লিথিয়াম ব্যাটারি শিল্পে শুল্ক সুবিধা, বাস্তবায়নে জট

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২৬
  • ৩৬ বার
লিথিয়াম ব্যাটারি শিল্পে শুল্ক সুবিধা, বাস্তবায়নে জট

প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বৈদ্যুতিক যানবাহন (ইভি) এবং উচ্চপ্রযুক্তিনির্ভর শিল্পের বিকাশে লিথিয়াম ব্যাটারি উৎপাদনকে উৎসাহ দিতে চলতি অর্থবছরের বাজেটে গুরুত্বপূর্ণ শুল্ক সুবিধা দিয়েছে সরকার। তবে নীতিগত এই প্রণোদনা বাস্তবে কার্যকর করতে গিয়ে নানা প্রশাসনিক জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতার মুখে পড়ছেন উদ্যোক্তারা। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, শুল্ক সুবিধা কার্যকর করতে প্রয়োজনীয় কাস্টমস প্রসিডিউর কোড (সিপিসি) পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। ফলে আমদানিকৃত কাঁচামাল বন্দরে আটকে থাকায় বাড়ছে ডেমারেজ, গুদাম ভাড়া এবং ব্যাংক সুদের অতিরিক্ত ব্যয়। এতে নতুন বিনিয়োগ ও উৎপাদন কার্যক্রম অনিশ্চয়তার মুখে পড়ছে।

চলতি অর্থবছরের বাজেটে সরকার ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং উচ্চপ্রযুক্তি শিল্পের বিকাশে বিভিন্ন ধরনের নীতিগত সহায়তা ঘোষণা করেছে। করহার বৃদ্ধি না করে করজাল সম্প্রসারণের পাশাপাশি সম্ভাবনাময় শিল্পখাতে বিশেষ প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে সৌরবিদ্যুৎ, বৈদ্যুতিক যানবাহন এবং আধুনিক শক্তি সঞ্চয় প্রযুক্তির চাহিদা বিবেচনায় স্থানীয়ভাবে লিথিয়াম-আয়ন, সোডিয়াম-আয়ন ব্যাটারি এবং লিথিয়াম ব্যাটারি প্যাক উৎপাদনকে উৎসাহ দিতে শুল্ক ছাড়ের ব্যবস্থা করা হয়।

সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, চলতি বছরের ৮ জুন থেকে কার্যকর হওয়া এসআরওর আওতায় এসব ব্যাটারি উৎপাদনে ব্যবহৃত নির্ধারিত কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি ও উপকরণ কম শুল্কে আমদানির সুযোগ রাখা হয়েছে। তবে এই সুবিধা পেতে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) এবং বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের নিবন্ধিত ও অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান হতে হবে। এরপর জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের জন্য কাস্টমস প্রসিডিউর কোড (সিপিসি) বরাদ্দ দিলে তবেই শুল্ক সুবিধা কার্যকর হবে।

শিল্পোদ্যোক্তাদের অভিযোগ, নীতিগত অনুমোদন এবং এসআরও জারি হওয়ার পরও সিপিসি বরাদ্দে দীর্ঘ সময় লাগছে। আবেদন জমা দেওয়ার পরও সপ্তাহের পর সপ্তাহ কিংবা কখনও মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এর ফলে বিদেশ থেকে আমদানি করা কাঁচামাল বন্দরে আটকে থাকছে এবং প্রতিদিনই বাড়ছে ডেমারেজ ও গুদাম ভাড়ার খরচ। একই সঙ্গে ব্যাংক ঋণের সুদ এবং অন্যান্য আর্থিক ব্যয়ও বাড়তে থাকায় উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা বলছেন, লিথিয়াম ব্যাটারি শিল্প এখনো দেশের জন্য একটি উদীয়মান খাত। এই খাতে বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত করতে সরকার যে নীতিগত সহায়তা দিয়েছে, তা সময়মতো বাস্তবায়িত না হলে প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া কঠিন হবে। প্রশাসনিক বিলম্বের কারণে নতুন বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে এবং অনেক প্রকল্পের উৎপাদন কার্যক্রম নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শুরু করা যাচ্ছে না।

বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষও বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কাছে অনুরোধ জানিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। উদ্যোক্তাদের মতে, সিপিসি ইস্যুর প্রক্রিয়া দ্রুততর করা গেলে সরকারের দেওয়া শুল্ক সুবিধা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব হবে এবং স্থানীয় শিল্পের বিকাশে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

লিও আইসিটি কেবল পিএলসির বিপণন বিভাগের কর্মকর্তা রেজাউল হক বলেন, সরকারের এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে শিল্পায়নের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক। তবে বাস্তবে শুল্ক সুবিধা পেতে যদি দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়, তাহলে বিনিয়োগের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। তিনি বলেন, এসআরও জারি এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদন থাকার পরও মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হলে উদ্যোক্তাদের আর্থিক চাপ বাড়ে এবং উৎপাদন পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হয়। তিনি নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে সিপিসি বরাদ্দ নিশ্চিত করার দাবি জানান।

শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, বর্তমানে বিশ্বব্যাপী বৈদ্যুতিক যানবাহন, সৌরবিদ্যুৎ এবং শক্তি সংরক্ষণ প্রযুক্তির দ্রুত সম্প্রসারণের ফলে লিথিয়াম ব্যাটারির চাহিদা ক্রমাগত বাড়ছে। বাংলাদেশও এই সম্ভাবনাময় শিল্পে বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে চাইছে। স্থানীয়ভাবে ব্যাটারি উৎপাদন শুরু হলে আমদানিনির্ভরতা কমার পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং রপ্তানির নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এসব সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ দিতে নীতিগত সহায়তার পাশাপাশি দ্রুত প্রশাসনিক সেবা নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অন্যদিকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, অনেক ক্ষেত্রে আমদানিকারকেরা এসআরও অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সব নথিপত্র সময়মতো জমা দিতে পারেন না। ফলে আবেদন যাচাই-বাছাইয়ে অতিরিক্ত সময় লাগে। তিনি বলেন, কাস্টমস কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যথাযথভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করার পরই সিপিসি ইস্যু করে। তাই বিলম্বের পেছনে শুধু প্রশাসনিক কারণ নয়, আবেদনকারীদের নথিপত্রের অসম্পূর্ণতাও ভূমিকা রাখে।

তবে উদ্যোক্তারা বলছেন, প্রয়োজনীয় নথিপত্রের বিষয়ে যদি কোনো ঘাটতি থাকে, তাহলে দ্রুত তা জানিয়ে সমাধানের সুযোগ দেওয়া উচিত। একই সঙ্গে আবেদন নিষ্পত্তির জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা হলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা বাড়বে এবং শিল্পায়নের গতি ত্বরান্বিত হবে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, ভবিষ্যতের প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পে বাংলাদেশকে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে নিতে লিথিয়াম ব্যাটারি উৎপাদন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বৈশ্বিক বাজারে এই শিল্পের দ্রুত সম্প্রসারণের সুযোগ কাজে লাগাতে হলে শুধু প্রণোদনা ঘোষণা করাই যথেষ্ট নয়; বরং সেই সুবিধা দ্রুত এবং কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাও সমান জরুরি। অন্যথায় সম্ভাবনাময় এই খাতে বিনিয়োগের আগ্রহ কমে যেতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের অভিমত, সরকার, এনবিআর, বিডা এবং বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের মধ্যে আরও কার্যকর সমন্বয় গড়ে তোলা গেলে প্রশাসনিক জটিলতা কমবে এবং শিল্পোদ্যোক্তারা দ্রুত উৎপাদনে যেতে পারবেন। এতে সরকারের শিল্পায়ন নীতি বাস্তবায়নের পাশাপাশি দেশের উচ্চপ্রযুক্তি শিল্প খাতও আরও শক্তিশালী ভিত্তি পাবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত