাকায় আগামী মঙ্গলবার পর্যন্ত পর্যটক প্রবেশ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রশাসন।
জেলা প্রশাসনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই পর্যটকদের জন্য বান্দরবানের অধিকাংশ পর্যটন স্পট খুলে দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে রুমা ও থানচি উপজেলার প্রশাসন নির্ধারিত পর্যটন গন্তব্যগুলোতেও আগের নিয়মে ভ্রমণের অনুমতি মিলছে। তবে পর্যটকদের অবশ্যই প্রশাসনের বিদ্যমান নির্দেশনা মেনে ভ্রমণ করতে হবে। নিবন্ধিত ট্যুর গাইডের সহায়তা নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় তথ্য প্রশাসনকে জানিয়ে ভ্রমণে যাওয়ার শর্ত বহাল রয়েছে।
জেলা প্রশাসনের পর্যটন সেলের দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী কমিশনার এস এম হাসান শাহরিয়ার জানিয়েছেন, বৈরী আবহাওয়ার কারণে সম্ভাব্য দুর্ঘটনা এড়াতে গত ৭ জুলাই থেকে ১৫ জুলাই পর্যন্ত জেলার সব পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ রাখা হয়েছিল। টানা বৃষ্টিপাত, পাহাড়ধসের আশঙ্কা এবং আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতির কারণে ওই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। গত কয়েক দিন ধরে আবহাওয়া স্বাভাবিক থাকায় এবং সার্বিক পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ আর বাড়ানো হয়নি। ফলে বৃহস্পতিবার থেকে পর্যটকদের জন্য পুনরায় উন্মুক্ত করা হয়েছে জেলার অধিকাংশ ভ্রমণকেন্দ্র।
প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বন্যা ও পাহাড়ি ঢলের সময় ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে দুর্গম এলাকায় গিয়ে বিপাকে পড়েছিলেন বহু পর্যটক। জেলা প্রশাসনের হিসাব বলছে, থানচি উপজেলার নাফাখুম, রেমাক্রী ও থুইসাপাড়াসহ দুর্গম এলাকায় ১৬৭ জন এবং রুমা উপজেলার কেওক্রাডং ও বগালেকে আরও ৩৭ জন পর্যটক আটকা পড়েন। সব মিলিয়ে ২০৪ জন পর্যটককে উদ্ধার করতে যৌথভাবে অভিযান চালায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, পুলিশ ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। দীর্ঘ সময়ের সমন্বিত উদ্ধার অভিযানের মাধ্যমে তাদের নিরাপদ স্থানে ফিরিয়ে আনা হয়।
প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক এই অভিজ্ঞতা আবারও প্রমাণ করেছে যে পার্বত্য অঞ্চলে আবহাওয়ার পরিবর্তন অত্যন্ত দ্রুত ঘটে এবং সামান্য অসতর্কতাও বড় ধরনের দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। তাই ভবিষ্যতেও আবহাওয়ার পূর্বাভাস এবং প্রশাসনের নির্দেশনা উপেক্ষা না করার জন্য পর্যটকদের প্রতি বিশেষ আহ্বান জানানো হয়েছে।
থানচি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আবদুল্লাহ আল-ফয়সাল জানিয়েছেন, গত তিন দিন ধরে জেলায় আবহাওয়া স্থিতিশীল রয়েছে। বন্যার পানি উল্লেখযোগ্যভাবে নেমে গেছে এবং পাহাড়ধসে ক্ষতিগ্রস্ত সড়কগুলোও দ্রুত সংস্কার করা হয়েছে। বর্তমানে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রাও অনেকটাই স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এসেছে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে পর্যটন কার্যক্রম পুনরায় চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
জেলা প্রশাসনের পর্যটন সেলও জানিয়েছে, পর্যটকদের নিরাপদ ভ্রমণ নিশ্চিত করতে আগের সব নিয়ম বহাল থাকবে। বিশেষ করে রুমা ও থানচি উপজেলার দুর্গম পর্যটনকেন্দ্রে ভ্রমণের আগে প্রশাসনের অনুমতি গ্রহণ, ভ্রমণ নিবন্ধন সম্পন্ন করা এবং নিবন্ধিত স্থানীয় গাইড সঙ্গে রাখা বাধ্যতামূলক থাকবে। প্রশাসনের মতে, এসব নিয়ম অনুসরণ করলে জরুরি পরিস্থিতিতে পর্যটকদের অবস্থান শনাক্ত করা সহজ হয় এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হয়।
অন্যদিকে রোয়াংছড়ি উপজেলার দেবতাখুম পর্যটনকেন্দ্র এখনো বন্ধ রয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তাজমিন আলম এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছেন, টানা বর্ষণ, বন্যা ও পাহাড়ধসের কারণে দেবতাখুম এলাকার বিভিন্ন অবকাঠামো উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পর্যটকদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আগামী মঙ্গলবার পর্যন্ত সেখানে ভ্রমণ সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামোর মেরামত এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতি সন্তোষজনক হলে পর্যটকদের জন্য দেবতাখুমও খুলে দেওয়া হবে।
স্থানীয় পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, টানা নয় দিন পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ থাকায় হোটেল-মোটেল, রিসোর্ট, পরিবহন, গাইড এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা আর্থিকভাবে ক্ষতির মুখে পড়েছেন। পর্যটন কার্যক্রম আবার শুরু হওয়ায় তারা আশাবাদী যে আগামী কয়েক দিনে পর্যটকদের আগমন বাড়বে এবং ক্ষতি কিছুটা হলেও কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে। বিশেষ করে সপ্তাহান্তের ছুটিকে ঘিরে পর্যটকের সংখ্যা বাড়ার প্রত্যাশা করছেন তারা।
পর্যটন বিশেষজ্ঞদের মতে, বান্দরবান দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পাহাড়ি পর্যটন জেলা হলেও বর্ষাকালে এখানকার ভৌগোলিক ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে। পাহাড়ধস, আকস্মিক বন্যা এবং দুর্গম এলাকার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি প্রায়ই দেখা দেয়। তাই পর্যটকদের ভ্রমণের আগে আবহাওয়ার সর্বশেষ পরিস্থিতি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া এবং প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে চলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এদিকে প্রশাসন জানিয়েছে, পরিস্থিতির ওপর নিয়মিত নজরদারি অব্যাহত থাকবে। আবহাওয়ার আবার অবনতি হলে প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন নির্দেশনা জারি করা হতে পারে। একই সঙ্গে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসন, স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং পর্যটনসংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
দীর্ঘ নয় দিনের বিরতির পর বান্দরবানের পর্যটনকেন্দ্রগুলো আবারও প্রাণ ফিরে পেলেও প্রশাসনের বার্তা স্পষ্ট—প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি নিরাপত্তার বিষয়টিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। দায়িত্বশীল ভ্রমণই হতে পারে নিরাপদ ও আনন্দময় পর্যটনের প্রধান শর্ত।